'আপন নীড় কালিবাড়িতে ফিরলেন আফতাব'

বরিশাল মহানগর শ্রমিক লীগ নেতা আফতাব হোসেন আবারও রাজনৈতিক পক্ষবদল করেছেন। এক সময়কার প্রতাপশালী এই নেতা কদিন আগেও সদর আসনের এমপি জাহিদ ফারুকের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু আজ সোমবার তাকে দেখা গেলো বরিশাল ৫ সদর আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বঞ্চিত স্বতন্ত্র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ’র সভামঞ্চে।
কালিবাড়ি রোডে সাদিক আব্দুল্লাহ’র বাসায় অনুষ্ঠিত ওই সভায় তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে বেশ কিছু বক্তব্যও রেখেছেন। শোনা গেছে, তিনি এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল সদর আসনে নৌকার প্রার্থী জাহিদ ফারুকের প্রতিদ্বন্দ্বী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদিক আব্দুল্লাহ অনুকূলে সরব ভূমিকা রাখতে চাইছেন।
হঠাৎ কি নিয়ে দ্বন্দ্বে সাদিকবিরোধী এই শ্রমিক নেতার সাথে এমপি জাহিদ ফারুকের দুরত্ব বাড়ল বা এর নেপথ্য হেতু কী তা নিয়ে নানান আলোচনা স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে চলমান আছে।
এনিয়ে বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের সাবেক সভাপতি আফতাব কোনো ব্যাখ্যা না দিলেও অনুসন্ধানে বহু তথ্য-উপাত্ত্ব পাওয়া গেছে, যেগুলো বিশ্লেষণ করলে আফতাব এবং জাহিদ ফারুকের দূরত্ব তৈরির হিসেব মেলানো অসম্ভব নয়।
কারও কারও মতে আফতাব হয়তো কোনো বড় ধরনের প্রলোভন পেয়েই জাহিদ ফারুকের তরী রেখে তার রাজনৈতিক গুরু আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ’র ছেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাদিকের অনুকূলে অবস্থান নিয়েছেন।
এবং তিনি সাদিকের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চান বলেও ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়ে ব্যাপক আলোচনা এসেছেন। যদিও সাদিক তার চাচা আফতাবকে কী দিচ্ছেন বা দিবেন সেটা ছাপিয়ে গেছে, জাহিদ ফারুকের সাথে শ্রমিক নেতা আফতাবের নির্বাচনপূর্ব দূরত্ব নিয়ে। কয়েকদিন আগেও যেখানে জাহিদ ফারুকের পাশে থেকে বরিশাল সিটি নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী আবুল খায়ের আব্দুল্লাহকে জয়ী করতে কাজ করেছেন আফতাব, এরই মধ্যে আবার কি নিয়ে বিরোধে জড়ালেন উভয় নেতা এমন প্রশ্ন রাজনৈতিক অঙ্গনে কান পাতলেই শোনা যায়।
এনিয়ে শ্রমিক লীগ নেতা না মুখ খুললেও সাদিক অনুসারীদের অভিযোগ, আফতাবকে জাহিদ ফারুক এবং নতুন সিটি মেয়র এক ধরনের ব্যবহার করেছেন। সিটি নির্বাচনে তিনি ব্যাপক ভূমিকা রাখলেও তাকে পদে পদে বেইজ্জতি করা হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আফতাব পক্ষবদলের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তিনিসহ তার কর্মী-বাহিনী সাদিক আব্দুল্লাহ’র পক্ষে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন।
সাদিক অনুসারীদের দাবি, শ্রমিক নেতা আফতাব এক সময় সাদিক আব্দুল্লাহ’র পিতা আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ’র রাজনীতি করতেন। অবশ্য এ জন্য তাকে বেশ কয়েকবার দলীয় ঘরনার নেতাদের রোষানলেও পড়ে পক্ষবদল করতে হয়।
কিন্তু তিনি এখন বুঝতে পেরেছেন বরিশাল আওয়ামী লীগ মানেই আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ’র পরিবার এবং সে কারণেই আফতাব জাহিদ ফারুকের সঙ্গ ত্যাগ করে আপন নীড় কালিবাড়িতে ফিরে এসেছেন। বিপরিতে সাদিক আব্দুল্লাহসহ সকল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী তাকে গ্রহণ করে নিয়েছেন।
আফতাবের এই পক্ষবদল নিয়ে জাহিদ ফারুক বা সিটি মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতের অনুসারীদের কোনো মন্তব্য না পাওয়া গেলেও বেশ কয়েকটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, বরিশাল জেলা বাস শ্রমিক গ্রুপের সভাপতি আফতাব ২০১১ সনে সাবেক সিটি মেয়র শওকত হোসেন হিরনের সাথে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লে নথুল্লাবাদে শ্রমিক অসন্তোস দেখা দেয়।
তখন আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ অনুসারী এই নেতা অনেকটা রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক চাপের মুখে বরিশাল ত্যাগে বাধ্য হন। পরবর্তীতে দীর্ঘদিন পরে তিনি সমঝোতার ভিত্তিতে বরিশালে এসে ফের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ নেন। তবে ২০১৮ সালে সাদিক আব্দুল্লাহ বরিশাল সিটির মেয়র নির্বাচিত হলেও তার অনুগতরা টার্মিনালে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে আফতাব হয়ে পড়েন কোনঠাসা।
