শেবাচিমে র্যাগিং ওপেন সিক্রেট ,অভিযুক্ত শিক্ষককে নিয়ে তদন্ত কমিটি

২০১১ সালে একটি আলোচিত ঘটনার সূত্র ধরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে (শেবামেক) স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ হয়েছিল র্যাগিং। ওই ঘটনার বছর দুই পরে তৎকালীন একাডেমিক কাউন্সিল মেডিকেল কলেজে র্যাগিং নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি চার ছাত্রকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিস্কার করা হয়েছিল। এরপর কিছু সময় মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাস এবং ছাত্রী হোস্টেলগুলোতে বন্ধ ছিলো র্যাগিংয়ের ঘটনা।
তবে বর্তমান সময়ে শের-ই-বাংলা মেডিকের কলেজের হোস্টেলগুলোতে সেই সময়ের সিদ্ধান্ত এখন আর প্রতিপালন হচ্ছে না। হোস্টেলগুলোতে র্যাগিং এখন ‘ওপেন সিক্রেট’ বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। তারা বলছেন, প্রতিনিয়তই র্যাগিংয়ের শিকার হচ্ছেন জুনিয়র শিক্ষার্থীরা। কিন্তু নানা ভয়ে প্রতিটি ঘটনার সাথেই উঠে আসছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের একাধিক নেতা-কর্মীর নাম। আর তাই র্যাগিংয়ের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিচ্ছে না কলেজ প্রশাসন।
এর ফলে একের পর এক র্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটলেও ছাত্রত্ব হারানো এবং নির্যাতনের ভয়ে মুখ খুলতে নারাজ সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তবে সবশেষ গত বৃহস্পতিবার মেডিকেল কলেজ ছাত্রী হোস্টেলে দুই ছাত্রীকে র্যাগ দেয়ার ঘটনাও আড়াল করার চেষ্টা ছিলো কলেজ প্রশাসনের। কিন্তু গণমাধ্যমের কারণে প্রকাশ্যে আসে ঘটনাটি। এরপরই নড়েচড়ে বসে কলেজ এবং হোস্টেল প্রশাসন।
এর ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার হলের ৬০৬ নম্বর কক্ষে রাতভর দুই ছাত্রীকে র্যাগিংয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিলুপ্ত করা হয়েছে ছাত্রী হোস্টেলের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি। সেই সাথে ঘটনার তদন্তে গঠন করা হয়েছে চার সদস্য বিশিষ্ট কমিটি। তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপাধ্যক্ষ নাজিমুল হক।
তিনি জানিয়েছেন, ‘তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক উত্তম কুমার সাহাকে। এছাড়া সদস্য হিসেবে আছেন- সহযোগী অধ্যাপক প্রবীর কুমার সাহা, প্রভাষক অনিকা বিশ্বাস ও জহিরুল ইসলাম। তবে তদন্ত কমিটিতে ডা. প্রবীর কুমার সাহাকে সদস্য করায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ র্যাগিংয়ের ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার নেপথ্যে কাজ করেছেন প্রবীর কুমার। তাকে নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠনে ঘটনা ভিন্নখাতে মোড় নেয়ার শঙ্কা রয়েছে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে হলে অবস্থান করা ডেন্টাল সপ্তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ফাহমিদা রওশন ওরফে প্রভা, ৫০তম ব্যাচের নীলিমা হোসেন ওরফে জুঁইয়ের নেতৃত্বে র্যাগিং করা হয় দুই ছাত্রীকে। নির্যাতনের এক পর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়েন ওই ছাত্রী। এরপর তাকে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর গত শনিবার সুস্থ হয়ে আবার হলে ফেরেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেডিকেল কলেজের একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, বর্তমানে ক্যাম্পাসে যারা ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারাই প্রতিটি র্যাগিংয়ের ঘটনার সাথে জড়িত। গত প্রায় ৭ মাস আগে মেডিকেল কলেজের ১ নম্বর ছাত্র হোস্টেলে আলিফ নামের এক জুনিয়র শিক্ষার্থী র্যাগিংয়ের শিকার হয়। তাকে গভীর রাতে খালি গায়ে ক্যাম্পাসের ছাদে নিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখে একদল সিনিয়র ছাত্র।
