শব্দ দূষণ প্রতিরোধে বরিশালে লোক দেখানো উদ্যোগ

গত ৯ সেপ্টেম্বর বরিশাল নগরীর তিনটি স্থানকে ‘নিরব এলাকা’ ঘোষণা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। এসব এলাকায় হর্ন বাজানো বা উচ্চ শব্দে মাইক ও সাউন্ড বক্স বাজানো নিষিদ্ধ করেন তারা। নির্দেশ অমান্য হলে অভিযুক্তদের জেল-জরিমানার হুশিয়ারীও দেয়া হয়।
তবে ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে ‘নিরাব এলাকা’ বাস্তবায়ণ কার্যক্রম। শুরুতে লোক দেখানো লিফলেট বিতরণ আর নামমাত্র সাইনবোর্ড স্থাপন হলেও পরবর্তী কোন কার্যক্রমে দেখা যাচ্ছে না পরিবেশ অধিদপ্তরকে। তবে শিঘ্রই এ বিষয়ে প্রশিক্ষণসহ কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. কামরুজ্জামান সরকার।
যদিও সচেতন মহল বলছে, লিফলেট বিতরণ, সাইনবোর্ড আর প্রশিক্ষণে সরকারের আর্থিক ক্ষতি ছাড়া ‘নিরব এলাকা’ বাস্তাবায়ন সম্ভব নয়। এটি বাস্তবায়ণে কার্যকরী উদ্যোগের পাশাপাশি আইন প্রয়োজন জরুরি বলে মতামত তাদের।
জানা গেছে, ‘শব্দ দূষণ রোধে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর জনগুরুত্বপূর্ণ স্থান গুলোকে ‘নিরব এলাকা’ বাস্তবায়ণে প্রকল্প গ্রহণ করে পরিবেশ অধিদপ্তর। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধরণ হয়েছে ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত। অর্থাৎ দুই বছর মেয়াদী এই কারিগরী সহায়তা প্রকল্পটি বাস্তবায়ণে সরকারিভাবে মোট ৪৭৯৮.৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ‘জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ উন্নয়নে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬ বাস্তবায়নে অংশীজনদের দক্ষতা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যক্রম গ্রহণের লক্ষ্যে দূষণের মাত্রা, উৎস এবং এর প্রভাব সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম (পাইলটিং) এর মাধ্যমে কার্যকারী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করাই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
প্রকল্পের আওতায় চলতি বছরের গত ৯ সেপ্টেম্বর বরিশাল নগরীর বান্দ রোডস্থ শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, নগরীর হাসপাতাল রোডস্থ বরিশাল জেনারেল হাসপাতাল এবং শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত আইন মহাবিদ্যালয় ‘ল কলেজ’ এর আশপাশের ১০০ মিটার পর্যন্ত ‘নিরব এলাকা’ ঘোষণা করা হয়। এ তিনটি এলাকায় দিনে সর্বোচ্চ ৫০ ডেসিপল এবং রাতে সর্বোচ্চ ৪০ ডেসিপল শব্দ হতে পারবে। অথচ এ তিনটি এলাকায় বর্তমানে সহনিয় মাত্রার বেশি ডেসিপল শব্দদূষণ হচ্ছে বলে জানালেও শব্দদূষের সুনির্দিষ্ট মাত্রার হিসাব নেই বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. তোতা মিয়া বলেন, ‘নিরব এলাকা বাস্তবায়ণ কর্মসূচির আওতায় গত ১০ সেপ্টেম্বর তিনটি এলাকায় যানবাহন শ্রমিকদের মাঝে প্রচারপত্র লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। তাছাড়া তিনটি স্থানেই পৃথকভাবে ‘নিরব এলাকা’ লেখা সম্বলিত সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। এর ছয় মাস পূর্বে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুরোধে তিনটি জায়গাকে ‘নিরব এলাকা’ ঘোষণা করে গেজেট আকারে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন। প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ণে কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে, গত ৯ সেপ্টেম্বর প্রচারাভিযান চলাকালে পরিবেশ অধিদপ্তরের ওই কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, ওইদিন থেকে পরবর্তী দুমাস তাদের এ প্রচারাভিযান চলছে। তবে এ কর্মকর্তার সেই বক্তব্যের সাথে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাচ্ছে না নগরবাসী। তাদের অভিযোগ লোক দেখানো সাইনবোর্ড আর দায়সারা লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে সরকারি বরাদ্দ লুটপাটের পায়তারা চলছে।
