৩০ লাখ শিশু স্বাস্থ্যঝুঁকিতে, নির্মূল রোগও ফেরার শঙ্কা

দেশে অন্তত ৩০ লাখ শিশু ১১টি মারাত্মক রোগের ঝুঁকিতে পড়েছে। এর বড় কারণ টিকা না পাওয়া বা দেরিতে টিকা পাওয়া। রোগগুলোর মধ্যে পোলিও ও নবজাতকের ধনুষ্টংকার দেশে পুরোপুরি নির্মূল হয়েছিল। নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে ছিল হাম, রুবেলা, ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি ও রাতকানা রোগ। এ ছাড়া টিকার কারণে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছিল যক্ষ্মা, হেপাটাইটিস-বি, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি ও নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়া। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত দেড় বছরে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি ভঙ্গুর অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে। ফলে টিকা না পাওয়া অরক্ষিত শিশুর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এর তিনটি কারণ জানা যায়—এক. টিকা কেনা নিয়ে সংকট তৈরি হওয়া।
দুই. সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা। তিন. স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলনের মুখে মাঠ পর্যায়ে টিকাদান ব্যাহত হওয়া। নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে থাকা হাম রোগটির প্রাদুর্ভাবের রূপ ধারণ করায় টিকার এই ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল নিজেও হাম ফিরে আসার জন্য ঠিকমতো টিকা দিতে না পারাকেই দায়ী করেছেন।
তিনি বলেছেন, টিকা সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। টিকা বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে গত চার-পাঁচ বছরে টিকা না পাওয়া অরক্ষিত শিশুর সংখ্যা হয়েছে এক বছরে জন্ম নেওয়া শিশুর সমান বা তার বেশি। প্রতি বছর দেশে প্রায় ৩৪ লাখ শিশু জন্ম নেয়। সে হিসাবে টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা অন্তত ৩০ লাখ। জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী কালের কণ্ঠকে বলেন, আগে থেকেই প্রতি বছর দুই থেকে তিন লাখ শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকেছে।
গত বছর এ সংখ্যা অনেক বেড়েছে। নিয়ম হলো—প্রতি চার বছরে অন্তত একটি বড় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকা গ্রহণের এ ঘাটতি পূরণ করা। কিন্তু তা হয়নি। এতে টিকা না পাওয়া অরক্ষিত শিশুর সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ৩০ লাখের কাছাকাছি পৌঁছানোর কারণে হামের এই প্রাদুর্ভাব বা মহামারি দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, টিকা না পাওয়া বা দেরিতে পাওয়া—এর ফলে আগে নির্মূল হওয়া রোগগুলো আবার ফিরে আসতে পারে। যেমন—পোলিও ও নবজাতকের ধনুষ্টংকার। এ ছাড়া নির্মূলের পথে থাকা ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি ও রাতকানা রোগও বাড়তে পারে। বিশেষ করে এত দিন টিকার কারণে নিয়ন্ত্রণে থাকা যক্ষ্মা, হেপাটাইটিস-বি, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি ও নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়া বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিন বছরে টিকা পায়নি ২৫ লাখ শিশু : দেশে গত তিন বছরে কত শিশু টিকা পেয়েছে বা পায়নি, এ নিয়ে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে নেই। তবে লক্ষ্যমাত্রার কত শতাংশ টিকা দেওয়া গেছে, তার একটি হিসাব সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) ড্যাশবোর্ডে পাওয়া যায়।
গত ৫ এপ্রিল পর্যন্ত ইপিআই ড্যাশবোর্ডে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে টিকাদানের হার ৫৯.৬০ শতাংশ। ওই বছরে ইপিআইয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪১ লাখ ২৮ হাজার ৬২৯ শিশুকে টিকার আওতায় আনা। সে হিসাবে ড্যাশবোর্ড অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় ১৬ লাখ ৬৮ হাজার শিশু টিকা পায়নি।
