ঢাকা রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

Motobad news
শিরোনাম
  • ১৬৬ কিলোমিটার সড়কে ৭০ ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, পাঁচ বছরে প্রাণ গেল ২৪শ মানুষের এবার তালা দেওয়া হলো বরিশালের সিভিল সার্জনের কক্ষে ঝালকাঠিতে মলিনা রায় হত্যার মাস্টারমাইন্ড গ্রেপ্তার বঙ্গভবনে অফিস, স্পিকারের বাসভবনে থাকবেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বাবুগঞ্জে গাঁজাসহ তিন মাদক কারবারি আটক বরিশালে বিএনপির কমিটি বাতিলের দাবিতে কালো পতাকা প্রদর্শন গৌরনদীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগ নেতার নির্যাতন সইতে না পেরে নারী ইউপি সদস্যর আত্মহত্যা নলছিটিতে গাঁজাসহ ছাত্রদল নেতা আটক ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীতে বরিশালের দুই ছাত্রনেতা কুয়াকাটায় ছাত্রদল ও যুবদলের হামলায় আহত সাংবাদিক 
  • বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক

    ১৬৬ কিলোমিটার সড়কে ৭০ ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, পাঁচ বছরে প্রাণ গেল ২৪শ মানুষের

    ১৬৬ কিলোমিটার সড়কে ৭০ ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, পাঁচ বছরে প্রাণ গেল ২৪শ মানুষের
    ছবি: সংগৃহীত 
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    ভোরের কুয়াশা হোক কিংবা দুপুরের ব্যস্ত সময়, বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে যাত্রা মানেই এক অদৃশ্য শঙ্কা। কখন, কোথায়, কোন বাঁকে অপেক্ষা করছে মৃত্যু, তা কেউ জানে না। প্রতিদিন হাজারো যানবাহন ছুটে চলে দক্ষিণাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে। কিন্তু সড়কের একের পর এক বিপজ্জনক বাঁক যেন মুহূর্তেই কেড়ে নিচ্ছে অসংখ্য তাজা প্রাণ।

    পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি, পর্যটন ও যোগাযোগে এসেছে নতুন গতি। কিন্তু সেই গতি সামাল দেওয়ার মতো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে। মাত্র ২৪ ফুট প্রশস্ত দুই লেনের এই ১৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কে রয়েছে অন্তত ৭০টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, যেগুলোর অনেকগুলোই এখন স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘মৃত্যুফাঁদ’ নামে।

    সড়ক ও জনপথ বিভাগ, বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশন, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, অভিজ্ঞ চালক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে বরিশাল বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৪০০ মানুষ। এর বড় অংশের দুর্ঘটনাই ঘটেছে বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের এসব বিপজ্জনক বাঁকে।

    ২০২২ সালের ২৯ মে ভোর। ঢাকা থেকে বরিশালগামী যমুনা লাইন পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস উজিরপুর উপজেলার সানুহার এলাকার তীব্র বাঁকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের একটি গাছে সজোরে ধাক্কা দেয়। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় বাসটি। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ১০ যাত্রী। আহত হন আরও ২১ জন।

    এই মর্মান্তিক ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মাত্র দুই দিন পর একই স্থানে বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন আরও দুইজন।

    এরপরও থামেনি দুর্ঘটনা। চলতি বছরের মার্চ মাসের শেষ দিকে একই বাঁকে ট্রাক ও থ্রি-হুইলারের সংঘর্ষে আরও একজন নিহত হন। স্থানীয়দের ভাষায়, ‘সানুহারের বাঁক মানেই আতঙ্ক।’

    সানুহার বাজারের প্রবীণ ব্যবসায়ী মো. ছগির প্রায় দুই যুগ ধরে এই মহাসড়কের পাশে ব্যবসা করছেন।

    তিনি বলেন, কত মানুষ যে মরতে দেখেছি, তার হিসাব নেই। দুর্ঘটনার শব্দ শুনলেই মনে হয় আবার হয়তো কেউ বাঁচল না। শুধু সানুহার নয়, বামরাইল, নতুন শিকারপুর, জয়শ্রী, ইচলাদী উজিরপুরেই অন্তত আটটি ভয়ঙ্কর বাঁক রয়েছে। প্রায় প্রতিটি বাঁকেই মানুষ মারা গেছে।

    স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, গৌরনদীর ভুরঘাটা, টরকী, আশোকাঠি, মাহিলাড়া, বাটাজোড়, পিঙ্গলাকাঠি, বাবুগঞ্জের নতুনহাট, রহমতপুর, এয়ারপোর্ট মোড়, ক্যাডেট কলেজ এলাকা, বরিশাল সদরের কাশীপুর, গড়িয়ারপাড়, দপদপিয়া, নলছিটি জিরো পয়েন্ট, বাকেরগঞ্জের লক্ষীপাশা, বোয়ালিয়া, চরামদ্দি, আমতলীর শাখারিয়া, কলাপাড়ার মহিষাকাটা, চুনাখালী ও কেঁওড়াবুনিয়াসহ বহু স্থানের বাঁক এখন দুর্ঘটনার ‘ব্ল্যাক স্পট’ হিসেবে পরিচিত।

    সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা সেতু চালুর আগে এই মহাসড়কে প্রতিদিন ১৬ থেকে ১৯ হাজার যানবাহন চলাচল করত। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজারে পৌঁছেছে। ঈদ ও দীর্ঘ ছুটিতে এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়।

    অথচ সড়কটি এখনো দুই লেনের। অধিকাংশ অংশে প্রস্থ মাত্র ২৪ ফুট। ফলে এক্সপ্রেসওয়ে থেকে দ্রুতগতিতে আসা যানবাহন সরু মহাসড়কে প্রবেশ করেই একের পর এক তীক্ষ্ণ বাঁকের মুখোমুখি হচ্ছে। সামান্য অসতর্কতাই রূপ নিচ্ছে ভয়াবহ দুর্ঘটনায়।

