স্বতন্ত্রদের দমনে ব্যস্ত নৌকার মাঝিরা

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল বিভাগের ২১টি আসনের ১৭টিতেই প্রতিদ্ব›িদ্বতা করছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। যাঁরা স্থানীয় পর্যায়ে যেমন প্রভাবশালী, তেমনি জনপ্রিয়তাও রয়েছে। ফলে প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নৌকার বিজয় নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীতরা।
আর তাই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের দমাতে একেরপর এক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। চাপ সৃষ্টি করে স্বতন্ত্রদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করাতে লবিং চালাচ্ছেন কেন্দ্রের উচ্চ মহলে। তাতে সুফল না পেয়ে বিদ্রোহী দমাতে তাদের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেছেন অনেকেই।
তবে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের এমন তৎপরতায় বিচলিত নন বলে জানিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং তাদের সমর্থকরা। তাদের মতে নির্বাচনে বিদ্রোহীদের বিপক্ষে নিজের অবস্থান বুঝতে পেরেই অপতৎপরতা শুরু করেছে নৌকার প্রার্থীরা।
জানা গেছে, ‘আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল বিভাগের ২১টি আসনে প্রতিদ্ব›িদ্বতার জন্য বিভিন্ন দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ১৭২ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। এদের মধ্যে যাচাই-বাছাইতে মনোনয়নপত্রের বৈধতা পেয়েছেন ১৩৭ জন। গত ৫ ডিসেম্বর থেকে বাতিলের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধদের আপিল গ্রহণ শুরু হয়েছে। যা চলবে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত। আপিলের শুনানি হবে ১০-১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এরপর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের জন্য সুযোগ থাকবে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
এদিকে মনোনয়নপত্রে ত্রæটির কারণে এখন পর্যন্ত প্রার্থিতা হারিয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা নৌকা মনোনীত প্রার্থী ড. শাম্মী আহমেদ, ঝালকাঠির বজলুল হক হারুনের মতো প্রার্থীরা।
তবে বেশিরভাগ আসনেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্রের বৈধতা পেয়েছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতারা। ফলে নৌকার প্রার্থীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। তাই তাঁরা নির্বাচনে নৌকার প্রচার রেখে আপাতত ব্যস্ত সময় পার করছেন বিদ্রোহীদের দমাতে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘২১টি আসনের মধ্যে সর্বোচ্চ আলোচনায় সিটি করপোরেশন ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত বরিশাল-৫ আসন। কেননা আসনটিতে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য জাহিদ ফারুক শামীমের বিপক্ষে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ।
আসনটিতে জাতীয় পার্টিসহ অন্য দলের প্রার্থী এবং সালাউদ্দিন রিপন নামের আরেকজন বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলেও লড়াইটা জাহিদ ফারুক ও সাদিক আবদুল্লাহর মধ্যেই হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। কেননা জাহিদ ফারুক নৌকার টিকিট পেলেও জেলা, মহানগর এবং সদর উপজেলা আওয়ামী ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বৃহৎ অংশ অবস্থান নিয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে। যা নৌকা ডুবির প্রধান কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।
তাই স্বতন্ত্র সাদিক আবদুল্লাহকে দমাতেই আপাতত ব্যস্ত জাহিদ ফারুক ও তাঁর সমর্থকরা। এরই মধ্যে গত ৩ নভেম্বর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের দিন সাদিক আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে রিটার্নিং অফিসারের নিকট স্ত্রীর সম্পদের হিসাব গোপন করার অভিযোগ করেন জাহিদ ফারুকের সমর্থক মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট আফজালুল করিম।