এর আগের বছর ২০২৪ সালে টিকাদানের হার ছিল ৮৬.৭ শতাংশ। টিকাবঞ্চিত হয় পাঁচ লাখ ৪৮ হাজার ৯০৬ শিশু। ২০২৩ সালে ৯৩.৬ শতাংশ। ওই বছর বঞ্চিত শিশু ছিল দুই লাখ ৬৮ হাজার। ২০২১-২২ সালে শতভাগের বেশি টিকা প্রয়োগ দেখানো হয়েছে। শতাংশের হিসাবে তা যথাক্রমে ১০০.৬ ও ১০৩.৬ শতাংশ। এই হিসাব করা হয়েছে, বছরে গড়ে ৩৪ লাখ শিশু জন্মের হার ধরে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা শতভাগ প্রয়োগ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এখানে লক্ষ্যমাত্রা প্রকৃত শিশুর সংখ্যার চেয়ে অনেক কম ধরা হয়েছে। ফলে শতভাগ ছাড়িয়ে গেছে। এ ছাড়া শিশুদের এসব টিকা সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ কার্যকর। অর্থাৎ ১৫ শতাংশ শিশু টিকা নিয়েও অরক্ষিত থাকে। বছরে এ সংখ্যা ছয় লাখেরও বেশি।
২০২৫ সালে টিকাদান হঠাৎ এত কমে যাওয়ার কারণ জানতে সদ্য ওএসডি হওয়া ইপিআইয়ের উপপরিচালক ডা. মো. শাহরিয়ার সাজ্জাদকে ফোন করা হলে তিনি জানান, ড্যাশবোর্ডের তথ্যটি হালনাগাদ করা হয়নি। কারণ হালনাগাদের কাজটি যাঁরা করতেন, সেই স্বাস্থ্য সহকারীদের বেতন হয় ওপির (অপারেশন প্ল্যান) আওতায়। দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় তাঁরা কাজটি ঠিকমতো করেননি। এই উপপরিচালকের সঙ্গে কথা বলার দুই দিনের মধ্যে ইপিআইয়ের ড্যাশবোর্ড থেকে টিকা প্রদানের তথ্য সরিয়ে ফেলা হয়। এমনকি ওই ওয়েবসাইটে আর ঢোকাও যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে জানতে আবারও উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, ‘তথ্যটি এরই মধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় তা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মাঠ থেকে আসা তথ্য হালনাগাদ করে নতুন করে শিগগিরই ড্যাশবোর্ডে দেওয়া হবে।’
টিকা প্রদানের প্রকৃত সংখ্যা জানা সম্ভব হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি জানান, ২০২৫ সালে টিকা সরবরাহে বিলম্ব হলেও টিকা গ্রহণের সার্বিক হার ৯০ শতাংশের বেশি ছিল।
তাঁর এই দাবি যে অসত্য, তা ২০২৫ সালের মার্চে ওপি বাতিল প্রসঙ্গে তাঁরই দেওয়া বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে আছে। তিনি বলেছেন, ওপি বন্ধ করে বিকল্প ব্যবস্থা চালু করতে নানা কারণে বিলম্ব হওয়ায় ওই বছর টিকা সরবরাহ ব্যাহত হয়। প্রশ্ন ওঠে, যে বছর টিকা সরবরাহ ব্যাহত হলো, সেই বছর কী করে আগের স্বাভাবিক সরবরাহের বছরগুলোর চেয়ে টিকা প্রদানের হার বেশি বা সমান হয়?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং প্রথম দুটি এইচপিএনএসপির সদস্য ও তৃতীয়টির উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে হামের একটি বড় প্রাদুর্ভাব চলছে, যেখানে হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত এবং শত শত শিশু মারা গেছে। প্রকৃত পরিস্থিতি সরকারি রিপোর্টের চেয়েও খারাপ হতে পারে, কারণ অনেক রোগী হাসপাতালে আসে না।
তিনি বলেন, টিকার সংস্থান না থাকায় এই বিপুলসংখ্যক শিশু দীর্ঘ সময় ধরে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, যার ফল ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে—হাম মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের বেশির ভাগই হয় কোনো টিকা পায়নি অথবা সময়মতো সব ডোজ সম্পন্ন করেনি। হাম অত্যন্ত সংক্রামক এবং এর বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়তে প্রায় ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা জরুরি। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে বাকি শিশুরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে।
অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ওপি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ফলে টিকার কাভারেজ কমে যায় এবং শিশুদের বুস্টার বা দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া সম্ভব হয়নি। কোনো শিশু টিকা না পেলে সে অন্যদের জন্য সংক্রমণের উৎস হয়ে দাঁড়ায়, যা তার কাছ থেকে ১৭-১৮ জনের মধ্যে ছড়াতে পারে।
