বরিশাল নগরীর আবাসিক হোটেল ও বসতঘরে জুয়ার আসর

এখন আর ক্লাবে নয়, জুয়া খেলা ছড়িয়ে পড়েছে নগরীর বিভিন্ন হোটেল ও আবাসিক ভবনে। যেখানে প্রতি রাতে ওয়ান-টেন জুয়ার বোর্ডে হাতবাদল হয় লাখ লাখ টাকা। শহর এবং গ্রামাঞ্চলের অসংখ্য মানুষ অংশ নিচ্ছে জুয়া খেলায়। স্পটগুলোতে জুয়ার পাশাপাশি বসে মাদকের হাট।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, ‘নগরীর অন্তত ২০টি এলাকায় হোটেল এবং ভাড়া বাড়িতে রাতে এবং বিকেলে বসে জুয়ার আসার। যার নেতৃত্বে রয়েছেন ১০-১২ জন। তাদের পাতা জুয়ার ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে অনেকে।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই প্রতিদিন জুয়ার আসরে বসছে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী। যদিও সম্প্রতি জুয়াড়ি সিন্ডিকেটের সদস্য মীর কামরুজ্জামান ওরফে কামরুলকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায় কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশ। কিন্তু আদালত থেকে বের হয়ে আবার জুয়ার ব্যবসা পরিচালনা করছেন তিনি।
জানা গেছে, ‘দীর্ঘদিন ধরেই নগরীতে জুয়ার আসর পরিচালনা করে আসছে একটি চক্র। যারা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বাসা এবং হোটেল ভাড়া নিয়ে জুয়ার ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। মাঝে মধ্যে পুলিশের তৎপরতায় জুয়ার আসর পরিবর্তন হলেও বন্ধ হয় না এই ব্যবসা।
জুয়ার সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত কয়েকটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ‘সকল জুয়ার আসর কোতয়ালী, কাউনিয়া এবং এয়ারপোর্ট থানা এলাকার মধ্যে। মাত্র কদিন আগেও নগরীর নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় হোটেল বেবিলনে জমজমাট জুয়ার আসর বসতো। তবে সম্প্রতি এয়ারপোর্ট থানা পুলিশের তৎপরতায় কিছুদিন ধরে ওই স্পটটি বন্ধ রয়েছে।
তবে বর্তমানে নগরীর বাজার রোড, কাটপট্টি, সদর রোড, কাউনিয়া ছোট মিয়ার গলি, সিএন্ডবি পুল, আমীর কুটির, আমতলা পানির মোড় এবং ১০ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন ঘরে বসছে জুয়া।
এর মধ্যে কাউনিয়া ছোট মিয়ার গলিতে পলাশের বাসায়, আমির কুটির এলাকায় হরিজন কলোনীর পার্শ্ববর্তী একটি ভাড়া বাসায়, সিএন্ডবি ১ নম্বর পুল সংলগ্ন খালপাড় সাড়ের একটি ফ্ল্যাটে, আমতলার মোড় পানির ট্যাংকি জুমিরখান সড়কের সম্মুখ ভাগে একটি টিনের ঘরে এবং নগরীর ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ভাটারখাল কলোনীর কামালের ঘরে প্রতিনিয়ত জুয়ার আসর বসে।
সূত্রগুলো জানায়, ‘প্রতিটি স্পটেই ওয়ান-টেন নামক জুয়া খেলা হয়। এর পাশাপাশি স্পটগুলোতে বসে ইয়াবার হাট। অনৈতিক কাজের জন্য ভাড়া পাওয়া যায় নারীও। তবে প্রতিটি স্পটে এক সঙ্গে আসর বসে না বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো। পরিস্থিতি বুঝে একেক দিন একেক এলাকায় ওয়ান-টেন জুয়ার কোডে লাখ লাখ টাকা হাতবদল হয়।
রাত ৯টা থেকে এসব স্পটে শুরু হয় জুয়া খেলা। যা চলে রাত ১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত। আবার বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্তও চলে।
জুয়া ব্যবসার সাথে জড়িতদের দাবি ৩-৪ সিন্ডিকেট পৃথকভাবে জুয়া ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। এর মধ্যে একটি সিন্ডিকেটের প্রধান ভাটারখাল এলাকার কামাল। তার সাথে রয়েছে সদর উপজেলার বেলতলা এলাকার শেখ শহিদ ওরফে যাত্রা শহিদ ও নগরীর গির্জামহল্লা এলাকার শাহীন।
অপর গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মীর কামরুজ্জামান ওরফে কামরুল চেয়ারম্যান ও মুক্তি নামের দুজন। এদের মধ্যে চলতি বছরের গত এপ্রিলের শুরুর দিকে নগরীর সদর রোড এলাকা থেকে আটক হয় মীর কামরুজ্জামান ওরফে কামরুল। তার বাড়ি উজিরপুরে হলে ভাড়া থাকেন বরিশাল শহরে।
অপর একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দেন নগরীর নথুল্লাবাদ এলাকার মাছ ব্যবসায়ী ফোরকান। তার নেতৃত্বে নথুল্লাবাদ হোটেল ব্যাবিলনে দীর্ঘদিন জুয়ার আসর বসে আসছিল। তবে বর্তমানে স্পটটি বন্ধ রয়েছে বলে দাবি জুয়াড়–দের।
জুয়া ব্যবসার সাথে জড়িত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রতিদিন জুয়ার আসর থেকে কতিপয় পুলিশ এবং বেশকিছু কথিত সাংবাদিক চাঁদা পেয়ে থাকেন। এর মধ্যে প্রতি রাতে থানা পুলিশের নামে তিন হাজার এবং ডিবি পুলিশের নামে পাঁচ হাজার টাকা চাঁদা তোলা হয় জুয়ার আসর থেকে। এছাড়া দুই কথিত সাংবাদিক পায় দুই হাজার টাকা।
জুয়ার আসর পরিচালনার বিষয়ে ব্যবসায়ী কামালকে তার মুঠোফোনে কল করেও পাওয়া যায়নি। তবে তার সহযোগী যাত্রা শহিদ বলেন, ‘প্রশাসনের চাপে আপাতত জুয়ার আসর বন্ধ আছে। প্রশাসনের কিছু লোককে আমরা টাকা দেই। কিন্তু ওপরের চাপ আসলে তো বন্ধ রাখতেই হয়। তবে বর্তমানে কুয়াকাটা সমুদ্র সৌকতের কয়েকটি হোটেলে জুয়া চলছে বলে জানান শহিদ।
এ প্রসঙ্গে কোতয়ালী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আনোয়ার হোসেন জানান, জুয়ার আসর থেকে পুলিশের কেউ কমিশন নেয় না। ‘মাদক-জুয়ার বিরুদ্ধে আমাদের নিয়মিত অভিযোগ চলছে। গত এপ্রিল মাসেও আমরা ১০-১২টি জুয়া সংক্রান্ত মামলা করেছি। এ বিষয়ে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
আরজেএন