সরেজমিনে শেবাচিম হাসপাতালের সামনে দেখা যায়, দুটি সাইনবোর্ড লাগানো রয়েছে হাসপাতালের প্রবেশদ্বারে। এর মধ্যে বান্দ রোডের পাশে থাকা সাইনবোর্ডটি ভ্রাম্যমান ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢেকে গেছে। যানবাহন চলাচলকে যে যার মতো হর্ন বাজিয়ে শব্দদূষণ করছে। ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্বে থাকলেও তাদের কর্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর বিভাগীয় সমন্বয়কারী মো. রফিকুল আলম বলেন, ‘নিরব এলাকা’ বাস্তবায়ণের যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে সেটা একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। গত ৯ সেপ্টেম্বর লিফলেট বিতরণকালে আমিও ছিলাম। কিন্তু বর্তমানে সেই কার্যক্রম কতটা জোরদার রয়েছে সেটা নিয়ে প্রশ্নতুলে তিনি বলেন, ‘লিফলেট বিতরণ আর ওয়ার্কশপ করে ‘নিরাপদ এলাকা’ বাস্তবায়ণ কখনই সম্ভব নয়। কেননা ওয়ার্কশপে কে এবং কাকে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে? যাকে নিয়ে ওয়ার্কশপ করা হবে তিনি মাঠ পর্যায়ে কখনই মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ থেকে শেখা বিষয়গুলো প্রয়োগ করতে যাবে না। এতে শুধুমাত্র সরকারের আর্থিক ক্ষতিই হবে।
তিনি বলেন, ‘নিরব এলাকা’ বাস্তবায়ণে প্রয়োজন সকলের ঐকবদ্ধ প্রচেষ্টা। প্রয়োজনে আইন প্রয়োগ করতে হবে এটি বাস্তবায়ণে। তাছাড়া প্রতিটি এলাকায় প্রয়োজনে তিন শ্রেডুর মানুষ নিয়ে কমিটি করতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, ট্রাফিক এবং কমিউনিটি পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে শব্দদূষণের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া জেলা প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে মাসে অন্তত একবার করে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা যেতে পারে। তাছাড়া বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা এবং কাউন্সিলিং করা যেতে পারে। ‘নিরব এলাকা’ বাস্তবায়ণে এসব উদ্যোগ কার্যকরী ভ‚মিকা রাখবে বলেন তিনি।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ‘শব্দ দূষণে দোষী প্রমাডুত হলে প্রথম অপরাধের জন্য একমাসের কারাদন্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দÐেই দÐিত করা এমনকি আইন ভাঙলে শব্দের উৎস যন্ত্রপাতি জব্দ করা যাবে।
এদিকে, পরিবেশ অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. কামরুজ্জামান সরকার ‘নিরব এলাকা’ বাস্তবায়ণ কার্যক্রমে কিছুটা ধীরগতী স্বীকার করলেও একেবারে থেমে যায়নি বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমাদের প্রচারনামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সামনে আরও জোরদার করা হবে।
তিনি বলেন, ‘নিরব এলাকায় শব্দদূষণ রোধে আমরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি, যানবাহন চালক, গণমাধ্যম, পুলিশ-প্রশাসন এবং যানবাহন চালকদের নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করবো। সেখানে নিরব এলাকা’র বিষয়ে সচেতনতামূলক বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হবে। এর পরেও নিয়মের ব্যত্বয় ঘটলে আইন প্রয়োগ করা হবে।
শব্দ দূষণ রোধে এ ধরনের সেমিনার কতটা কার্যকর হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা শ্রমিকদের এ কর্মশালায় ডাকব। তারা এখান থেকে সচেতনতা অর্জন করে তাদের সহকর্মী শ্রমিকদের সচেতন করবে। তবে এই কার্যক্রমকে বাস্তমূখি করতে সকলের পরামর্শ গ্রহণ করবেন বলেও জানান তিনি। তবে সচেতনতামূলক এ সেমিনার কবে হবে এবং বর্তমানে প্রচার প্রচারনা বন্ধ কেন সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও তার সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেননি পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. কামরুজ্জামান সরকার।
এসএমএইচ