‘কল্পনাও করিনি দাদা এত দ্রুত আমাদের ছেড়ে চলে যাবে’

সুন্দর এই পৃথিবীর মায়া মমতা ত্যাগ করে আমাদের দাদা সেজদা যাদব দা পরপারের উদ্দেশ্যে ভগবান তাকে ডেকে নিয়ে গেছে। দাদা এই সুন্দর পৃথিবীর আর কিছুই দেখতে পাবে না। দাদা কে বাঁচানোর জন্য তার ছেলে বাবু আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। হাসপাতালের কেবিন ভাড়া নিয়ে রাত্রিযাপন করেছে গত বিশ দিন। ওর সাথে কথা বললেই বলতো বাবার প্রাণটা থাকলেই হবে কিন্তু সেই প্রাণ প্রদীপ নিভে গেছে আমার দাদার গতকাল।
আমার দাদার ছিলো এক কর্মময় পরিশ্রমী জীবন। কাজকে সব সময় ভালোবাসতো। বরিশাল অঞ্চলের বেশিরভাগ লোকই দাদা কে চিনতো। দাদার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান যাদব ইলেকট্রিকে কাজ করিয়ে সুফল পায়নি এমন লোক বরিশাল অঞ্চলে পাওয়া যাবেনা।চাকরি জীবন থেকে অবসর নিয়ে আর কাজ না করলে চলতো কিন্তু বাসায় বসে থাকার মতো লোক আমার দাদা ছিল না। অসুস্থ হয়ে ব্রেন স্ট্রোক করার আগের দিনও সকাল ও রাতে তার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানে গিয়েছিল।
রাতে টিভি দেখার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। খবর পেয়ে দাদার ছেলে বাবু ঢাকা থেকে এম্বুলেন্স পাঠিয়ে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করায়। স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসায় সন্তুষ্ট হতে না পেরে পরবর্তীতে শমরিতা হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।
প্রায় প্রতিদিনই দাদা আমার মেয়ে নিধির সাথে কথা বলতো। আমি কল্পনাও করিনি দাদা এত দ্রুত আমাদের ছেড়ে চলে যাবে তাহলে হয়তো আমিও একটু কথা বলতাম।আমাদের ব্যক্তিগত একটা ভালো সংবাদ দাদাকে জানিয়েছিলাম খুব খুশি হয়েছিল কিন্তু আফসোস তা দেখে যেতে পারল না। দাদা চাকরিজীবনে বরিশালের অপসোনিন গ্লোবাল ক্যাপসুলের ম্যানেজার ছিলো।
দাদা হাতের কাজে ছিলো খুবই দক্ষ। দাদার যাদব ইলেকট্রিক ছিলো অপসোনিনের পাশে। তখন অপসোনিন কোম্পানির মেশিন নষ্ট হলে মাঝে মাঝে বিদেশ থেকে ইঞ্জিনিয়ার এনেও সময়মতো মেশিন ঠিক করা যেত না। যাদব দা এই কঠিন কাজও করে দিত স্বল্প সময়ে। তখন দাদা অপসোনিনে স্থায়ী কাজ করতো না। দাদা স্থায়ীভাবে চাকরি করতেও চায়নি।আমাদের শ্রদ্ধেয় অপসোনিনের ক্যাপ্টেন সবুর স্যার মাঝে মাঝে যাদব দা কে ভাটিখানার বাসায় এসে নিয়ে যেতে দেখেছি তার কোম্পানিতে মেশিন ঠিক করার জন্য।তিনি দাদা কে চিনতে পেরেছিলো দাদার কর্মক্ষমতার কারণে পরবর্তীতে দাদা গ্লোবাল ক্যাপসুলে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলো।
পৃথিবীর অনেক দেশে প্রশিক্ষণ নিয়েছে মেশিনারি কাজের উপর আমার দাদা। দাদাকে আর কোনো প্রশিক্ষণ নিতে হবেনা তার নিথর দেহ এখন ঢাকা থেকে বরিশালের বাসায় কিছুক্ষণ রেখে বরিশালের মহাশ্মশানে শবদেহের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।
দাদার ঢাকায় চিকিৎসাকালীন সময় আমি অনেককে ফোন দিয়ে বিরক্ত করেছি ।আমি জানি বাংলাদেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রের অবস্থা অনেক সময় উপর পদে পরিচিত লোকজন না থাকলে শুধু টাকা খরচ হবে চিকিৎসা হবে না তাই আমার প্রথমে মনে হয়েছিলো ক্যাপ্টেন সবুর সার কে জানাই। তাকে মেইল করলাম আমি শুনেছিলাম দাদা হার্ট অ্যাটাক করেছে পরে জেনেছি ব্রেন স্ট্রোক হয়েছিলো।
