ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

Motobad news
শিরোনাম
  • বাবুগঞ্জের ভূতেরদিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হলেন ছাত্রদল নেতা মাহফুজুল আলম মিঠু  পাথরঘাটায় বলেশ্বর নদীতে ৯ যাত্রী নিয়ে বন বিভাগের ট্রলারডুবি, নিখোঁজ ১ শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের এক দফা দাবিতে বরিশালে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ পিরোজপুরে হত্যা মামলায় দুজনের যাবজ্জীবন পিরোজপুরে ঝর্ণা হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হাই কোর্টে খালাস আগৈলঝাড়া থানায় হামলা মামলার আসামি ঢাকায় ডিবির হাতে গ্রেফতার মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি বাদ, ছয় দফা দাবি নিয়ে সচিবালয়ে ৬ শিক্ষার্থী ভুল ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশে গণমাধ্যমকে সতর্ক করলো তথ্য অধিদপ্তর শিক্ষাভবনে তালাবদ্ধ ব্যারিকেড, সামনে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা দেশের সব মাদরাসায় ৫ আগস্ট ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ পালনের নির্দেশ
  • নদীতে ভিটেমাটি হারিয়ে জিওব্যাগের ওপর হাবিব দম্পতির বসবাস 

    নদীতে ভিটেমাটি হারিয়ে জিওব্যাগের ওপর হাবিব দম্পতির বসবাস 
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    পঞ্চাশোর্ধ্ব নারী নুরজাহান বেগম। তিনি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন সন্ধ্যা নদীর মাঝ বরাবর। বিকেলের শেষ আলো নদীর ঢেউয়ে ওপর পড়ে ঝলমল করে ওঠে, সেই ঢেউয়ের দিকেই আনমনে চেয়ে থাকেন তিনি। যেন নদীর বুকেই খুঁজে ফেরেন হারিয়ে যাওয়া জীবনের স্মৃতি।


    এক সময় যে নদী তাদের জীবিকা, সুখ আর স্বপ্নের সঙ্গী ছিল, সেই নদীই আজ তাদের নিঃস্ব করেছে। চারবার ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে নুরজাহান বেগম ও হাবিবুর রহমান ফকির দম্পতির ৬৫ শতাংশ জমি, বসতভিটা, গাছপালা আর সাজানো সংসার। এখন তাদের অস্থায়ী ঠিকানা নদীভাঙন ঠেকাতে ফেলা জিওব্যাগের ওপর নির্মিত ছোট্ট টিনের ছাপড়ার ঘর।

    বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর নগর ইউনিয়নের রমজানকাঠী গ্রামে গিয়ে দেখা মেলে এই দম্পতির অসহায় জীবনের বাস্তব চিত্র।

    রাজমিস্ত্রি হাবিবুর রহমান ফকির ও তার স্ত্রী নুরজাহান বেগম গত পাঁচ বছর ধরে জিওব্যাগের ওপর তৈরি ঝুঁকিপূর্ণ ঘরেই বসবাস করছেন।

    বর্ষাকালে ফুলে-ফেঁপে ওঠা সন্ধ্যা নদীর জোয়ারের পানি কখনও ঘরের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়, আবার কখনও ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতরেও। ঝড়-বৃষ্টি বা বন্যা এলে তখন আশ্রয়ের জন্য ছুটতে হয় অন্যের বাড়িতে। তবুও তারা এই নদীপাড় ছেড়ে কোথাও যেতে পারেননি। কারণ এখানেই জড়িয়ে আছে তাদের শৈশব, সংসার, ভালোবাসা আর অসংখ্য স্মৃতি।

    নুরজাহান বেগম বলেন, জীবনের কত স্মৃতি জড়াইয়া আছে এই জায়গাডায়। একসময় জমিতে ফসল হইতো, সেই ফসল বিক্রি কইরা সংসার চলতো। স্বামীর ৬৫ শতাংশ জমি ছিল, বাড়িঘর আছিল। সব নদী গিল্লা খাইছে। এখন বাকি শুধু আমরা দুইজন। অসহায় জীবনের মধ্যেও সুখ খুঁজি ওই নদীর দিকে তাকাইয়া।

    কথা বলতে বলতে বারবার আকাশের দিকে তাকাচ্ছিলেন তিনি। চোখে ছিল দীর্ঘদিনের না বলা কষ্টের ছাপ। তিনি আরও বলেন, না খাইয়া থাকলেও লজ্জায় কারও কাছে হাত পাতি না। আল্লাহ যেভাবে রাখছে, সেভাবেই ভালো আছি। 