কী রোগে কখন কী টিকা : বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) অনুযায়ী, জন্মের পর থেকে ১৫ মাস বয়সের মধ্যে শিশুকে মোট ১২টি রোগ প্রতিরোধের জন্য টিকা দেওয়া হয়।
জন্মের পরপরই যক্ষ্মা প্রতিরোধে বিসিজি টিকা দেওয়া হয়। ৬, ১০ ও ১৪ সপ্তাহে পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা (ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টংকার, হুপিংকাশি, হেপাটাইটিস-বি, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা) এবং ওপিভি দেওয়া হয় পোলিও রোগের জন্য, আর পিসিভি দেওয়া হয় নিউমোনিয়ার জন্য। এ ছাড়া ৬ ও ১৪ সপ্তাহ বয়সে ইনজেকটেবল পোলিও (আইপিভি) দেওয়া হয়। ৯ ও ১৫ মাসে হাম ওরুবেলা প্রতিরোধে দুই ডোজ এমআর টিকা দেওয়া হয়। এ ছাড়া টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধের জন্য ৯ মাস বয়সে এক ডোজ টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (টিসিভি) দেওয়া হয়।
নিয়মিত টিকা কেন বন্ধ ছিল : উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে টিকা কেনা হতো স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে হঠাৎ ওপি বন্ধ করে দেয়। এরপর নতুন প্রকল্প দলিল তৈরি, প্রকল্প অনুমোদন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থ ছাড়- সবকিছুতেই বিলম্ব হয়।
এ বিষয়ে ডা. মো. শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, বাজেট ও ক্রয় পদ্ধতির পরিবর্তনই সংকটের মূল কারণ। ১৯৭৯ সালের পুরনো পদ্ধতি পরিবর্তন করে হঠাৎ রাজস্ব খাত থেকে অর্থায়নের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ফলে অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হয়ে পড়ে, যার ফলে এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা (এপিপি) প্রণয়নে বিলম্ব এবং মন্ত্রণালয়, সিসিজিপি ও সিসিইএ কমিটির অনুমোদনে সময় লাগায় সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। তিনি আরো বলেন, অনেক ক্ষেত্রে টিকার সরবরাহ থাকলেও প্রশিক্ষিত লোকবল, সরঞ্জামের অভাব ও প্রয়োজনীয় তহবিল না থাকায় তা শিশুদের মধ্যে প্রয়োগ করা যায়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, টিকা কেনার ব্যাপারে মহাপরিচালকের (ডিজি) বড় ভূমিকা থাকে। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কিছুদিন ডিজির পদ খালি ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এক বছরের বেশি সময় ডিজি ছিলেন অধ্যাপক আবু জাফর। বিএনপি সরকার গঠনের পর নতুন ডিজি হিসেবে দায়িত্ব নেন অধ্যাপক প্রভাত কুমার বিশ্বাস। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই হামের টিকা সংকটের পাশাপাশি এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।
অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, এই পরিস্থিতির জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাদের অযোগ্যতা ও সঠিক নেতৃত্বের অভাব দায়ী। ওপি বন্ধের পর কোনো বিকল্প পরিকল্পনা বা এক্সিট প্ল্যান না থাকায় জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে দীর্ঘ সময় অর্থের জোগান ছিল না।
ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন বন্ধ : দেশে এক বছরের বেশি সময় ধরে শিশুদের ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইন বন্ধ রয়েছে। বছরে দুবার এই ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও গত দুই বছরে হয়েছে মাত্র দুবার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ওপির মাধ্যমে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল কেনা ও বিতরণ হতো। ওপি বন্ধ করার পর নতুন বিকল্প না হওয়ায় ভিটামিন-এ ক্যাপসুল কেনা হয়নি। সর্বশেষ ২০২৫ সালের মার্চের আগের কেনা ক্যাপসুল দিয়ে ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়।
