অর্ধশত বছর পরও স্বজন হারানোর ব্যথা ভোলেনি উপকূলবাসী
আজ সেই ভয়াল ১২ নভেম্বর। ভোলা সহ উপকূলীয় এলাকার মানুষের কাছে আঁতকে উঠার দিন। ১৯৭০ সালের এই দিনে প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয় (সূত্রঃ দি গার্ডিয়ান, বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী)। এছাড়াও হাজার হাজার ঘর-বাড়িসহ ওই ঘূর্ণিঝড়ে লাখ লাখ গৃহপালিত পশু-পাখির মৃত্যু হয়। এই দিনটি আসলেই আজও আঁতকে ওঠেন উপকূলবাসী। এখনও অর্ধশত বছর পরও স্বজন হারানোর ব্যথা ভুলতে পারেননি তারা।
‘৭০’-এর গোর্কির আঘাতে জলোচ্ছ্বাসে ভোলা জেলার বেশিরভাগ এলাকা নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়ে। শুধু ভোলা জেলায় প্রাণ হারায় ২ লাখ মানুষ। এর মধ্যে বিচ্ছিন্ন মনপুরায় প্রাণ হারায় ২৬ হাজার মানুষ।
এদিকে একের পর এক জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলা করে আজও ভোলাসহ উপকূলীয় এলাকার মানুষজন বেঁচে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু আজও উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদে বেঁচে থাকার জন্য গড়ে ওঠেনি পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার। তাই পর্যাপ্ত সাইক্লোন সেন্টার, মাটির কিল্লা ও এই দিনটিকে উপকূল দিবস ঘোষণার দাবী জানিয়েছে উপকূল নিয়ে কাজ কার সাংবাদিক রফিকূল ইসলাম মন্টু সহ উপকূলবাসী।
এদিকে ভোলার ২ লাখ মানুষের মৃত্যু, লণ্ডভন্ড হয়ে যাওয়া জনপদের খবর পাঁচদিন পরে জানতে পারে রাজধানীবাসী। তৎকালীন ভোলা জেলা দৈনিক পূর্বদেশের প্রতিনিধি বর্তমান ভোলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক বাংলারকণ্ঠের সম্পাদক এম.হাবিবুর রহমান তার ক্যামেরায় লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া এই জনপদের ছবি ও সংবাদ চার দিন পর ঢাকায় পৌঁছান, যা পূর্বদেশে ছাপা হলে আঁতকে ওঠেন সারা দেশের মানুষ।
ত্রাণ নিয়ে উপকূলে বঙ্গবন্ধু:
৭০-এ গের্কির আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া উপকূলের খবর দৈনিক পূর্বদেশের মাধ্যমে জানতে পেরে দেড় তলা লঞ্চে করে ত্রাণ নিয়ে ছুটে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ভোলার দৌলতখান, তজুমদ্দিন, মনপুরা ও চরকুকরী মুকরীতে ত্রাণ বিতরণ করেন। এই সময় তার সাথে ছিলেন তৎকালীন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব, সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সহ অন্যান্যরা। মনপুরা উপজেলা তৎকালীন ছাত্রনেতা বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার আবুল কাশে মাতাব্বর জানান, বঙ্গবন্ধু যখন দেড় তলা লঞ্চে করে মনপুরায় ত্রাণ নিয়ে আসেন তখন তাকে স্বাগত জানান জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব নাজিম উদ্দিন চৌধুরীর পিতা মুক্তিযোদ্ধা মরহুম বসরাত উল্লা চৌধুরী। তখন বঙ্গবন্ধু মরহুম বসরাত উল্লা চৌধুরীকে খালি গায়ে দেখে রিজের গায়ের কোট খুলে দেন।
স্বজন হারানো রাহেলার স্মৃতিচারণ :
১৯৭০ সালে ১২ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ছিল রমযান মাস। সন্ধ্যার সময় বৈরী আবহাওয়া ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। তখনি বন্যার পানি উঠতে শুরু করে। জীবন বাঁচাতে সবাই গাছে আশ্রয় নেয়। মনপুরা উপকূলে সবার মতো সত্তর সালে ২৭ বছরের গর্ভবতী রাহেলা স্বামী, তিন সন্তান, পরিবার-পরিজন নিয়ে গাছে আশ্রয় নেন। ততক্ষণে উপকূলজুড়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হতে থাকে। রাত বাড়ার সাথে সাথে ঘূর্ণিঝড় প্রকট আকার ধারণ করে। এক সময় প্রবল বাতাসে গাছ থেকে পড়ে যান রাহেলা। খেজুর গাছের পাতা ধরে বাঁচার লড়াই করেন তিনি। একপর্যায়ে অচেনা এক পুরুষের সাথে কাঠের আলমারী ধরে বাঁচার চেষ্টা করেন। তখন স্রোতের টান রাহেলাকে বঙ্গোপসাগের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। টানা ৬ দিন সাগরে ভাসার পর রাহেলাকে ভারতীয় জাহাজ উদ্ধার করে চট্টগ্রামে দিয়ে যায়। পরে চট্টগ্রাম হাসপাতালে একমাস চিকিৎসা শেষে বরিশাল হয়ে মনপুরা আসেন তিনি। সমুদ্রে ভাসার সময় তিনি দেখেছেন মৃত মানুষের মিছিল। বন্যায় হারানো তিন সন্তানের কথা জানতে চাইলে গুমরে কেঁদে ওঠেন রাহেলা।
এমবি