বরিশালে বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল, অসহায় হাজারো গ্রাহক

বরিশালে বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিলে ভোগান্তিতে পড়েছেন অসংখ্য গ্রাহকরা। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের জানিয়েও কোনো সুফল মিলছে না। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাদের কাছে গেলে গ্রাহকদেরকেই দায়ী করে নানা অজুহাত দেখান হয়। কিন্তু বিল সংশোধন করেন না।
নগরীর পলিটেকনিক সড়কের বাসিন্দা ফারজানা ববি জানান, শারীরিক অসুস্থ স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে ঘর ভাড়া দিয়ে কোন রকম সংসার চলে তাঁর। এমনিতে নিত্যপণ্যের দামে হিমশিম খেতে হয় তাদের। তাঁর ওপর বিদ্যুতের অতিরিক্ত বিল দিয়ে হাপিয়ে উঠছেন তিনি। ফারজানা জানান, পাঁচটি লাইট, তিনটি ফ্যান, টিভি ও ফ্রিজ রয়েছে। গত মে ও জুন দুই মাস বিদ্যুৎ বিল আসে ৩,৮০০ টাকা। এছাড়া শুধু জুলাই মাসে বিল এসেছে ৫ হাজার ৮০০ টাকা। এক মাস যেতে না যেতেই আগষ্ট মাসে তার বিদ্যুৎ বিল এসেছে ৬ হাজার ৪৬০ টাকা।
একমাসে কিভাবে এত টাকা বিল এসছে তা জানতে চাওয়া হলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুত অফিসের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা তাকে জানিয়েছেন, তাদের মিটারে সমস্যা রয়েছে। আবেদন করলে মিটারের সমস্যা দেখা হবে। ফারজানা ববি বলেন, মাসের শেষের দিকে বিদ্যুৎ বিল দিয়ে মাত্র ৩-৪ দিনের সময় বেঁধে দেয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। এই সময়ের মধ্যে বিল দিতে হিমশিম খেতে হয়। তিনি বলেন, এর আগে প্রতি মাসে ৮০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা বিল আসতো। সেখানে হঠাৎ তিন থেকে চারগুণ বিল আসায় মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা হয়েছে।
শুধু ফারজানা ববিই নয়, ভুতুড়ে বিদ্যুত বিল নিয়ে বিপাকে পড়েছেন ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের মাওলানা ভাসানি সড়কের বাসিন্দা গৃহবধূ তাহমিনা বেগমও।
তিনি জানান, বাসায় তিনটি লাইট, তিনটি ফ্যান, টিভি ও ফ্রিজ ব্যবহার করছি। প্রতিমাসে বিদ্যুৎ বিল আসতো সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। কিন্তু মার্চ মাস থেকে এই বিল এক লাফে ২০০০ টাকা করে আসতে শুরু করেছে। এভাবে এপ্রিল, মে ও জুন, জুলাই মাসে একইভাবে বিল এসেছে।
তাহমিনা বেগম বলেন, এই টাকা কোথায় যায়? বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের কারসাজি ছাড়া এমন হতে পারে না।
এছাড়া একই এলাকার বাসিন্দা হাসিনা বেগম জানান, তাঁর বাসায় ৫টি লাইট, তিনটি ফ্যান, টিভি ও একটি ফ্রিজ রয়েছে। প্রতিমাসে ৯০০ থেকে ১,০০০ টাকা বিল আসতো। সেখানে গত তিন মাস ধরে বিদ্যুত বিল আসছে দ্বিগুণ। এর মধ্যে জুন ও জুলাই দুই মাসে ২,৯৭৬ টাকা বিল এসেছে। আগস্টে এসেছে ১,৩৩৯ টাকা। তিনি বলেন, শারীরিক অসুস্থ স্বামীর বেতনের টাকা যা পাই, তা দিয়ে কোনরকম সংসার চালাতে হচ্ছে। তাঁর ভিতরে বিদ্যুত অফিসের এমন তামাশা আরো ভোগান্তি বাড়িয়ে দিল।
