অধ্যক্ষ মো. বেলায়েত হোসেন: একটি সার্থক জীবনের কথা

রেহান উদ্দিন রোমান ॥
কিছু মানুষের জীবনকে শুধু পদ, পরিচয় বা অর্জনের তালিকায় ধরা যায় না। তাঁদের আসল পরিচয় ছড়িয়ে থাকে মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ভেতর, গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্মৃতিতে, সহকর্মীদের আস্থায় এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া মূল্যবোধে। বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক মো. বেলায়েত হোসেন ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। নিজের জন্য কতটা অর্জন করা গেল, তার চেয়ে অন্যের জন্য কী রেখে যাওয়া গেল, জীবনের সার্থকতা তিনি যেন সেখানেই খুঁজে নিয়েছিলেন।
১৯৪৮ সালের ২ জানুয়ারি বরিশাল সদর উপজেলার তৎকালীন রায়পাশা-কাড়াপুর ইউনিয়নের ইন্দ্রকাঠি গ্রামে এক কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা আফেজ উদ্দিন হাওলাদার ও মাতা সোনাবান বিবির পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। গ্রামের সহজ পরিবেশেই তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু। ১৯৬২ সালে হোগলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৬৪ সালে ব্রজমোহন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৬৬ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়ন করে ১৯৬৯ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
তাঁর ছাত্রজীবন কেটেছে বাঙালির অধিকারচেতনা ও রাজনৈতিক জাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে। প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন ও ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা তাঁর দেশভাবনা, সমাজচেতনা ও মানুষের প্রতি দায়বোধকে গভীর করে। পরবর্তী জীবনের নানা কাজেও তার ছাপ স্পষ্ট ছিল।
১৯৭০ সালের ১৬ আগস্ট প্রতিষ্ঠাকালীন প্রভাষক হিসেবে মুলাদী কলেজে যোগ দেন। শিক্ষকতা তাঁর কাছে শুধু পাঠদানের দায়িত্ব ছিল না; শিক্ষার্থীদের মানুষ করে তোলাও ছিল সেই দায়িত্বের অংশ। পরের বছর, ১৯৭১ সালে, সেই দায়বোধই তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত করে।
তাঁর মানবিকতার প্রকাশ ছিল আরও নীরব, আরও অন্তরালবর্তী। অর্থের অভাবে কোনো শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করতে পারছেন না জানতে পারলে, প্রয়োজন হলে নিজেই ধার করে টাকা এনে তাঁর ফরম পূরণের ব্যবস্থা করতেন। আবার কোনো কলেজশিক্ষক অন্যায়ভাবে চাকরি হারিয়ে পরিবারসহ চরম অর্থকষ্টে পড়লে, তিনি চাকরি ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসে গোপনে সেই পরিবারের পাশে দাঁড়াতেন, অর্থের ব্যবস্থা করতেন। প্রচারের আলো থেকে দূরে, মানুষের প্রয়োজনের মুহূর্তে এভাবেই নীরবে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। তাঁর জীবনে এমন মানবিক সহায়তার দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে আছে অসংখ্য, যার অনেকগুলোর কথাই হয়তো কখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
মানুষের সামাজিক অবস্থান বা সামর্থ্য দিয়ে তিনি সম্পর্কের মূল্য বিচার করতেন না। প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়ানো, বিপদে সহযোগিতা করা কিংবা সঠিক পরামর্শ দেওয়া ছিল তাঁর স্বভাবের অংশ। জাগতিক সম্পদের প্রতিও তিনি ছিলেন নির্মোহ। অর্থ ও প্রাচুর্যের চেয়ে পরিচ্ছন্ন জীবন, মানুষের আস্থা ও ভালোবাসাকে তিনি বেশি মূল্য দিয়েছেন।