    হাবিবুর রহমান ফকিরের কণ্ঠেও ছিল অসহায়ত্বের ভার। এক সময় এলাকায় স্বচ্ছল মানুষ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন তিনি। রাজমিস্ত্রির কাজের পাশাপাশি জমির ফসলেও চলত সংসার। কিন্তু নদীভাঙনের একের পর এক আঘাতে সবকিছু বদলে যায়।

    তিনি বলেন, ছোটবেলা থেইকা এইখানে বড় হইছি। অনেক জমি আছিল, বাপ-দাদার ভিটা আছিল। ভালোই জীবন চলতেছিল। সব কাইরা নিছে নদী। চারবার আমার ঘর নদীতে চইলা গেছে। সব নদীতে নিয়া যাওনের পর সরকার জিওব্যাগ ফেলছে। এখন ওই জিওব্যাগের ওপরই থাকি।

    নদীভাঙনের দুশ্চিন্তা আর কষ্ট সহ্য করতে না পেরে তিনবার ব্রেইন স্ট্রোকও করেছেন হাবিবুর রহমান। এখন কানে কম শোনেন। চলাফেরা করতে পারলেও আগের মতো ভারী কাজ করতে পারেন না। বয়স ও অসুস্থতায় আয়ও কমে গেছে অনেক।

    তাদের দুই ছেলে থাকলেও তারাও দিন আনে দিন খায়। বিয়ে করে পরিবার নিয়ে অন্যত্র ভাড়া বাসায় থাকেন। ফলে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়ানোর সামর্থ্যও তাদের খুব বেশি নেই।

    স্থানীয় বাসিন্দা ভাষাই মোল্লা বলেন, হাবিব ফকিরের বাড়ি চারবার নদীতে ভাঙছে। তার সব জমিজমা নদীগর্ভে গেছে। এখন তার নিজের কোনো জমি নাই, যেখানে ঘর তুলে থাকতে পারে। তাই জিওব্যাগের ওপর দোকানের মতো পাটাতন করে টিনের ছাপড়া দিয়ে দুইজন মানুষ বসবাস করতেছে। হাবিব ভাই আগের মতো কাজও করতে পারে না। খুব কষ্টে দিন চলে তাদের।

    গ্রামবাসীরা জানান, সন্ধ্যা নদীর ভয়াল ভাঙনে এ অঞ্চলের অনেক পরিবারই নিঃস্ব হয়েছে। কেউ অন্যত্র চলে গেলেও অনেকেই এখনও মায়ার টানে নদীপাড় ছাড়তে পারেননি।

    স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান কামরুল আহসান হিমু বলেন, আমি এই এলাকার দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান। হাবিব ভাই আমাদের আত্মীয়, কিন্তু তার এই পরিণতি সম্পর্কে আমাকে জানায়নি। সাংবাদিকদের কাছ থেকে বিষয়টি জেনেছি। এটা আসলেই আমার জন্য লজ্জার। আমি এখান থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করি। মনে হয়নি ঘরটিতে কেউ বসবাস করে। যাইহোক, আমি চেষ্টা করব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে তাদের জন্য কিছু করার। এছাড়া সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা নিয়েও তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কষ্ট সত্যিই অনেক হৃদয় বিদারক।

    উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা উল হুসনা বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত মানবিক ও হৃদয়বিদারক। আমি স্থানীয় চেয়ারম্যানের সাথে হাবিব ও নুরজাহান দম্পতির অসহায় জীবনযাপনের বিষয়ে কথা বলেছি। আমরা পরিবারটির বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে সরকারি সহায়তার আওতায় আনার চেষ্টা করব। পাশাপাশি নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য পরিবারগুলোর জন্যও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

    সন্ধ্যা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে নুরজাহান বেগমের চোখে তখনও স্থির দৃষ্টি। হয়তো তিনি এখনও খুঁজে ফেরেন সেই হারিয়ে যাওয়া ভিটেমাটি, উঠানের গাছ কিংবা ফসলের মাঠ। নদী সব কেড়ে নিয়েছে, তবুও নদীর দিকেই তার মায়াভরা তাকিয়ে থাকা যেন জীবনভর না ফুরানো এক দীর্ঘশ্বাস। শুধু হাবিব-নুরজাহান দম্পতিই নন, সন্ধ্যা নদীর ভাঙনে প্রতিবছর ওই এলাকার শতাধিক পরিবারের না বলা কষ্ট চাপা পড়ে থাকে নীরবে।


     


    এইচকেআর
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