ঢাকা শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

Motobad news
শিরোনাম

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে মুখোমুখি বরিশাল আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপ

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে মুখোমুখি বরিশাল আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপ
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীরের বক্তব্য নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে আওয়ামী লীগের দুই গ্রæপ।
গত ২৮ নভেম্বর মহানগর আওয়ামী লীগের শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশে তাঁর দেওয়া বক্তব্যকে দলীয় শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বলে অভিযোগ করেছেন সদর আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া সংসদ সদস্য জাহিদ ফারুক শামীম অনুসারীরা।
এমনকি ওই বক্তব্যের প্রতিবাদে শনিবার বেলা ১১টার দিকে মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি একেএম জাহাঙ্গীরের অপসারণ দাবি করে প্রতিবাদ সমাবেশে এবং মিছিলও করেছে এ অংশটি।
অপরদিকে, ‘প্রতিবাদকারী অংশটির রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি একেএম জাহাঙ্গীর। যারা তাকে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছে তাঁরা আওয়ামী লীগের কেউ নয়, বরং তাঁরা সুবিধাবাদী এবং চরিত্রহীন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২৬ বছর পূর্তি উদ্যাপনে শনিবার বিকেলে নগরীর সদর রোড শহীদ সোহেল চত্বরে দলীয় কার্যালয়ের সামনে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে এমন মন্তব্য করেন একেএম জাহাঙ্গীর।
ফলে নির্বাচনের আগ মুহ‚র্তে আওয়ামী লীগের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, এ নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে অস্থিরতাও আরও ঘণিভ‚ত হচ্ছে। এ নিয়ে সংঘাত-সংঘর্ষের শঙ্কাও করছেন কেউ কেউ।
জানা গেছে, ‘আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল সদর-৫ আসনে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়েছে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীমকে। তবে সিটি ও সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ একই আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। এমনকি বরিশাল জেলা, মহানগর এবং সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের বৃহৎ অংশ তাকেই সমর্থন দিয়েছেন। যাদের মধ্যে একজন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর।
গত ২৮ নভেম্বর দেশব্যাপি বিএনপি-জামায়াতের অসন্ত্রাস-নৈরাজ্যের প্রতিবাদে নগরীর সদর রোডে শহীদ সোহেল চত্বরে দলীয় কার্যালয়ের সামনে শান্তি সমাবেশের আয়োজন করে মহানগর আওয়ামী লীগ। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন একেএম জাহাঙ্গীর।
তিনি তাঁর বক্তৃতায় গত ১২ জুন অনুষ্ঠিত বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বলেন, ‘আমাদের পাকা ফসল কেটে আরেকজন ঘরে তুলবে, তা হতে দেওয়া হবে না। আমরা কোন বহিরাগতকে সুযোগ দেব না। সিটি নির্বাচনে আমাদের গাধা বানিয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতার্মীদের নানা ভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। ওই নির্বাচনের মতো আর খালি মাঠে গোল দিতে দেব না। এবার খেলা হবে। জনগণ ভোটকেন্দ্রে যাবে। প্রশাসন ব্যবহার করে বাক্স ভরবেন, সেই সুযোগ আর নেই’।
মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতির এমন বক্তব্যের পর থেকেই নগরজুড়ে আওয়ামী লীগের অপর অংশের নেতাকর্মীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। যারা বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র আবুল খায়ের আবদুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীমের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তাঁরা একেএম জাহাঙ্গীরকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় তোলেন। দাবি করেন তাঁর অপসারণের।
এছাড়া তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদে শনিবার নগরীর সদর রোডে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে সমাবেশ করে এই অংশটি। এতে সভাপতিত্ব করেন মহানগর আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি আফজালুল করিম। অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন- আ’লীগ নেতা আনিস উদ্দিন আহম্মেদ শহীদ, লস্কর নুরুল হক, মহানগর যুবলীগের আহŸায়ক নিজামুল ইসলাম নিজাম, যুগ্ম আহŸায়ক মাহমুদুল হক খান মামুন, শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি রেজাউল হক হারুন, জেলা শ্রমিকলীগের সভাপতি শাহজাহান হাওলাদার, ওয়ার্ড কাউন্সিলর এনামুল হক বাহার, যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অসীম দেওয়ান, মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জসিম উদ্দিন ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মঈন তুষার প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, ‘আওয়ামী লীগের শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশে মহানগরের সভাপতি একেএম জাহাঙ্গীর সিটি নির্বাচনকে প্রশ্নবৃদ্ধ করেছেন। তিনি তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্চ করেছেন। আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে তাঁর মুখে এমন বক্তব্য সংগঠন বিরোধী। তাই একেএম জাহাঙ্গীরের অপসারণসহ মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি গঠনের দাবি জানান তাঁরা।