সবুর স্যার আমার মেইল এর রিপ্লাই দিয়ে দাদার খোঁজখবর সব সময় নিয়েছে হাসপাতালে একাধিকবার দেখতে গিয়েছে।আমি জানি দাদা এখন আর তাদের কোম্পানিতে চাকরি করে না কিন্তু আমি সবুর স্যারকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি সারের ব্যবহার অমায়িক দাদাকে খুব ভালোবাসত তিনি সব সময় একজন প্রাক্তন সহকর্মীর প্রতি যে ভালোবাসা দেখিয়েছে আমাদের দাস পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি তার কাছে। কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি বাবুর বন্ধুদের প্রতি তারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে আমার দাদার চিকিৎসাকালীন সময় এমনকি ঢাকা থেকে তার শবদেহের কাজ সম্পন্ন করার জন্য বরিশালেও তারা এসেছিলো।
দাদার শুধু ডায়াবেটিকস ছিল। সুদর্শন সুঠাম দেহের অধিকারী ছিল আমার দাদা। একবারও ভাবেনি দাদা আর এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে না। তাই মৃত্যুর সংবাদটা ও পোস্ট করতে মনে চাচ্ছিলো না ।আমার ফেসবুকের প্রতিটি পোস্টে দাদা প্রথমে লাইক করতো সেই দাদাকে নিয়েই আমার আজকের এই পোষ্ট। আপনারা অনেকেই হয়ত জানেন আমার বাবা ছোটবেলা মারা গিয়েছেন এই দাদার কাছে থেকেই আমি বড় হয়েছি কোনদিন কোন স্নেহ থেকে বঞ্চিত রাখেনি।
আমার দাদার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় সকলের নিকট প্রার্থনা জানাই দাদা যেন স্বর্গবাসী হোন দাদার পরিবার যেন ভালোমতো সুস্থ ভাবে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে পারে।
তিন বছর আগে বাংলাদেশে গিয়েছিলাম তখন দাদার সাথে দু-তিনটি ছবি তুলেছিলাম। আমার পাসপোর্ট এর মেয়াদ কিছুদিন আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে।এখন করোনা কালীন সময় পাসপোর্ট রিনুয়াল করতে দুই তিন মাস সময় লেগে যায় তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও দাদার সাথে আর শেষ দেখা হলো না তবে বাবুর বন্ধু রুবেল একদিন ভিডিও কলের মাধ্যমে দাদাকে হাসপাতাল থেকে দেখিয়েছিল আমার মেয়ে নিধি তখন দাদাকে জেঠু জেঠু বলে ডাকতে ছিলো।
দাদা তখন হাত জাগিয়ে নিধির কথার জবাব দিচ্ছিলো।দাদার ছেলে বাবু যখন দাদাকে জিজ্ঞেস করতো বাবা তোমার কষ্ট হয় কখন দাদা মাথা নেড়ে না বলতো অথচ আমার ভাইয়ের ছেলে দীপ্ত যখন একা জিজ্ঞেস করত জেঠু তোমার কষ্ট হয় তখন মাথা নেড়ে বলল হ্যাঁ তার মানে দাদার ব্রেন স্ট্রোক হলেও সেন্স ছিলো। কষ্ট হয় ছেলেকে বললে বাবু কষ্ট পাবে সেজন্য না বলতো। সকল কষ্টের অবসান ঘটিয়ে দাদা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে পরম শান্তির দেশে।
আমি ভাবতেই পারছিনা আমার দাদা আর এই পৃথিবীতে নেই।কিন্তু এটাই বাস্তবতা আমাদের সকলের গন্তব্য হবে এই পরম শান্তির দেশে একদিন।মনটা খুবই খারাপ অনেকেই আমাকে ফোন দিয়ে দাদার সংবাদ টা দিতে চেয়েছিলো আমি বুঝতে পেরেছিলাম দাদার কোনো খারাপ সংবাদ আমাকে শুনতে হবে তাই আমি কারো ফোন রিসিভ করিনি। ক্ষমা করে দিয়েন।
পরবর্তীতে অনেকে আমার দাদার মৃত্যু সংবাদের পোস্ট ফেসবুকে দিয়েছেন। ফেসবুকের অনেক সংবাদই মিথ্যে হয় কিন্তু আমার দাদার ক্ষেত্রে মিথ্যে হয়নি। মৃত্যুকালে আমার দাদা স্ত্রী এক ছেলে এক মেয়ে এবং নাতনি রেখে গেছেন আর রেখে গেছেন আত্মীয়-স্বজনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী।
লেখক:
নৃপেন্দ্র কুমার দাস
সাবেক জিএস
সরকারী বিএম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, বরিশাল।
বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী।
বিঃদ্রঃ লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত
এমবি