এই মমতা শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বাড়ির মুরগি, কুকুর ও বিড়ালকে নিজের হাতে খাবার খাওয়াতেন, পুকুরের মাছকেও খাবার দিতে ভালোবাসতেন। জীবনের এই ছোট ছোট অভ্যাসে তাঁর মমতার একটি সহজ, অনাড়ম্বর রূপ ফুটে ওঠে ।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন ধর্মনিষ্ঠ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, নিয়মিত ধর্মচর্চা, ধর্মীয় বিধিবিধান পালন ছিল তাঁর জীবনের স্বাভাবিক অংশ। ২০১০ সালে তিনি পবিত্র হজ পালন করেন। একই সঙ্গে তাঁর ধর্মবোধের সঙ্গে ছিল অসাম্প্রদায়িকতা, উদারতা ও মানুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। ধর্ম তাঁর কাছে বিভাজনের নয়, বরং নৈতিক জীবনযাপনের পথ ছিল।
পারিবারিক জীবনেও তাঁর শিক্ষার মূল কথা ছিল মানুষ হয়ে ওঠা। স্ত্রী দিলারা বেগম, দুই পুত্র, পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে ছিল তাঁর আপন জগৎ। বড় ছেলে ড. মো: বাহাউদ্দিন গোলাপ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার এবং ছোট ছেলে রেহান উদ্দিন রোমান পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা। সন্তানদের জন্য তাঁর প্রত্যাশা ছিল শুধু পুঁথিগত শিক্ষা নয়, মানবিক মানুষ হয়ে ওঠা। ক্ষমা করতে শেখা, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো, সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের উপকারে আসা, এসবই ছিল তাঁর কাছে জীবনের প্রয়োজনীয় শিক্ষা। সন্তানদের তিনি এসব শুধু কথায় শেখাননি; নিজের জীবনযাপন দিয়েই তার অর্থ বুঝিয়েছেন। তাঁর জীবনই ছিল সন্তানদের জন্য সেই শিক্ষার সবচেয়ে জীবন্ত পাঠ।
২০২১ সালে করোনা মহামারির সময়ে তিনি ব্রেইনস্ট্রোক ও করোনায় আক্রান্ত হন। এরপর তাঁর শারীরিক সক্ষমতা অনেকটাই কমে যায়। জীবনের শেষ কয়েকটি বছর কেটেছে অসুস্থতা ও ঘরবন্দিত্বের মধ্যে। দীর্ঘ কর্মময় জীবনের পর শেষ সময়টুকু তিনি কাটিয়েছেন অনেকটা নীরবতার মধ্যে। ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে একটি জীবনের দৃশ্যমান অধ্যায় শেষ হয়েছে। কিন্তু মানুষের জীবন শুধু তার বেঁচে থাকার সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি যে মূল্যবোধে বিশ্বাস করেছেন, যে মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন, যে প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং যে প্রজন্মকে মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিয়ে গেছেন, তার মধ্যেই তাঁর জীবনের পরের অধ্যায়টি রয়ে গেছে।
ইন্দ্রকাঠির এক কৃষক পরিবারের যে শিশুটি শিক্ষার পথে যাত্রা শুরু করেছিলেন, সময়ের সঙ্গে তিনি হয়ে উঠেছিলেন শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, প্রশাসক, শিক্ষকনেতা, সংগঠক এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু এত পরিচয়ের ভিড়েও তাঁর সবচেয়ে সহজ পরিচয়টি হয়তো অন্যরকম: তিনি মানুষকে ভালোবেসে বাঁচতে চেয়েছিলেন এবং নিজের জীবনযাপন দিয়ে সেই বিশ্বাসের একটি উত্তরাধিকার রেখে গেছেন।
তাই তাঁর জীবনের সার্থকতা হয়তো কোনো পদ, পুরস্কার কিংবা সম্পদের হিসাবের মধ্যে নয়। তা ছড়িয়ে আছে মানুষের স্মৃতিতে, তাঁর গড়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে, তাঁর কাছ থেকে পাওয়া সহায়তা মনে রাখা মানুষগুলোর হৃদয়ে এবং সন্তানদের কাছে রেখে যাওয়া সেই সহজ শিক্ষায়: মানুষ হওয়া বড় কথা।
মানুষ একদিন চলে যায়। কিন্তু মানুষের জন্য করা কাজ, মানুষের মনে রেখে যাওয়া বিশ্বাস এবং ভালোবাসা সবসময় একই সঙ্গে থেমে যায় না। বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক মো: বেলায়েত হোসেনের জীবন সেই থেকে যাওয়ারই এক নীরব দলিল। তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
তাঁর স্মৃতির প্রতি অশেষ ভালোবাসা।
(লেখক মরহুমের কনিষ্ঠ পুত্র)
এইচকেআর