সরকারের বেঁধে দেয়া দামে বাঁধা যায় না ব্যবসায়ীদের,চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে অধিকাংশ পণ্য

সারাদেশে প্রতি কেজি পেঁয়াজের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৬৪ থেকে ৬৫ টাকা, আলু ৩৫-৩৬ টাকা এবং ডিমের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য প্রতি পিস ১২ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। এর আগে একাধিকবার নির্ধারণ করা হয়েছে এলপিজির দাম। কিন্তু বরিশালে সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে বাঁধা যায়নি ব্যবসায়ীদের। মাঝে মধ্যে ভোক্তা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অভিযানে গিয়ে দু-চারজন ব্যবসায়ীকে নানা কারণে জরিমানা করেন। কিন্তু এতে তেমন লাভ হয় না বলে মনে করেন ভোক্তারা।
গতকাল শুক্রবার বরিশালের খুচরা বাজারগুলোতে দেখা গেছে, আলু বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫০ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজ ৭০-৭৫ টাকায়। ডিমের হালি বিক্রি হচ্ছে ৫০-৫২ টাকায়। অর্থাৎ সরকারের নির্ধারণ করে দেয়া দর কোনো কাজেই আসছে না। নির্ধারিত দামে বিক্রি না করতে বিক্রেতাদের রয়েছে নানান অজুহাত।
শুক্রবার সকালে নগরীর নতুন বাজার, বাংলা বাজার, রূপাতলী বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দেশি পেঁয়াজ ৭০-৭৫ টাকা, ভারতীয় পেঁয়াজ ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশি আদা গত সপ্তাহের চেয়ে কেজিতে ৫০ টাকা বেড়ে ২৫০ টাকা হয়েছে। এছাড়া চায়না ও দেশি রসুন ২০০ টাকা, আলু ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আগে আলু বিক্রি হতো ৪৫ টাকা কেজি দরে।
গত সপ্তাহের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় গতকাল দেশি আদা ৫০ টাকা বেশি দামে ও চায়না রসুন ২০ টাকা কম দামে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা পর্যায়ে আলু-পেঁয়াজ বিক্রিতে মানা হচ্ছে না সরকার নির্ধারিত দাম।
নির্ধারিত দামে বিক্রি না করা নিয়ে আলু-পেঁয়াজের বিক্রেতা তালুকদার রেজাউল হাসান বলেন, আমি তো কম দামে কিনতে পারিনি, বিক্রি করবো কীভাবে। গত বৃহস্পতিবার রাতে আমার কেনা পড়েছে ৪২ টাকা তারপর ভাড়া, নষ্ট আলু বাদ দিয়ে ৫০ টাকাতেই বিক্রি করতে হয়।
বাংলা বাজারে বাজার করতে আসা মিলন খান বলেন, সরকার তো দাম নির্ধারণ করে দেয়, কিন্তু আমাদের কিনতে হয় বেশি দামেই। তিনি বলেন, সরকার শুধু পণ্যের দামই বাইন্দা দেয়। কিন্তু বাজার দরের খবর কেউ রাখে না।
অন্যদিকে সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার বোতলজাত ৫ টাকা কমে ১৬৯ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও ভোক্তাকে সেই আগের ৫ টাকা বেশি দাম গুণতে হচ্ছে। প্রতি লিটার বিক্রি হচ্ছে ১৭৫ টাকা দরে।
এদিকে বাজারে কিছু সবজির দাম বাড়লেও অনেকটাই অপরিবর্তিত। বাজারে গোল বেগুন প্রতি কেজি ৭০ টাকা, লম্বা বেগুন ৩৫-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে গত সপ্তাহের চেয়ে ১০ টাকা বাড়তি দামে গোল বেগুন বিক্রি হচ্ছে।
গত সপ্তাহে এক কেজি করলা ৫০ টাকায় বিক্রি হলেও শুক্রবার ২০ টাকা বেড়ে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ঢ্যাঁড়স ২৫ টাকা, বরবটি ৬০ টাকা, ধুন্দল ৩০ টাকা, চিচিঙ্গা ৪০ টাকা, শসা ৪০ টাকা, প্রতিটি লাউ ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
পেঁপের কেজি ২৫ টাকা, লেবুর হালি ১০ থেকে ১৫ টাকা, জালি কুমড়া প্রতিটি ৪০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া কেজি ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা কেজি দরে।
বাজারগুলোতে শীতকালীন সবজিও চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। ছোট বাঁধাকপি প্রতিটি ৪০ থেকে ৫০ টাকা, ছোট ফুলকপি ৬০ টাকা, মুলার কেজি ৪০, শিম ১৪০, পাকা টমেটো প্রকারভেদে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা ও গাজর ১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে সপ্তাহ ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির কেজি ১০ টাকা বেড়ে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগের সপ্তাহে ব্রয়লার মুরগি ১৭০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল। এছাড়া সোনালি ৩০০ এবং লেয়ার ৩৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বাজারে মুরগির দাম কিছুটা বেড়েছে। বাজারে গরুর মাংসের কেজি ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