সমাবেশ শেষে বরিশাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বর থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন নেতা-কর্মীরা। মিছিলটি সদর রোড প্রদক্ষিণ করে অশ্বিনী কুমার হলের সামনে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে অবস্থান নিয়ে একেএম জাহাঙ্গীরের অপসারণ চেয়ে বিভিন্ন সেøাগান দেন নেতাকর্মীরা।
অপরদিকে, আওয়ামী লীগের একাংশের নেতাকর্মীদের বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়েছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট একেএম জাহাঙ্গীর। শনিবার জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির ২৬ বছর পূর্তি উদ্যাপন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী জাহিদ ফারুক শামীম ও তার অনুসারীদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘নৌকা আমাদের মাথার তাজ, সেই নৌকায় অদ্যক্ষ মাঝি থাকলে যাত্রীদের ডুবিয়ে মারবে। ডুবন্ত নৌকায় আমরা উঠতে চাইনা। আমরা নৌকাকে সুরক্ষা করতে চাই। সবেমাত্র খেলা শুরু। নির্বাচনের প্রতীক দেওয়া হয়নি, এতো সকালেই কেন পাগল হয়ে গেলো, উম্মাদ হয়ে গেলো জানি না।
তিনি বলেন, ‘আমরা যাঁরা আওয়ামী লীগ করি, তৃণমূল থেকে আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই পর্যন্ত এসেছি। আমাদের চামড়া গন্ডারের মতো মোটা। এই চামড়া খসে নেওয়ার যাবে না, ভয়-ভীতি দেখিয়ে ঘরে তোলা যাবে না, জেলখানার লোহা ভয় পাওয়ার মতো আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নয়।
গত বুধবার আওয়ামী লীগের শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশের বক্তব্যের বিষয়ে সাংবাদিক, প্রশাসন, সুশীল সমাজ এবং দলীয় নেতাকর্মীসহ সকলের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘গত বুধবার এখানে দাঁড়িয়ে কিছু কথা বলেছি। আমার বক্তব্যটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুনে তার পরে মন্তব্য করেন, তার পরে আমার বিরুদ্ধে লেখেন। আমার আপত্তি নাই। আমি তো পরিস্কার বলেছি, এবার নির্বাচন হবে স্বচ্ছা এবং নির্বাচনে মানুষের ঢল নামবে কেন্দ্রে। আর প্রশাসন কারোর নয়। প্রশাসন কোন দলের না, কোন প্রার্থীর না। প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের নির্দেশক্রমে ভোট গ্রহণ করবে। এখানে জালিয়াতি করার কোন সুযোগ নাই।’
জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমাদের দলের সাধারণ সম্পাদক জননেতা ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘কোন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে উঠিয়ে দেয়ার আর কোন সম্ভাবনা নাই। সুতরাং যদি কোন স্বতন্ত্র প্রার্থী হেবিওয়েট হয়ে থাকে, সে যদি জনগণের মতবাদ নিয়ে আসতে পারে, আমি কেন বাধা দেবো, দল কেন বাধা দেবে। সুতরাং ভয়ের কোন কারণ নাই। সেক্রেটারি (সাদিক আবদুল্লাহ) বলেছেন, আমাদেরকে তারা বিভিন্নভাবে ঝগড়া-ঝামেলায় ফালানোর পাঁয়তারা চলাচ্ছে। আমরা সেই পথে হাটবো না।
এসময় প্রশ্ন ছুঁড়ে একেএম জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আজকে যাঁরা ওখানে (জাহিদ ফারুক শামীমের পক্ষে), ওদের কারও ঘরের ঠিকানা নেই। ওরা যেখানে সুযোগ পায় সেই ঘরে ঢুকে যায়। আমার কয়েকজন বন্ধু আছে আমি তাদের দেখেছি সুবিধাবাদী, যখন যে ঘর খোলা থাকে সেই ঘরেই ঢোকে। ইতিপূর্বে সফল মেয়র শওকত হোসেন হিরনের ঘরে ঢুকে তাকে তছনছ করে দিয়েছে। আবার এই সাদিক আবদুল্লাহর নেতৃত্বে এসে ঢুকেছিল, কত কথা বলার পরে এসেছে। আজকে আমাদের বর্তমান মেয়র মহোদয়, আমি বিশ্বাস করি উনি দক্ষতার সাথে সিটি করপোরেশন পরিচালনা করবেন। আপনি আমার ভাই, আপনি শহীদ পরিবারের সন্তান, ওইগুলো থেকে আপনি দূরে থাকেন। ওদের কোন চরিত্র নাই। আপনাকে ওরা খেয়ে ফেলবে। তাই বলছি ভাই শুভাকাক্সক্ষী আমরা, আওয়ামী লীগ আপনার শুভাকাক্সক্ষী, ওদের ধারেও ঘেঁষতে দিবেন না।
আওয়ামী লীগের প্রার্থীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আমরা রাজপথে ছিলাম, থাকবো। যাঁরা আজকে আওয়ামী লীগের কথা বলে, তাঁরা কোনদিন মিছিল মিটিংয়ে আসে নাই। নৈরাজ্য বিরোধী, হরতাল বিরোধী, অবরোধ বিরোধী কোন সময় আওয়ামী লীগের অফিসে আসে নাই। আমরাই তো আসছিলাম। আমরাই বঙ্গবন্ধুর, আমরা শেখ হাসিনার সক্রিয় কর্মী। সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ সাচ্ছা কর্মী, কোন সন্দেহ নাই।
একেএম জাহাঙ্গীর বলেন, ‘নৌকা আমাদের মাথার তাজ। অদক্ষ মাঝি নৌকায় থাকলে সেই মাঝি নদীর মাঝখানে নিয়ে নদীর তাল ঠিক রাখতে পারবে না। যাত্রীদেরকে ডুবিয়ে মারবে। সেই ডুবন্ত নৌকায় আমরা উঠতে চাই না। 

তিনি আরো বলেন, খেলাতো শুরু হয়ে গেছে, সবে মাত্র শুরু, প্লেয়ার যাচাই-বাছাই চলছে। ৪ তারিখ হবে প্লেয়ার যাচাই বাছাই। তার পর ধাপে ধাপে পর্ব। কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমি ফাইনাল। এরপর ফাইনালে দেখবো।
 


এমএন
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

সর্বশেষ