    বরিশাল কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের অভিজ্ঞ চালক কালাচাঁদ দাস বলেন, ভাঙা এক্সপ্রেসওয়ে পার হওয়ার পর চালকদের হঠাৎ করেই সরু মহাসড়কে গাড়ি চালাতে হয়। সামনে একের পর এক বাঁক। এর মধ্যে বাস কোম্পানিগুলোর সময়ের প্রতিযোগিতা থাকে। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

    বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, বরিশাল অঞ্চলের মাত্র ৫৬ কিলোমিটার অংশেই ৪০টির বেশি বাঁক রয়েছে। অধিকাংশ বড় দুর্ঘটনাই এসব বাঁকে নিয়ন্ত্রণ হারানো বা মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণে ঘটে।

    বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, বরিশাল বিভাগজুড়ে গত ৫ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪শ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন অগনিত মানুষ। ২০২১ সালে ৫২৪টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৫৮৭ জন, ২০২২ সালে ৪৩০টি দুর্ঘটনায় ৫১১ জন, ২০২৩ সালে ৪৩৬টি দুর্ঘটনায় ৪১১ জন, ২০২৪ সালে ৪৩৯টি দুর্ঘটনায় ৪৫৭ জন এবং সবশেষ ২০২৫ সালের ৪৪৮টি দুর্ঘটনায় ৪২১ জন নিহত হয়েছেন।

    বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, আমরা বরিশাল বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের যে সংখ্যা দিয়েছি তার অধিকাংশ দুর্ঘটনায় নিহতের ঘটনাই বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়কে। বলতে গেলে ৪ ভাগের সাড়ে ৩ ভাগই এই মহাসড়কে নিহতের সংখ্যা। 

    তিনি বলেন,  পদ্মা সেতু পার হওয়ার পর ঢাকা থেকে বরিশালের উদ্দেশ্যে আসা বাসগুলো যখন ভাঙা এক্সপ্রেসওয়ে পার হয়ে মাদারীপুরের সড়কে ঢুকে তখই বিপত্তিতে পরে। কেননা মাদারীপুর থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ক মাত্র ২৪ ফুট প্রশস্ত। পেছনে যে গতিতে বাস চালিয়ে এসেছে, এই সড়কে ঢুকে সেই গতিতে বাস চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে বাঁকগুলোতে। বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত কিছু বাঁক রয়েছে একেবারে ইউ আকৃতির। তাছাড়া এই মহাসড়কে দুর্ঘটনা প্রবণ বাঁক থাকা সত্বেও বাস কোম্পানীগুলোর প্রতিযোগিতা এবং ঝুঁকি নিয়ে ওভারটেকিং করায় দুর্ঘটনাগুলো বেশি ঘটছে। অনেক জায়গায় সড়ক প্রশস্ত করেও দুর্ঘটনা কমছে না। তাই চালকদের সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাস মালিকদের সাথে আলোচনা করে  যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। 

    তিনি আরও বলেন, প্রথমত সরকারের এটা নিশ্চিত করা উচিৎ যে ৬/৮ ঘন্টার উপরে কোনো চালক বাস চালাতে পারবে না। এই নিয়মটা কড়াকড়িভাবে চালু করতে পারলে এত প্রাণহানি থাকবে দক্ষিণাঞ্চলের এই সর্বব্যস্ততম মহাসড়কে। একজন চালক যখন একটি বাস ১৫/১৬ ঘন্টা চালনা করে তখনই ঝুঁকি তৈরী হয়। হয়তো ঘুমিয়ে পরে নতুবা অসচেতন হয়ে যায় চালক। তারপরই ঘটে বিপত্তি।

    সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর বরিশাল জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেছেন, প্রথমে মনে রাখতে হবে বরিশাল থেকে কুয়াকাটা মহাসড়কটি দুই লেনের এবং খুবই সরু। গড় হিসেবে এটি ২৪ ফুটের সড়ক। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর এই মহাসড়কে যানবাহন চলাচল প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এত ছোট সড়কে যানবাহন চাপের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। আর তাছাড়া আমাদের পক্ষ থেকে যেসব এলাকা দুর্ঘটনা প্রবণ সেই সব এলাকার সড়ক প্রশস্ত করা হয়েছে এবং এখনও সেই কাজ চলছে। পাশাপাশি বাজার এলাকাগুলোতে স্প্রিড
    ব্রেকার থেকে শুরু করে মোড়ে মোড়ে চিহ্নও দেওয়া রয়েছে। তারপরও দুর্ঘটনা কমছে না অসচেতনতার কারণে। ৬ লেন সড়ক নির্মান হলে এই মহাসড়কে প্রাণহানি কমে যাবে অনেকাংশ।

    বরিশাল বিআরটিএ বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক জিয়াউর রহমান বলেন, ২০২২ সালের দুর্ঘটনায় যমুনা লাইন পরিবহনের চালককে বাকেরগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করেছিলো পুলিশ। তার ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছিলো। শুধু এই ঘটনা নয়, দুর্ঘটনায় চালকদের অসচেতনতার প্রমাণ পেলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হয়। এছাড়া দুর্ঘটনায় আহত অথবা নিহতরা ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করলে সেই অনুযায়ী মন্ত্রণালয় থেকে ক্ষতি পূরণ দেওয়া হয়।

    তিনি জানান, আমরা সব সময় বাস টার্মিনাল এলাকাগুলোতে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাই। চালক ও মালিকদের সাথে কথা বলি। সড়ক দুর্ঘটনা যাতে আরও কিভাবে কমানো যায় সেই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি আমরা।
     


    এইচকেআর
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