রাস্তায় চেকপোস্ট বসিয়ে মিনিবাস মালিক সমিতি নেতার চাঁদাবাজি

বরিশালে অনুমোদনের নাম করে বিভিন্ন পরিবহন আটকে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে পটুয়াখালী মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে। চাঁদার টাকা না পেয়ে পরিবহন শ্রমিকদের ওপর মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তারা বলেন, নির্যাতনের নামে সুপারভাইজারদের গাড়ির নিচে একপাশ থেকে অপরপাশে হামাগুঁড়ি দিতে বাধ্য করারও অভিযোগ করছেন তারা।
৫-৬টি পরিবহনের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন ম্যানেজারের সাথে কথা বললে, তারা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবিরের নির্যাতনের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন প্রতিবেদকের কাছে।
তেঁতুলিয়া পরিবহনের ম্যানেজার জয়নাল হোসেন জানান, ঢাকা-দশমিনা-কুয়াকাটা রুটে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে তাদের পরিবহন চলাচল করছে। পটুয়াখালী মালিক সমিতির সঙ্গে যুক্ত থাকার পরও নতুন করে অনুমোদন চেয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছেন হুমায়ুন কবির। এই টাকা না দেয়ায় গত সোমবার দুপুরে ভোলা সড়কের রোড পারমিটের নামে চেকপোস্ট বসিয়ে সুপারভাইজার আল আমিনকে গাড়ির পিছন থেকে ঢুকিয়ে সামনে থেকে বের করেছে হুমায়ুন কবির ও তার লোকজন। ফলে বাধ্য হয়ে তাদের ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।
একই অভিযোগ করেছেন সুগন্ধা পরিবহনের ম্যানেজার আবদুল মতিন খন্দকার। তিনি বলেন, ৩০ বছর ধরে এই রুটে পরিবহন চলাচল করছে। কিন্তু টাকার জন্য বর্তমানে মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবিরের নির্যাতন মেনে নেয়া যায় না। তার হাতে প্রতিদিনই দূরপাল্লার শ্রমিকরা এ ধরনের হামলার শিকার হচ্ছেন।
ইসলাম পরিবহনের ম্যানেজার জসিম চৌধুরী জানান, অবৈধভাবে রোডপারমিটের নামে চেকপোস্ট বসিয়ে অনুমোদনের লাখ লাখ টাকা চাঁদা চাচ্ছেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, ১৭-১৮ বছর ঢাকা-বরগুনা, পাথরঘাটা রুটে ১২টি পরিবহন চলাচল করছে।
কিন্তু চাঁদার জন্য গত দুই তিন মাস ধরে হুমায়ুন কবির তার লোকজন নিয়ে পরিবহন শ্রমিকদের ওপর অমানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে।
একই অভিযোগ শ্যামলী এন আর ট্রার্ভেল্সের ম্যানেজার ইকবাল হোসেনেরও। তিনি বলেন, ২২ বছর ধরে শ্যামলী ও সোনার তরী পরিবহন চলাচল করছে। পটুয়াখালী মিনিবাস মালিক সমিতির অনুমোদন নেয়া আছে। এছাড়া রোডপারমিট নিয়ে গাড়ি চলাচল করছে। কিন্তু হুমায়ুন কবির নতুন করে অনুমোদনের নামে চাঁদাবাজি শুরু করেছেন। পার্কিং সিটি টোলসহ প্রতিদিন ১৪০ টাকা চাঁদা দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছি। তারপরেও টাকার জন্য শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছেন হুমায়ুন ও তার লোকজন।
ইউনিক পরিবহনের ম্যানেজার হাজী রুহুল আমিন হাওলাদার জানান, প্রতি মাসে এমনিতেই ৬০ হাজার টাকা চাঁদা দিচ্ছি। তারপরেও অনুমোদনের নামে আবার লাখ লাখ টাকা চাঁদা চাচ্ছে সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির।
এদিকে শ্রমিক নির্যাতন, চাঁদাবাজির ঘটনায় হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে নবাগত মেয়র আবুল খায়ের আবদুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাতের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বৃহত্তর দক্ষিণবঙ্গ কোচ ও বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। এছাড়া বিভাগীয় কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজিসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অনুলিপি দেয়া হয়েছে।
এর একটি কপি প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে। জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী তার লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, গত ৩০ বছর ধরে দক্ষিণাঞ্চলে যাত্রী সেবা দিয়ে আসছি। বরিশাল পটুয়াখালী বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদকের মতই বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ও ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হুমায়ুন কবির বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে মেতে উঠেছেন।
প্রতিদিন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ভোলা সড়কের মুখে দলবল লাঠিসোটা নিয়ে বসে থাকেন। ঐ সড়ক থেকে ঢাকাগামী যাত্রীবাহি দূরপাল্লার পরিবহন প্রবেশ করলে তা আটকে রাখা হচ্ছে। অবৈধভাবে রোডপারমিটের নামে আধাঘন্টা-একঘন্টা গাড়ি থামিয়ে রাখছেন। পুলিশ কর্মকর্তারা এ বিষয়ে জানলেও কেউ এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত পটুয়াখালী বাস মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির বলেন, অনুমোদন নিয়ে কোন টাকা নেয়া হচ্ছে না। নিয়ম অনুযায়ী টাকা উত্তোলণ করা হচ্ছে। যারা টাকা দিচ্ছে না তাদের গাড়ি একটু সময় আটকিয়ে রাখা হচ্ছে। কোন শ্রমিক নিযার্তন করার কথাও অস্বীকার করেন তিনি।
এ ব্যাপারে বৃহত্তর দক্ষিণবঙ্গ কোচ ও বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ঢাকা সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে দক্ষিণাঞ্চলে প্রতিদিন কমপক্ষে ২০০ বাস চলাচল করছে। এসব গাড়ি থেকে প্রতিদিন এমনিতেই লাখ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। তারপরেও অনুমোদনের নামে হুমায়ুন কবির নতুন করে চাঁদাবাজি শুরু করেছেন। এই নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেতেই বরিশাল সিটির নবাগত মেয়র ও প্রশাসনের বরাবরে অনুলিপি দেয়া হয়েছে।
এইচকেআর