একইভাবে বাংলা বাজারের নিউ হাউজ রোডের সাথী নীড়ের তৃতীয় তলার এক ভাড়াটিয়া জানান, তার বাসায় দুটি লাইট ও একটি ফ্যান চলে। কিন্তু তার বাসায় জুলাই মাসে ১,৩৫০ টাকা বিদ্যুৎ বিল দিয়েছেন। এক মাসের ব্যবধানে সেই বাসায় আগষ্ট মাসে বিল এসেছে প্রায় দ্বিগুণ ২ হাজার ৫৬ টাকা।
নগরীর কাউনিয়া প্রথম লেনের বাসিন্দা কালাম হোসেনের ভাড়াটিয়া রুবাইয়া জানান, তার বাসায় ২টি লাইট, একটি ফ্রিজ চলে। এর মধ্যে তার মা ও তিনি দু’জনই চাকরির তাগিদে সকাল থেকে সারাদিন অফিসে থাকেন। এ সময়ে বাসা তালাবদ্ধ থাকে। এতে তাদের বিদ্যুৎ বিল আসতো ৫০০-৬০০ টাকা। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে বিল আসছে দ্বিগুণ। এর মধ্যে জুলাই মাসে বিল ৫০০ টাকা আসলেও আগষ্ট মাসে এসেছে ১,১০০ টাকা। হঠাৎ বিদ্যুৎ বিল বাড়তি আসায় ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা।
এদিকে বাড়তি বিদ্যুৎ বিলে হয়রানির শিকার ভুক্তভোগীদের তথ্য জানতে মতবাদ ডিজিটালের পেইজে একটি স্ট্যাটাস দেয়া হয়। এতে ভৌতিক বিল নিয়ে নানা অভিযোগ তুলে ধরেন তারা। শেখ হোসাইন নামে একজন বলেন, তার বাসায় আগে ১,৫০০-২,০০০ টাকা বিদ্যুৎ বিল আসতো। কিন্তু প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকার উপরে বিল আসছে। রাজু আহমেদ লিখেছেন তার বাসায় একই সমস্যা। আল মামুন তুহিন লিখেছেন, তার বাসায় বিদ্যুৎ বিল নিয়ে একই সমস্যা চলছে।
মনিরুজ্জামান রয়েল বলেন, গত মাসের থেকে তার বাসায় বিদ্যুতের দ্বিগুণ বিল আসছে। ঢাকা যাত্রাবাড়ী থেকে আজমাইয়ান তারহা লিখেছেন, যাত্রাবাড়ি বিবির বাগিচায় নতুন বিল্ডিং এ শুধুমাত্র তাদের ফ্লাটে বিল এসেছে ৩,০০০ টাকা অথচ আমরা ব্যাচেলর। কিছুই নেই একটা ফ্রিজ ছাড়া।
এছাড়াও এটিএম তুহিন, দেলোয়ার হোসেন, নিথুন রায়, এস কে হুসেইন, রাজু আহমেদ, জেমস সোহান, নিপা জাহান, অহিদুল ইসলাম, ইশতিয়াক আহমেদ মিরাজ, ইব্রাহিম বিন মুসা, মুশফিকা, কে এম নজরুল ইসলাম ও জাকিয়া আক্তার আয়েশাসহ অসংখ্য গ্রাহক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে হয়রানির অভিযোগ করেছেন।
এ ব্যাপারে বরিশাল ওজোপাডিকোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক হোসেন জানান, এপ্রিল-মে মাসের বিলের ক্ষেত্রে এই সমস্যা হয়েছে। তার দাবি, ফ্রিজ, এসি, ফ্যান চালানো হচ্ছে বেশি। তাই বিলও বেশি আসছে। জুন ও জুলাই মাসে বৃষ্টি হয়েছে। এই সময়ে বিদ্যুতের ব্যবহার কমেনি।
তার বক্তব্য হচ্ছে, গ্রাহক যতটুকু বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন, ততটুকুই বিল আসবে। এরপরও কোনো বিলের ক্ষেত্রে বড় ধরনের গড়মিল হলে গ্রাহক বিদ্যুৎ বিভাগের অভিযোগ কেন্দ্র যোগাযোগ করলে সমাধান দেওয়া হবে। মহানগরীতে ১ লাখ ২৫ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ৭৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা রয়েছে। তবে অনেক সময় চাহিদার কম থাকে বলে জানান নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক হোসেন।
আরজেএন