সেখান থেকে নাকচ হয়ে গত বুধবার ঢাকায় নির্বাচন ট্রাইব্যুনালে আপিল করেছেন তিনি। আফজালুল করিম জানান, ‘সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ তাঁর স্ত্রীর নামে আমেরিকার ওয়াশিংটনে বাড়ি রয়েছে। এমনকি সাদিক আবদুল্লাহ নিজেও আমেরিকার নাগরিক। যা হলফনামায় গোপন করা হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের বিধান মতে দ্বৈত নাগরিকরা বাংলাদেশের নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। এসব বিষয়ে প্রমাণসহ নির্বাচন ট্রাইব্যুনালে আপিল করেছি।
তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাদিক আবদুল্লার বিরুদ্ধে কোন আপিল করা হয়েছে কী-না জানা নেই বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহিদ ফারুক শামীম। তিনি বলেন, ‘আমি বাহিরে যাচ্ছি। এ বিষয়ে আমার কাছে কোন তথ্য নেই। আমার পক্ষে কেউ আপিল করে থাকলেও তা আমাকে জানানো হয়নি। আগামী রোববার বিষয়টি বলতে পারবো।
এ প্রসঙ্গে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট একেএম জাহাঙ্গীর বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালে আপিলের বিষয়টি শুনেছি। তবে আপিলের বিষয়ে এখনো কোন সিদ্ধান্ত হয়নি জানিয়ে জাহাঙ্গীর বলেন, ‘তাঁদের (জাহিদ ফারুক শামীম) পায়ের নিচে মাটি নেই, দুর্বল হয়ে গেছে। এই নেতা-ওই নেতার কাছে দৌঁড়াচ্ছে। মূলতঃ তাঁরা আতঙ্কিত। স্বতন্ত্র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর জনপ্রিয়তাকে ভয় পেয়েই তার বিরুদ্ধে এগুলো করছে। এতে লাভ হবে না। কেননা সাদিক আবদুল্লাহ আমেরিকার নাগরিক থাকাবস্থায় সিটি করপোরেশন নির্বাচন করেছে। পাঁচ বছর মেয়র ছিলেন। তাই আশাকারছি তাদের এই আপিল কোন কাজে আসবে না।
এদিকে, শুধু বরিশাল সদর আসনেই নয়, বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ) আসন নিয়েও লড়াই চলছে বর্তমান সংসদ সদস্য ও স্বতন্ত্র প্রার্থী পংকজ নাথ এবং আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ড. শাম্মী আহমেদের মধ্যে। ইতিপূর্বে রিটার্নিং অফিসারের নিকট পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেন করেন তাঁরা। তবে বাছাইতে পংকজ নাথ টিকে গেলেও বাতিল হয়েছে শাম্মী আহমেদের মনোনয়ন। যদিও বাতিলের বিপক্ষে তিনি কমিশনে আপিল করেছেন বলে জানা গেছে।
বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনেও চলছে টিকে থাকার লড়াই। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা বলছেন, আসনটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মেজর (অব.) আবদুল হাফিজ মল্লিক মনোনয়ন পেলেও শক্তিশালী প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শামসুল আলম চুন্নু। তবে ঋণ খেলাপীর দায়ে তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে রিটার্নিং অফিসার। বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন চুন্নু। প্রার্থিতা ফিরে পেলে আসনটিতে নৌকার বিজয়ে বড় বাধা হতে পারেন চুন্নু।
বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করছেন সাবেক সংসদ সদস্য মনিরুল ইসলাম মনি ও একে ফাইয়াজুল হক রাজু। তাঁরা দুজনেই স্থানীয় পর্যায়ে বেশ প্রভাবশালী এবং জনপ্রিয়। আর এ নিয়ে চিন্তিত আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী তালুকদার মো. ইউনুস।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘শুধুমাত্র বরিশাল, ভোলা এবং বরগুনার চারটি আসন বাদে বাকি ১৭টি আসনেই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে। এসব আসনে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে অন্য দলগুলোর পাশাপাশি নিজ দলের বিদ্রোহীদের সাথেও লড়তে হবে আওয়ামী লীগকে। যা নিরপেক্ষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন দলের নেতাকর্মীরা।
নৌকা বিরোধী প্রসঙ্গে বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বরিশাল-২ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস বলেন, ‘আমাদের দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাক্ষরিত মনোনয়নপত্র যারা পেয়েছেন তারাই একমাত্র দলীয় প্রার্থী। এখানে অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। তবে আমি বিশ্বাস করি যারা সংগঠন করে, যারা আদর্শকে বিশ্বাস করে তারা কেউ নৌকার বিরুদ্ধে নির্বাচন করবে না। যারা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন তাদের বিষয়ে আমরা আমাদের সংগঠনের মাননীয় সভাপতি এবং সংগঠনের হাইকমান্ড যেভাবে নির্দেশনা দিবেন সেইভাবে পদক্ষেপ নিবো।
এমএন