নতুন বাজারের মুরগি বিক্রেতা সোহেল খান বলেন, আমাদের দাম বাড়ানোর কিছু নেই। আমরা প্রতিদিন পাইকারি বাজার থেকে মুরগি কিনে এনে বিক্রি করি। তিনি বলেন, পাইকারি বাজারে দাম বাড়লে আমরাও বাড়িয়ে বিক্রি করি, কমলে কমিয়ে দেই।
বাজার করতে আসা লিটন হোসেন বলেন, গত বুধবার ব্রয়লার মুরগি ১৭০ টাকা কেজি করে কিনেছিলাম, এখন তা ১৮০ টাকা। বিক্রেতারা নানা অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের এক ধরনের জিম্মি করে ফেলেছেন। বাজারে সরকারের মনিটরিং ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এমনটি হচ্ছে।
এছাড়া প্রতি কেজি শিং মাছ (আকারভেদে) ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা, রুই মাছ (আকারভেদে) ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, পাঙাশ ২২০ টাকা, ইলিশ (আকারভেদে) ১২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, কাতল মাছ ৪০০-৪৫০ টাকা, চিংড়ি মাছ ১০০০-১৬০০ টাকা, কাচকি মাছ ৪০০ টাকা, টেংরা মাছ ৬০০ টাকা, কৈ মাছ ৪০০ টাকা, শিং মাছ ৪০০-৬০০ টাকা, বোয়াল ৬০০-৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
অপরদিকে মসলার বাজারেই নেই স্বস্তি। গেল ঈদুল ফিতরের পর থেকে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মসলার দাম।এতে ঘাম ছুটছে ক্রেতাদের। প্রয়োজনের তুলনায় কিনতে হচ্ছে কম।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মানভেদে প্রতি কেজি খোলা মরিচের গুড়া বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকায়, হলুদের গুড়া বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকায়।
প্রতি কেজি জিরা ১৩০০ থেকে ১৪০০ টাকা, ধনিয়া গুঁড়ার ১ কেজি প্যাকেট ৩০০ টাকা, শুকনা মরিচ ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, দারুচিনি ৬০০ টাকা, লবঙ্গ প্রতি কেজি ২ হাজার টাকা, এলাচ প্রকার ভেদে ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
বিক্রেতারা জানান, গত ঈদুল ফিতরের পর থেকে প্রতিটি মসলায় ১০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে এলাচ, লবঙ্গ ও জিরার দাম।
রূপাতলী বাজারের খুচরা মসলা বিক্রেতা নয়ন জমাদ্দার বলেন, ঈদের পর থেকে মসলার বাজার ওঠানামা করছে। কখনো বাড়ছে তো, কখনো কমছে। তবে বাড়ার তুলনায় কমার হার অনেক কম।
তিনি বলেন, পাইকারি বাজর থেকে জিরা ১০৮০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। খুচরা পর্যায়ে কেজি ১৩০০ থেকে ১৪০০ টাকায় বিক্রি করছি। গত ১৫ দিন আগ থেকেই ছোট এলাচ ১৪০০ টাকা এবং বোম্বে এলাচ কেজি ২৬০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন এক লাফে প্রকারভেদে কেজি ২ হাজার থেকে ৪০০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
এদিকে মসলার দাম বাড়ায় ক্রেতাদের অনেককে প্রয়োজনের তুলনায় কম মসলা কিনতে দেখা গেছে। এমনকি তারা জানিয়েছেন রান্নায় তারা মসলার ব্যবহারও কমিয়েছেন। মসলার দাম বাড়ার জন্য ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ও সরকারের বাজার তদারকির অভাবকেই দুষছেন তারা।
তাহমিনা বেগম নামে এক গৃহিণী বলেন, বিক্রেতারা সিন্ডিকেট করে মসলার দাম বাড়াচ্ছে। আগে এক কেজি করে হলুদ-মরিচের গুঁড়া কিনতাম। এখন আধা কেজিও কিনতে পারি না।
এ ব্যাপারে বরিশাল ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক সাফিয়া সুলতানা জানান, সরকারী নির্ধারিত দামে বিক্রি না করায় শুক্রবার নতুন বাজার ও নথুল্লাবাদ বাজারের ৬টি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে ১৭ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ব্যবসায়িদের সরকারী নির্ধারিত দামে আলু, পেয়াঁজ, ডিম এবং তেল বিক্রি করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
আরজেএন