দক্ষিণাঞ্চলে যাত্রীসেবার নামে বিআরটিসি বাসে হয়রানি

পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলে বেসরকারি অন্যান্য পরিবহনে যাত্রী সেবার মান বাড়লেও কমেছে রাষ্ট্রীয় সড়ক পরিবহন সংস্থা-বিআরটিসির। যেমন খুশি তেমন করে চালানো হচ্ছে বাসগুলো। ফলে ধীরে ধীরে সরকারি এ পরিবহন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছেন যাত্রীরা। এজন্য যাত্রী সংকটে ভুগছে বিআরটিসি বরিশালের এ শাখা প্রতিষ্ঠানটি। তবে বরিশাল-পাথরঘাটা রুটে বেসরকারি বাস সেবা না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন ওই অঞ্চলের যাত্রীরা।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, যাত্রী সংকটে এরই মধ্যে কয়েকটি রুটে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক রুটে ধীরে ধীরে কমে আসছে বাসের সংখ্যাও।
বিআরটিসি বাস ডিপো সূত্রে জানা যায়, ডিপোতে বর্তমানে ৫৩টি বাস যাত্রী সেবা দিচ্ছে। এর মধ্যে ভারী যন্ত্রাংশ মেরামতে রয়েছে ১টি। এছাড়াও হালকা মেরামতে বাস রয়েছে আরো তিনটি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিসির এক কাউন্টার মাস্টার জানান, ডিপোর ৪৯টি বাস গড়ে প্রতিদিন রাস্তায় চলাচল করার কথা। কিন্তুবাস্তবে কোনদিন ১২ এবং ১৭টি বাস চলাচল করে। কারণ, বাসগুলো চলাচলের অনুপযোগী। চালক, হেলপারদের ব্যবহার ভালো না। তারা যেখানে খুশি সেখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠা-নামা করায়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। প্রায় প্রতিনিয়তই কোথাও না কোথাও রাস্তার মধ্যে গাড়ি অচল হয়ে যায়।
তিনি বলেন, ২৫ বছর ধরে কাউন্টার মাষ্টার (ক্লার্ক) এর দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বিএনপি সরকারের সময় যে বাস আছে, সেই বাসই সংস্কার করে এখনো চলছে। বর্তমান সরকারের সময় কয়েকটি এসি বাস আসলেও তা অধিকাংশ এসি নষ্ট। অনেক গাড়ি ডিপোতে মেরামতের জন্য পরে রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক কাউন্টার মাস্টার আরো বলেন, কোনদিন ১২ আবার ১৭টি বাস চলাচল করছে। রোববার (আজ) খুলনা রুটে চলাচলকারি তিনটি বাস গন্তব্যে পৌছানোর আগেই যাত্রী নিয়ে যান্ত্রিক গোলযোগে বিভিন্ন রুটে দাঁড়িয়ে গেছে। এ কারণে যাত্রীদের যেমনি ভোগান্তিতে পড়তে হয়, তেমনি যাত্রীদের সঙ্গে ঝগড়ায় জড়াতে হয়।
বিআরটিসি বাস ডিপোর ট্রাফিক ইনর্চাজ মশিউর রহমান বলেন, বরিশাল থেকে পাথরঘাটা, কুয়াকাটা, আমুয়া, তালতলী, মঠবাড়িয়া, খুলনা, সাতক্ষীরা রুটে চলাচল বিআরটিসি। যাত্রী সংকটের কারণে গত চার বছর ধরে বরগুনা এবং বেনাপোল রুটে বন্ধ রয়েছে বাস চলাচল। এছাড়া কুয়াকাটা, পটুয়াখালী, বাউফল, বেতাগী, ভা-ারিয়া এবং বরিশাল থেকে ঢাকার উদ্দেশ্য প্রতিদিন ১৭টি এসি বাস চলাচল করছে। তবে এসব বাসের অধিকাংশই এসি এখন সচল নেই বলে জানা গেছে।
এদিকে বর্ষার সময় দক্ষিণাঞ্চলে সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটির অনেক বাসে ছাতা মাথায় দিয়ে ভ্রমনের অভিযোগও রয়েছে যাত্রীদের। তাই সম্প্রতি পুরনো কিছু বাস মেরামত করে চালানোর চেষ্টা চলছে।
আমুয়াগামী যাত্রী রওসান আরা বেগম বলেন, সরকারি এই বাসে একজন যাত্রীর ন্যূনতম সুযোগ সুবিধা নেই। সরাসরি রুটের টিকিট কেটে লোকাল বাসের মতো রাস্তা থেকেই যাত্রী নেয়। এক ঘন্টার পরিবতে দুই-আড়াই ঘণ্টা লাগে গন্তব্যে পৌঁছতে। এসব কারণে অনেক যাত্রী এখন এই বাসে চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের বাড়ির সামনে গিয়ে থামায় কষ্ট হলেও যাতায়াত করছি। একই অভিযোগ করেছেন খুলনাগামী যাত্রী রফিক হোসেন।
তিনি বলেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলে ঢাকাগামী পরিবহন বাড়লেও বিআরটিসি বাসের সংখ্যা দেড়যুগ আগের যেমন ছিল, তেমনি রয়েছে। সরকারি হলেও লক্কর ঝক্কর বাস দিয়ে সেবা দেয়া হচ্ছে।
আবার অতিরিক্ত ভাড়াও নেয়া হচ্ছে। দীর্ঘবছর যাতায়াতের কারণে সব সমস্যা মাথায় নিয়ে বাসটিতে আসা-যাওয়া করছেন বলেন রফিক হোসেন।
বরগুনার পাথরঘাটার চরদুয়ানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান জুয়েল জানান, বরিশাল থেকে পাথরঘাটায় সরাসরি বাসে আসতে বিআরটিসি ছাড়া তেমন উপায় নেই। কিন্তু এই বাস পথে পথে থামায়। ইচ্ছে মতো যাত্রী তোলে।
এদিকে হেড ক্যাশিয়ার ইনচার্জ ফারুক আহম্মেদ জানান, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিআরটিসি বাস যাত্রী সেবা দিয়ে ৪ কোটি ৬৪ লাখ আয় করছে। এছাড়া প্রতি মাসে গড়ে ৪০-৪৫ লাখ টাকা মুনাফা করছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সচেতন নাগরিক কমিটি সনাক সভাপতি গাজী জাহিদ হোসেন বলেন, আয় আর মুনাফা দেখিয়ে সরকারি এই সংস্থাটি দায়ভার এড়াতে পারে না। স্বাধীনতার চার বছর বিআরটিসি বাস যাত্রী সেবায় ভালো ছিল। কিন্তু এরপর তারা তাদের সুনাম ধরে রাখতে পারেনি। সরকার যাত্রী সেবায় ভালো মানের বাস আনলো তা সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারছেনা কর্মকর্তারা। ১৫-২০ বছরে আগে ৫ বছরের মধ্যে একটি বাস অকেজো হয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, এসি বাসের ভাড়াও নিচ্ছে দ্বিগুণ। বাসের ভিতরেও নেই পরিবেশ। নোংরা, ময়লা স্তুুপ থাকে। চালক ও সুপারভাইজারের ব্যবহারও ভালো না।
এ ব্যপারে ডিপোটির ম্যানেজার জামশেদ আলী মুঠোফোনে প্রতিবেদকের প্রশ্ন শুনে জবাব না দিয়ে বাহিরে আছেন বলে সংযোগ বিছিন্ন করে দেন।
আরজেএন