এর আগেও হোস্টেলগুলোতে একাধিক র্যাগিং হয়েছে। তবে এসব বিষয় নিয়ে হোস্টেল প্রশাসনের কোন মাথা ব্যাথা নেই। এমনকি যাদের হোস্টেল সুপারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তারা মাসের মধ্যে একবার ছাত্রাবাসে আসেন কী-না, তা নিয়ে সন্দেহের কথা জানান শিক্ষার্থী এবং হোস্টেলে দায়িত্বরত কর্মচারীরা।
তারা বলেন, ‘শান্তি-শৃঙ্খলার নামে হোস্টেলে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়। যখন যেই দল ক্ষমতায় থাকে তখন সেই দলের ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীদের নিয়ে এই কমিটিগুলো গঠন করা হয়। বর্তমানে যেসব কমিটি রয়েছে সেগুলোর ক্ষেত্রেও একই হয়েছে। এখন যারা হোস্টেল কমিটিতে রয়েছেন তারা সবাই নিজেদের ছাত্রলীগ বলে পরিচয় দিচ্ছেন। যদিও মেডিকেল কলেজ বা ছাত্রাবাসগুলোতে ছাত্রলীগের কোন কমিটি নেই বলে জানা গেছে।
শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘হোস্টেল সুপাররা হলে আসেন না। তাদের অবর্তমানে হর্তা-কর্তা সবই থাকেন হোস্টেল সেক্রেটারি বা কমিটির সদস্যরা। যারা হোস্টেলের ডায়নিং, কমনরুম, গেস্টরুম ও সীট বরাদ্দসহ সবকিছুই করে থাকেন হোস্টেল কমিটি। তাদের মনমত না চললেই র্যাগিংয়ের শিকার হতে হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের।
জানা গেছে, ‘বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে দুই ছাত্রীকে র্যাগিংয়ের ঘটনাটি উচ্চ আদালতের সৃষ্টিতে এনেছেন একজন সিনিয়র আইনজীবী। তিনি উচ্চ আদালতকে জানিয়েছেন ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুলিং-র্যাগিংয়ের মাত্রা অনুসারে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার বিধান রয়েছে। এ অপরাধে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গভর্নিং বডির সদস্যরা শাস্তিও পাবেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধ সংক্রান্ত চূড়ান্ত নীতিমালায় এমন বিধান রাখা হয়েছে। যার গেজেট আদালতে জমা দেয়া হয়েছে।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করা বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল- বাসদ বরিশাল জেলার সদস্য সচিব ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, ‘শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে র্যাগিংয়ের ঘটনা নতুন কিছু নয়। এটা প্রতিনিয়তই চলছে। ২০১১ সালেও এক শিক্ষার্থীকে উলঙ্গ করে তার ভিডিও ধারণের পর চাঁদা দাবি করে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। আমরা এর প্রতিবাদ করেছিলাম। প্রতিবাদ জানিয়ে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করেছিল। সেই মানববন্ধনে হামলাও হামলা করে ছাত্রলীগ। তবে সেই ঘটনায় কারোর বিচার হয়নি। শুধুমাত্র কাইয়ুম এবং জিয়া নামের ছাত্রলীগের দুই ছেলেকে তখনকার কর্মপরিষদের পদ থেকে বহিস্কার করা হয়েছিল। এছাড়া র্যাগিংয়ের অপরাধে কোন ছাত্র বহিস্কার হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
তিনি বলেন, ‘মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসগুলোতে র্যাগিংয়ের চিত্র খুবই ভয়াবহ। সেখানে ছাত্রদলের নির্মমভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। ছাত্রী হোস্টেলগুলোতে আগে র্যাগিংয়ের ঘটনা তেমন ছিলো না। তবে গত ৪-৫ বছর ধরে ছাত্রী হোস্টেলেও র্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটছে। ছাত্রীদের হোস্টেল সম্পাদক তার কক্ষে নিয়ে সারারাত দাড় করিয়ে রাখছে, চর-থাপ্পর দিচ্ছে, আরও নানাভাবে নির্যাতন করছে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে ডা. মনীষা বলেন, ‘ঘটনাগুলোর সাথে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা জড়িত থাকে। তাছাড়া হোস্টেলগুলোর দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরাও সরকার দলীয় অনুসারী। যে কারণে ছাত্রলীগ র্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটালে তারাই চেষ্টা করে ধামাচাপা দেয়ার। র্যাগিংয়ের ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা সেটাই প্রমাণ করে। এতেই বোঝা যায় যে এখানে কলেজ এবং হোস্টেল কর্তৃপক্ষেরও দুর্বলতা আছে।
আরজেএন