শিশুদের অন্ধত্ব ও পুষ্টিহীনতা দূর করতে ১৯৭৩ সাল থেকে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো শুরু হয়। তখন এটি জাতীয় রাতকানা রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম নামে পরিচালিত হতো। ১৯৯৫ সাল থেকে জাতীয় টিকাদান দিবসের সঙ্গে এটি যুক্ত করা হয়। ছয় মাস পর পর ৬-১১ মাস বয়সী শিশুকে নীল এবং ১২-৫৯ মাস বয়সী শিশুকে লাল রঙের ক্যাপসুল খাওয়ানো হতো। প্রতিবার গড়ে সোয়া দুই কোটি শিশুকে এই ক্যাপসুল দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা থাকে। ২০২৫ সালের মার্চে সর্বশেষ এই ক্যাম্পেইনে ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সী সোয়া দুই কোটি শিশুকে ভিটামিন-এ খাওয়ানো হয়। এর আগে ২০২৪ সালের মে মাসে এটি হয়েছিল।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মঞ্জুর আল মুর্শেদ চৌধুরী বলেন, ভিটামিন-এ শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই কার্যক্রম ব্যাহত হলে দীর্ঘ মেয়াদে পুষ্টিহীনতা ও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
জাতীয় পুষ্টি সেবার সাবেক লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. আঞ্জুমান আরা সুলতানা বলেন, ওপি বন্ধ থাকায় ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন করা যায়নি। ২০২৫ সালের ক্যাম্পেইনের ক্যাপসুল আগের ওপি থেকে কেনা হয়েছিল এবং পরিচালন ব্যয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বহন করে।
সংকটের মধ্যেও টিকার অপচয় : ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে টিকার চাহিদা ও সরবরাহ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বোচ্চ ২৮ শতাংশ পর্যন্ত টিকা ঘাটতি ছিল। ইপিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিসিজি টিকার চাহিদা ছিল ১৯ লাখ ৫০ হাজার ভায়াল, সরবরাহ হয়েছে ১৪ লাখ তিন হাজার ৮০ ভায়াল। ঘাটতি ছিল পাঁচ লাখ ৪৬ হাজার ৯২০ ভায়াল বা ২৮.০৪ শতাংশ। এক ভায়াল দিয়ে ২০ জনকে টিকা দেওয়া যায়। সে হিসাবে সম্ভাব্য কাভারেজ অনেক বেশি হলেও বাস্তবে টিকা পেয়েছে প্রায় ৫৬ লাখ ১২ হাজার শিশু।
কর্মকর্তারা জানান, একটি ভায়াল খুললে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবহার করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে একটি শিশুর জন্য একটি ভায়াল খুলতে হয়, ফলে বাকি অংশ নষ্ট হয়। এভাবে অপচয়ের হার ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। বিওপিভি টিকার চাহিদা ছিল ১৯ লাখ ১৫ হাজার ভায়াল, সরবরাহ হয়েছে ১৪ লাখ ৯৭ হাজার ১৩০ ভায়াল। ঘাটতি ছিল চার লাখ ১৭ হাজার ৮৭০ ভায়াল বা ২১.৮২ শতাংশ।
পেন্টা টিকার চাহিদা ছিল এক কোটি ৭৫ লাখ, সরবরাহ এক কোটি ৪৭ লাখ, ঘাটতি ২৭ লাখের বেশি (১৫.৪৪%)। পিসিভি টিকার চাহিদা ছিল ৪০ লাখ, সরবরাহ হয় ৩৮ লাখের কিছু বেশি, ঘাটতি ৫ শতাংশ। এমআর টিকার চাহিদা ছিল প্রায় ৩৪ লাখ, সরবরাহ হয় ২৪ লাখ ৬৯ হাজার, ঘাটতি ২৭ শতাংশ। টিডি টিকার চাহিদা ছিল ১৫ লাখ ভায়াল, সরবরাহ ১১ লাখ ৬৬ হাজার, ঘাটতি ২২ শতাংশ।
টিকা ও জনবল সংকট একযোগে : ইপিআইয়ের সাবেক কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন অর্থায়ন না থাকা, বেতন বকেয়া এবং জ্বালানি খরচ না পাওয়ায় টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। স্বাস্থ্য সহকারীদের একাধিক কর্মবিরতিও বড় প্রভাব ফেলেছে।
বর্তমানে কোথাও টিকা আছে কিন্তু কর্মী নেই, আবার কোথাও কর্মী আছে কিন্তু টিকা নেই। কোনো কোনো এলাকায় দুটিরই অভাব রয়েছে। দেশের ২৭টি জেলায় নতুন স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তবে বাকি ৩৭ জেলায় প্রায় ৪৫ শতাংশ পদ খালি। সারা দেশে টিকাকেন্দ্র রয়েছে প্রায় দেড় লাখ। এ ছাড়া পোর্টার নামে পরিচিত কর্মীরা টিকা উপজেলা থেকে টিকাদানকেন্দ্রে পৌঁছে দেন। সারা দেশে তাঁদের সংখ্যা এক হাজার ৩২৬। তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়া এবং কাজ না করায় টিকাদান ব্যাহত হয়েছে।