বৃষ্টির পর জলাবদ্ধতায় নগরীতে এডিস মশা বাড়ছেই

বরিশালে ভয়াবহ পরিস্থিতি আকার ধারণ করলেও মশক নিধনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই সিটি করপোরেশনের। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর গোটা নগরীতে মশার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় ডেঙ্গু আতঙ্কে থাকতে হয় নগরবাসীকে। যদিও সিটি করপোরেশনের দাবি, তাদের মশক নিধন কার্যক্রম চলমান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীতে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। বাংলাবাজার, নবগ্রাম রোড, বটতলাসহ বিভিন্ন এলাকার রাস্তার পাশে যত্রতত্র খানাখন্দে জমাট বাঁধা পানিতে মশার লার্ভা জন্মে। এতে মশার আক্রমণে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর তালিকা প্রতিনিয়ত বাড়লেও সিটি করপোরেশন থেকে কোন জোড়ালো ভূমিকা পালন করছে না। তারা দায়সারা কথা বলেই দায়িত্ব শেষ করছে।
সোমবার সকালে নগরীর টিয়াখালীর ঘরামী বাড়ি, ঠাকুর বাড়ি, টিয়া খালি স্কুল, নাপিত পাড়া, উত্তর জাগুয়াসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এসব এলাকায় এখনো বৃষ্টির পানি জমে আবর্জনা জমাট বেঁধে রয়েছে। এলাকাবাসীর বক্তব্য- দীর্ঘদিন এ অবস্থা থাকলেও সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের দেখা মেলেনি।
ঘরামী বাড়ি পোল এলাকার বাসিন্দা নিতাই ঘরামী বলেন, গত তিন মাসেও এই এলাকায় পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের দেখা যায়নি। মশা নিধনে কার্যত কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। গত দুদিন ধরে রতন হাওলাদার নামে এক ব্যক্তি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
একই অভিযোগ উত্তর জাগুয়ার বাসিন্দা গৃহবধূ নাজমা বেগমের। তিনি বলেন, শুধু নামেই সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা আমরা। সাবেক মেয়র শত্তকত হোসেন হিরণের মৃত্যুর পর আর কোন সুবিধা পাইনি।
তিনি বলেন, ঝোপ-জঙ্গলে ভরপুর এই এলাকা। এগুলো পরিস্কার করার জন্য আজ পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের কোন লোক আসেনি। তাই ডেঙ্গু মশার সাথে যুদ্ধ করে পোলাপান নিয়ে বসবাস করছি।
ধানগবেষণা সড়কের খ্রিষ্টান পাড়ার বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, এই এলাকার বিভিন্ন স্থানে ময়লার স্তুপ। এসব স্থানে মশা বাসা বেঁধেছে। কিন্তু মশা নিধনে কার্যকরি কোন ব্যবস্থা নেয়নি কেউ। তাই সবসময়ই ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে।
তবে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের দাবি, ডেঙ্গু মৌসুম শুরুর আগে থেকেই মশা নিধন কর্মসূচি চলছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা আংশিক। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, অসময়ে তীব্র তাপপ্রবাহ এবং থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে ডেঙ্গু ছড়িয়েছে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার কোনো বিকল্প নেই বলে ধারণা করছেন তারা।
জানা যায়, সিটি করপোরেশনে লার্ভা শনাক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাব ও কীটতত্ত্ববিদের কোনো পদ নেই। স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সহায়তায় কাজটি সম্পন্ন করে সিটি করপোরেশন। এ বছর এখনো এই দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হয়নি বলে জানান সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা বিভাগ।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের পরিদর্শক রেজাউল করিম বলেন, লার্ভা শনাক্তে কোনো ল্যাব না থাকায় আমাদের একাধিক টিম ওয়ার্ডগুলোতে ঘুরে কাজ করছে। যেখানেই এডিস মশার লার্ভা দেখা যাচ্ছে, সেখানেই তরল ওষুধের মাধ্যমে ধ্বংস করা হচ্ছে।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত বিভাগের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ১৬ হাজার ৯১৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র নিয়েছেন ১৫ হাজার ৬৯৭ জন। এছাড়া গোটা বিভাগে এ পর্যন্ত ৫৬ জন ডেঙ্গুরোগীর মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে বরিশালে ৩৫ জন, ভোলায় ৭, বরগুনা ও পিরোজপুরে ৫ জন করে ও পটুয়াখালীতে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবার সচেতনতা জরুরি। মানুষ সচেতন না হলে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমানো যাবে না। এছাড়া বিভাগের সব সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গুরোগীদের চিকিৎসায় গুরুত্ব দিতে সকল ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আরজেএন