বরিশাল অঞ্চলে নিবন্ধিত অ্যাম্বুলেন্স ৫২টি, চলে প্রায় তিন হাজার

‘ভাই রোগীর অবস্থা অনেক খারাপ, ডাক্তার বলছেন দ্রুত ঢাকায় নিতে হবে। হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া যা কয়, সেই টাকা দিয়া ঢাকায় রোগীর কয়েক দিনের চিকিৎসা খরচ।’ সোমবার দুপুর ১২ টার দিকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়ার চুক্তি করতে আসা রোগীর স্বজন মকবুল হোসেন প্রতিবেদকের কাছে এমনই আক্ষেপ করে কথাগুলো বলেন।
তিনি বলেন, গত ১৯ আগস্ট স্ট্রোক জনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন মঠবাড়িয়া উপজেলার বাসিন্দা মোকসেদ গাজী। তিনি সম্পর্কে আত্মীয়। রোববার তার অবস্থার অবনতি দেখে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ঢাকায় স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। ঢাকায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করতে গেলে বরিশাল থেকে ঢাকায় যেতে চালক ভাড়া চান ১৪ হাজার টাকা। একাধিক চালক একই রকম ভাড়া চায়।
মকবুল হোসেন বলেন, দ্বিগুণ ভাড়া চালকরা সিন্ডিকেট করে নির্ধারিত করে। কি আর করা, চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেয়া দরকার। তাই চালকের চাহিদামতো ভাড়াতেই ঠিক করতে হলো অ্যাম্বুলেন্স।
শুধু মকবুল হোসেন নয়, চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরা, এমন কি ঢাকায় চিকিৎসা সেবা নিতে যাওয়া মাহাবুব রহমান, মামুন মল্লিকসহ বেশ কয়েকটি উপজেলা থেকে আসা আরো কয়েকজন রোগীর স্বজনদের সাথে
কথা বললে একই অভিযোগ করেছেন তারা।
তাদের অভিযোগ, লাশ বহনের ক্ষেত্রেও অ্যাম্বুলেন্স চালকরা কোন ছাড় দেন না। কারণ ব্যক্তি মালিকানা অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়ার কোনো তালিকাও নেই। তাই তাদের চাহিদামতো টাকা ছাড়া তাদের কোনো সহযোগিতাই মেলে না। অনেক সময় রোগীর অবস্থা খারাপ দেখে সুযোগটি কাজে লাগিয়ে ভাড়া বাড়িয়ে দেয় চালকরা। সেসময় টাকার দিক না তাকিয়ে রোগী বাঁচানোর চেষ্টা করতে হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লক্কর ঝক্কর কিছু মাইক্রোবাসে বেড বসিয়ে অ্যাম্বুলেন্স বানিয়েছেন বেশ কিছু চালক। তাদের গাড়ির ফিটনেস নেই। ড্রাইভিং লাইসেন্সও নেই। তাই অ্যাম্বুলেন্সগুলোতে অক্সিজেনসহ রোগীর প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা কিছুই থাকে না।
তবে রোগীদের এসব অভিযোগ অস্বীকার করে হানিফ হোসেন, মিন্টু দাস ও নয়ন খানসহ একাধিক অ্যাম্বুলেন্স চালক বলেন, সবারই কাগজপত্র আছে, কিন্তু নম্বর মাইক্রোবাসের দিয়ে চলছে।
অভিযোগ আছে, শেরে-ই-বাংলা মেডিকেল ঘিরে আছে সক্রিয় দালাল চক্র। এই চক্রটি প্রায় সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। মালিক ও চালকরা সিন্ডিকেট তৈরি করে এক প্রকার রোগী ও তার স্বজনদের জিম্মি করে প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত টাকা আদায় করছে বলে অভিযোগ রোগীর স্বজনদের।
রোগীর স্বজনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বরিশাল থেকে পটুয়াখালী যেতে বেসকারি একটি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া নেয়া হচ্ছে কমপক্ষে ৩০০০ টাকা। একই ভাবে বরগুনা ৩৫০০ থেকে ৪ হাজার, পিরোজপুরে ৪০০০ এবং ঢাকায় ১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা ভাড়া নেয়া হচ্ছে। তাদের এমন আচরণে সর্বস্ব হারাচ্ছে দরিদ্র রোগী ও তাদের স্বজনরা।
বরিশাল অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, সব গাড়ির কাগজ আছে। এখানে যে কয়টা ট্রিপ হয়, তাতে তো চালকদের খাবারই জোটে না। গাড়ির কাগজ করাবে কীভাবে।
বিআরটিএর তথ্যমতে, বরিশাল জেলায় নিবন্ধনকৃত অ্যাম্বুলেন্স আছে ৩৭টি আর মহানগরীতে ১৫টি। কিন্তু জেলা এবং মহানগরীতে প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার অ্যাম্বুলেন্সের চলাচল করছে। এসব অ্যাম্বুলেন্সের অধিকাংই ফিটনেস নেই।
অভিযোগ রয়েছে, এসব অবৈধ অ্যাম্বুলেন্স চালকরা ট্রাফিক বিভাগের পুলিশকে নিয়মিত মাসোহারা দেয়। তাই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। যার খেসারত দিচ্ছে সাধারণ রোগী ও স্বজনরা।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে, উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) এসএম তানভীর আরাফাত জানান, ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে মাসোহারা নেয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, ফিটনেস বিহীন অ্যাম্বুলেন্সের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান আছে।
এদিকে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে জানিয়ে অবৈধ অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না বলে স্বীকার করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, মানহীন অ্যাম্বুলেন্স যাতে হাসপাতাল চত্বরে না থাকে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অন্যদিকে বরাবরের মতো এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে বিআরটিএ ও জেলা প্রশাসন।
বিআরটিএ বরিশাল বিভাগের পরিচালক জিয়াউর রহমান বলেন, অবৈধ অ্যাম্বুলেন্সে দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। অধিকাংশই ফিটনেস বিহিন এবং মাইক্রোবাস দিয়ে তৈরি। আমরা এখন তাদের আর সুযোগ দেব না। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে সেগুলো চলাচল বন্ধ করে দেব।
খুব শিঘ্রই অবৈধ অ্যাম্বুলেন্সের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর আশ^াস দিয়েছেন জেলা প্রশাসক শহিদুল ইসলাম।
আরজেএন