বরিশালে আবাসিক হোটেল ও বসতঘরে ওয়ান-টেন জুয়া ,পুলিশের অভিযানের আগেই খবর যাচ্ছে আসরে

নগরীর আবাসিক ভবন ও হোটেলগুলোতে থামছে না জুয়ার ব্যবসা। বরং প্রশাসনের আন্তরিকতার অভাবে ‘ওয়ান-টেন’ নামে এখনো রমরমাভাবে চলছে জুয়ার আসর। প্রতি রাতে জুয়ার কোটে হাত বদল হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।সংশ্লিষ্টরা বলছে, সম্প্রতি ওয়ান-টেন জুয়া নিয়ে দৈনিক মতবাদে সংবাদ প্রকাশের পর গা ঢাকা দেয় জুয়ারিরা। তবে প্রশাসনের নিস্ক্রিয় ভূমিকার সুযোগে কিছুদিন না যেতেই জায়গা পরিবর্তন করে আবার শুরু হয়েছে জুয়া কার্যক্রম।
অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করেই চলছে তাদের ব্যবসা। এ কারণেই পুলিশের অভিযানের আগেই খবর পৌঁছে যাচ্ছে জুয়া ব্যবসায়ীদের কাছে।
এতে ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে জুয়া ব্যবসার রাঘব বোয়ালরা। আর জুয়ার আসরে প্রতিনিয়ত নিঃস্ব হচ্ছেন বহু মানুষ।
পুলিশ বলছে, ‘জুয়া ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে জুয়ার আসর এক জায়গায় স্থায়ীভাবে না চলায় তাদের ধরাটা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এ বিষয়ে পুলিশকে সুনির্দিষ্টভাবে তথ্য দিয়ে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার মো. সাইফুল ইসলাম।
জানা গেছে, ‘দীর্ঘদিন ধরেই নগরীতে জুয়ার আসর পরিচালনা করে আসছে পৃথক কয়েকটি গ্রুপ। যারা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বাসা এবং হোটেল ভাড়া নিয়ে জুয়ার আসর চালিয়ে আসছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নগরজুড়ে ২০টিরও বেশি স্পটে রাত ৮টা বাজতেই বসে ওয়ান-টেন নামক জুয়ার আসর। চলে গভীর রাত পর্যন্ত। এর নেপথ্যে কাজ করছে ১০-১৫ জনের গ্রুপ।
জুয়ার সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত কয়েকটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ‘ইতিপূর্বে কোতয়ালী, কাউনিয়া এবং এয়ারপোর্ট থানা এলাকার মধ্যে জুয়ার আসর বসত। তবে বর্তমানে কোতয়ালী থানা এলাকায় ভাড়া বাসায় জুয়ার আসর বসছে। রাতে সর্বোচ্চ ছয় ঘণ্টার জন্য জুয়ার আসরে বাসা ভাড়া দিয়ে বাড়ি মালিক আয় করছেন সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা।
সূত্রটি আরও জানিয়েছে, ‘নগরীর নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় হোটেল বেবিলনে ইতিপূর্বে জুয়ার আসর বসতো। সেটা মাসখানেক আগে পুলিশি তৎপরতায় বন্ধ হয়ে যায়। কিছুদিন পরেই বেবিলন ছেড়ে নগরীর চৌমাথা এলাকার একটি বহুতল ভবনে নতুন করে শুরু হয় ওয়ান-টেন জুয়া বাণিজ্য। যার নেতৃত্বে রয়েছেন নথুল্লাবাদ এলাকার মাছ ব্যবসায়ী ফোরকান।
এছাড়া নগরীর কাউনিয়া ছোটা মিয়ার গলিতে পলাশের বাসায়, আমির কুটির এলাকায় হরিজন কলোনীর পার্শ্ববর্তী একটি ভাড়া বাসায়, সিএন্ডবি ১ নম্বর পুল সংলগ্ন খালপাড় সাড়ের একটি ফ্ল্যাটে, আমতলার মোড় পানির ট্যাংকি সংলগ্ন জুমিরখান সড়কের মুখে একটি টিনের ঘরে এবং নগরীর ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ভাটারখাল কলোনীর কামালের ঘরে প্রতিনিয়ত জুয়ার আসর বসে। এসব স্পটে ওয়ান-টেন জুয়ার পাশাপাশি চলে মাদক সেবন ও বিক্রি। এমনকি অনৈতিক কাজের জন্য ভাড়া পাওয়া যায় নারীও।
নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ‘বর্তমানে নগরীর ধানগবেষণা রোড, রূপাতলী হাউজিং এবং কলেজ এভিনিউ এলাকার একটি পাঁচতলা ভবনে প্রায়ই জুয়ার আসর বসছে। তবে তিনটি স্পটে একসঙ্গে আসর বসে না। পরিস্থিতি বুঝে একেক স্পটে একেকদিন ওয়ান-টেন জুয়ার আসর বসানো হয়।