সূত্রটি জানায়, এরপর দীর্ঘদিন আফতাব আলোচনার বাইরে থাকলেও তিনি বরিশাল সদর আসনের এমপি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর সাথে যোগাযোগ রাখছিলেন। চলতি বছরের জুনে বরিশাল সিটি নির্বাচনে সাদিক আব্দুল্লাহ’র চাচা খোকন সেরনিয়াবাত নৌকার টিকিট নিয়ে আসলে প্রতিমন্ত্রীর সাথে আফতাবও মাঠে নামেন। এবং তাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় বরিশাল সিটিতে নৌকা বিপুলসংখ্যক ভোটে জয়লাভ করে।
জানা যায়, সিটি নির্বাচনে খায়ের আব্দুল্লাহ’র পক্ষে আফতাব মাঠে নামলেও তিনি নথুল্লাবাদে সাদিক অনুসারীদের হঠিয়ে সেই পুরাতন সিংহাসন দখল চেষ্টায় মরিয়া ছিলেন। এবং আবুল খায়ের নির্বাচনে জয়লাভ করলে তিনি নথুল্লাবাদ টার্মিনালের পুরো নিয়ন্ত্রণ তার কব্জায় নিয়ে নেন, যে বিষয়টি ভালো ভাবে নেননি জাহিদ ফারুক শামীম। এছাড়া আফতাবের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ এবং তার অনুসারীরাও সংক্ষুব্ধ হয়।
জানা গেছে, ১৪ নভেম্বর সিটিতে মেয়র আবুল খায়ের দায়িত্বগ্রণের দুদিন আগেই আফতাবকে টার্মিনাল থেকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে বসানো হয় কেন্দ্রীয় যুবলীগ সদস্য ও বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অসীম দেওয়ানকে, যিঁনি সিটি মেয়র আবুল খায়েরের প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার বলে কথিত আছে। অবশ্য যখন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তখন শ্রমিক নেতা আফতাব বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণ করছিলেন। জানা গেছে, নথুল্লাবাদে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়টি আফতাব বিদেশে বসেই শুনেছেন এবং সেখান থেকে অভিমানে তিনি জাহিদ ফারুক এবং আবুল খায়েরের সঙ্গ ত্যাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। পাশাপাশি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এবং তার ছেলে বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের কর্ণধর সাদিক আব্দুল্লাহ’র সাথে যোগযোগ করেন। এমনকি দেশে ফিরে সংসদ নির্বাচনে সাদিকের পক্ষে কাজ করার ঘোষণাও দেন।
দেশে ফিরেই তিনি সোমবার স্বতন্ত্র সাদিকের সভামঞ্চে উঠলেন, নেতাকর্মীদের নিয়ে নিলেন নির্বাচনে কাজ করার অঙ্গীকার। আফতাবকে সাদিক আব্দুল্লাহ সাদরে গ্রহণ করলেও তাকে ঘিরে আলোচনা কমছে না।
কেউ কেউ বলছেন, বাস টার্মিনালের চেয়ার থেকে সরিয়ে দেওয়ায় আফতাব অপমানিত হয়েছেন, ক্ষোভে জাহিদ ফারুক এবং আবুল খায়েরের সঙ্গ ত্যাগ করেছেন। এখন হয়তোবা সাদিক আব্দুল্লাহ এমন হোপ দিয়েছেন যে, তিনি বরিশাল ৫ আসনে এমপি নির্বাচিত হলে তাকে (আফতাব) কোনো গুরুদায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। আবার এমটিও হতে পারে যে, দুসময়ে সাদিক আব্দুল্লাহ তাকে কাছে ডেকেছেন এবং তিনি তাতে সাড়া দিয়ে ছুটে এসেছেন।
নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনালের একটি সূত্র জানায়, বিদেশে চিকিৎসারত অবস্থায় চেয়ার কেড়ে নেওয়ায় শ্রমিক নেতা আফতাব লজ্জিত হয়েছেন। এবং মালিক সমিতিতে পদ নেই এমন ব্যক্তি অসীম দেওয়ানকে কয়েক দিনের ব্যবধানে পদ দিয়ে জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি করায় তিনি ও তার অনুগত শ্রমিকেরা সংক্ষুব্ধ হয়েছেন। সেই ক্ষোভ থেকেই প্রতাপশালী শ্রমিক নেতা আফতাব বরিশাল সদর আসনের নৌকা প্রার্থী জাহিদ ফারুক এবং নবনির্বাচিত মেয়রের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। এবং আগামীতে যতদিন বেঁচে আছেন, সাদিক ঘরনার রাজনীতি করে যাবেন বলেও ঘোষণা করেছেন কাশিপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আফতাব।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, আজ আনুষ্ঠানিকভাবে আফতাব জাহিদ ফারুকের সঙ্গ ত্যাগ করলেও তার মত আরও অনেকে মুখিয়ে আছেন কালিবাড়িতে তরী ভিড়াতে, তাদেরকেও নেতা সাদিক স্বাগত জানিয়েছেন। সূত্রটি জানায়, যারা এখন কালিবাড়িমুখী হচ্ছেন, তাদের অনেকেই সাদিক আব্দুল্লাহ’র পিতার সাথে রাজনীতিতে করেছেন।’
এইচকেআর