মিধিলির প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলে কৃষিতে ১৮১ কোটি ৬৬ লাখ ও বনজ সম্পদে ৬ কোটি টাকার ক্ষতি

গত শুক্রবার ঘূর্ণিঝড় মিধিলির প্রভাবে প্রবল বৃষ্টিতে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলায় আমন ধান ও রবি শষ্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
ভোলার দৌলতখান উপজেলার চরশুভী গ্রামের কৃষক নুরুল ইসলাম জানান, ঘূর্ণিঝড়ে আমার সব শেষ হয়ে গেছে। এ বছর আমনের ফলন ভালো হয়েছে। লাভের আশা করেছিলাম। এখন লোকসান হলো।
সবজি চাষী লিটন বলেন, পানিতে সবজির অনেক ক্ষতি হয়েছে। আমন ধানও পানিতে তলিয়ে গেছে।
কৃষক মহিউদ্দিন জানান, আমরা কয়েকদিন পরেই আমন ধান ঘরে তুলতে পারতাম। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ে আমনের সর্বনাশ হয়ে গেছে।
মঠবাড়িয়া উপজেলার পাতাকাটা গ্রামের কৃষক আলামীন নাজির বলেন, এ বছর ৪ একর জমিতে তিনি আমন ধান চাষ করেছেন। এরই মধ্যে ৭০ শতাংশ ধান পেকে গেছে। সাড়ে তিন একর জমির ধান কেটে খেতে রেখেছেন। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে শুক্রবারের দিনভর বৃষ্টিতে ধান পানিতে ডুবে গেছে। আর যেগুলো কাটা হয়নি সেগুলোও নুয়ে পড়েছে।
একই উপজেলার জরিপের চর গ্রামের কৃষক মোতালেব হোসেন বলেন, কয়েকদিনের মধ্যেই ধান কেটে ঘরে তোলার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু ঘর্ণিঝড়ে ধান মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।
বরিশাল বিভাগীয় কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে বিভাগের ছয় জেলায় ৭ লাখ এক হাজার ৯০৩ হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হয়েছে।
এরমধ্যে ৬ লাখ ৭৩ হাজার ২০৪ হেক্টর জমির খেতে বর্তমানে ধান রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এক লাখ ৬ হাজার ৯৭৯ হেক্টর জমির ফসল।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে- বরিশাল জেলায় ১৫ হাজার ৯৭ হেক্টর, পটুয়াখালীতে ২৮২৩ হেক্টর, ঝালকাঠি ২৩৯.৬ হেক্টর, পিরোজপুরে ৫৮০ হেক্টর, ভোলায় ২ হাজার ৯০ হেক্টর এবং বরগুনায় ১৩৮৮ হেক্টর জমি।
এ ছাড়া ৮৫ হেক্টর জমিতে গমের আবাদ হলেও ৪০ হেক্টর জমির গম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শীতকালীন সবজির ২০ হাজার ৩৭৯ হেক্টর জমির
মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ হাজার ৪৩০ হেক্টরের।
খেসারি ডালেও একই অবস্থা। আবাদ হয়েছে ২৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। এর ১৭ হাজার ২২৭ হেক্টর জমির ডাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
৭৫৪ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ করলেও ৪৭৬ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়া ৩৮০ হেক্টর জমির পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবমিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ ১৮১ কোটি ৬৬ লাখ ৩৭২ টাকা বলে জানিয়েছে বরিশাল বিভাগীয় কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক শওকত ওসমান।
তিনি বলেন, এ বছর চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১৬ লাখ ৮৭ হাজার ৩৫৬ মেট্রিক টন। এরই মধ্যে ৩৪ হাজার ৯৩৮ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। এছাড়া চলতি অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তা আরো বলেন, সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড়ে ২ লাখ ৮ হাজার ৯৯৬ কৃষক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
এদিকে প্রবল বৃষ্টিতে বিভাগের ৩২৪টি পুকুরের ১৮৩ মেট্রিক টন মাছ পানিতে ভেসে গেছে বলে নিশ্চিত করেছেন বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নৃপেন্দ্রনাথ বিশ্বাস। তিনি জানান, মিধিলির আঘাতে বিভাগের ৩২৪টি পুকুরের ১৮৩ মেট্রিক টন মাছ পানিতে ভেসে গেছে। যার আর্থিক ক্ষতি দাঁড়িয়েছে তিন কোটি ৪২ লাখ টাকা।
উপক‚লীয় বনাঞ্চলের বন সংরক্ষক হারুন অর রশিদ বলেন, বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ভোলা, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায়। ধারণা করা হচ্ছে, অন্তত ছয় কোটি টাকা মূল্যের গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার শওকত আলী বলেন, এবারের ঝড়ে বিভাগে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি কিংবা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে কয়েক হাজার গাছপালা উপড়ে পড়েছে।
তিনি জানান, মাঠে থাকা বিভিন্ন শস্যের ক্ষতি হয়েছে। বিভাগের ৩১১টি ইউনিয়নে দুর্যোগ কবলিত হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার ১৬ জন। এর মধ্যে ১৩২টি বাড়িঘর সম্পূর্ণ ও ১ হাজার ১১১টি আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার।
এমএন