এই তিনটি আসরে জুয়া ব্যবসার নেতৃত্ব দিচ্ছেন নগরীর উজিরপুরের কামরুল ওরফে চিটিং কামরুল, নগরীর অক্সফোর্ড মিশন রোডের আজাদ, কলেজ এভিনিউ এলাকার হাসিব, জিয়া সড়কের সবুজ এবং রফিক নামের একজন। এদের মধ্যে রফিক নামের ব্যক্তি নিজেকে কথিত সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছেন বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র। এমনকি জুয়ার আসর থেকে সাংবাদিক ম্যানেজের নামেও বাড়তি টাকা নিয়ে থাকেন তিনি। রফিক বাদে আরও দুটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক পরিচয়ধারীর পকেটে প্রতি রাতেই চলে যাচ্ছে জুয়ার টাকা।
সূত্র আরও জানিয়েছে, ‘জুয়ার আসর থেকে প্রতি রাতে পুলিশের নামেও টাকা উঠছে। এর মধ্যে কোতয়ালী মডেল থানার নামে উঠছে চার হাজার এবং ডিবি পুলিশের নামে যাচ্ছে ৬ হাজার টাকা। ইতিপূর্বে পুলিশ তিন হাজার এবং ডিবির নামে পাঁচ হাজার টাকা থাকলেও মতবাদে সংবাদ প্রকাশের পরে সেই রেট আরও এক হাজার টাকা করে বেড়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। তবে এ টাকা পুলিশ পর্যন্ত পৌঁছায় কী-না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
জুয়ার আসরের নিয়মিত কাস্টমার নগরীর কাশিপুর ফিসারী রোড এলাকার একজন ঠিকাদার জানিয়েছেন, ‘প্রতিটি স্পটই সতর্কতার সাথে পরিচালিত হয়। জুয়ার আসরে মোবাইল ফোন ব্যবহারের কোন সুযোগ নেই। যেই বাড়িতে আসর বসে, তার আশপাশে একাধিক সিসি ক্যামেরা থাকে। এছাড়া ভবনের বাইরে ঘোরাফেরা করে লোকজন। সন্দেহজনক কিছু মনে হলেই ভেতরে খবর পৌঁছে দেন তারা।
তাছাড়া থানা এবং ডিবি পুলিশের কতিপয় অসাধু পুলিশ সদস্যকেও সোর্স হিসেবে ব্যবহার করছে জুয়া ব্যবসায়ীরা। যারা নিয়মিত জুয়ার আসর থেকে টাকা পান। এমনকি জুয়ার কোটে বিনা টাকায় বাজিও ধরেন তারা। এরাই আবার পুলিশের অভিযানের বিষয়টি টের পেলে আগেভাগেই খবর পৌঁছে দেন জুয়া ব্যবসায়ীদের কাছে।
এদিকে, ‘জুয়া ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ‘সম্প্রতি মতবাদে সংবাদ প্রকাশের পর এক গ্রুপ জুয়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এমনকি জুয়া সিন্ডিকেটের একাংশের প্রধান নগরীর ভাটারখাল এলাকার কামাল, বেলতলা এলাকার শহিদ ও গির্জামহল্লা এলাকার শাহীনের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এমনকি সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই বন্ধ রয়েছে এই গ্রুপটির জুয়া কার্যক্রম।
অপর গ্রুপের নেতৃত্ব দেয়া উজিরপুরের মীর কামরুজ্জামান ওরফে কামরুল ও মুক্তি নামের দুজন অনেকটা গা ঢাকা দিয়েছেন। যদিও গ্রুপ প্রধান কামরুজ্জামান জুয়ার ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন বলে দাবি করেন এই প্রতিবেদকের কাছে।
নগরজুড়ে বাসা-বাড়িতে জুয়ার আসর প্রসঙ্গে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আগে থেকেই পুলিশের সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া আছে। এমনকি সম্প্রতি মতবাদে যে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে, সেটা আমার দৃষ্টিতে এসেছে। এর পরপরই প্রতিটি স্পটে পুলিশ ও ডিবি’র টিম পাঠিয়েছি। কিন্তু জুয়ার আসর বা জড়িত কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, ‘সমস্যাটা হচ্ছে, যারা জুয়ার ব্যবসা করে তারা এক স্থানে বেশিদিন স্থায়ী হয় না। তারা একেক দিন একেক স্থান বেছে নেয়। আমরা চেষ্টা করছি জুয়া ব্যবসার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে। এজন্য সুনির্দিষ্ট তথ্যের প্রয়োজন। যখন আসর বসে তখন খবর পেলে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করা যায়। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে সরাসরি আমাকে (পুলিশ কমিশনার) খবর দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আরজেএন