ঢাকা সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬

Motobad news
আহবায়কের গ্রেফতার নিয়ে দলীয় ফোরামে গুঞ্জণ

ভাঙনের পথে বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির ৬ বিতর্কিত কমিটি

ভাঙনের পথে বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির ৬ বিতর্কিত কমিটি
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

নানা বিতর্ক আর কমিটি বাণিজ্যের অভিযোগে সম্প্রতি ভেঙে দেয়া হয়েছে বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটি। এর বিপরিতে গঠন হয়েছে দুই সদস্যের আহবায়ক কমিটি। তবে যেসব অভিযোগ এবং বিতর্কের কারণে কমিটি ভাঙা হয়েছে সেইসব বিতর্কিত ইউনিট কমিটির বিরুদ্ধে নেয়া হয়নি ব্যবস্থা।

যদিও বিতর্ক সৃষ্টি করে গঠন হওয়া উপজেলা এবং পৌরসভা বিএনপির কমিটিগুলো বাতিল করার প্রস্তুতি নিয়েছে নবগঠিত দক্ষিণ জেলা বিএনপি। ঢাকায় বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ পরবর্তী এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা থাকলেও তা আটকে গেছে দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহবায়ক আবুল হোসেন খান গ্রেফতার হওয়ার কারণে। যদিও তার গ্রেফতারের পেছনে বিতর্কিত কমিটির নেতাদের যোগসূত্র রয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে দলীয় ফোরামে। তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই বলে জানিয়েছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা।

জানা গেছে, ‘দীর্ঘ বছর পর গত বছরের ৩ নভেম্বর পূর্বের কমিটি ভেঙে অনুমোদন দেয়া হয় বরিশাল জেলা ও মহানগর বিএনপির আহবায়ক কমিটি। এরমধ্যে দক্ষিণ জেলা বিএনপির কমিটিতে সাবেক ছাত্র নেতা মুজিবুর রহমান নান্টুকে আহবায়ক এবং আখতার হোসেন মেবুলকে সদস্য সচিব করা হয়েছিল। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৪৭ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ আহবায়ক কমিটি অনুমোদন পায় দক্ষিণ জেলা।

তবে বছর না যেতেই নানা বিতর্ক আর কমিটি বাণিজ্যের অভিযোগে চলতি বছরের গত ১৫ নভেম্বর ভেঙে দেয়া হয় দক্ষিণ জেলা বিএনপির এই কমিটি। এর অনুক‚লে একইদিন সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হোসেন খানকে আহবায়ক এবং জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম শাহিনকে সদস্য সচিব করে দুই সদস্যের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয় কেন্দ্র থেকে।

বিএনপির নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ‘শুরু থেকেই দক্ষিণ জেলা বিএনপি নেতৃবৃন্দর বিরুদ্ধে কেন্দ্রের নির্দেশনা উপেক্ষা করে একক আধিপত্য গড়ে তোলার অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আরও বিতর্কে জড়ান আহবায়ক এবং সদস্য সচিব। ত্যাগি নেতাদের বাদ দিয়ে অবৈধ সুবিধা নিয়ে বিতর্কিত এবং নিস্কৃয়দের কমিটি পদ দিয়ে সমালোচনায় পড়েন তারা।

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, ‘দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহবায়ক কমিটির নেতৃবৃন্দ বাকেরগঞ্জ উপজেলা এবং পৌরসভা, বাবুগঞ্জ উপজেলা, উজিরপুর উপজেলা ও পৌরসভা এবং বরিশাল সদর উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটি ঘোষণা করে। এরমধ্যে উজিরপুর উপজেলা বিএনপির কমিটি ঘোষণার পর পরই বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেন উপজেলা বিএনপির দুঃসময়ের নেতা সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টুসহ বেশ কয়েকজন।

এরপর ঘোষণা করা হয় বরিশাল সদর উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটি। নিয়েও বিতর্কে পড়েন দক্ষিণ জেলার নেতারা। নতুন কমিটি এবং দক্ষিণের সাবেক নেতাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে বিক্ষোভের পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলন করেন বঞ্ছিত নেতারা।

সংবাদ সম্মেলনে তাদের অভিযোগ ছিল- কেন্দ্রের এবং বরিশালের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নির্দেশনা উপেক্ষা করে সদর উপজেলা বিএনপির কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এমনকি কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সুবিধাও গ্রহণ করেছেন সাবেক নেতারা। জামাত থেকে পদত্যাগ করা স্বর্ণ ব্যবসায়ী নুরুল আমিনকে অর্থের বিনিময়ে আহবায়ক পদ দেয়া হয় বলে অভিযোগ তোলেন বঞ্ছিতরা। তাদের দাবি বিগত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করেন নুরুল আমিন। তাছাড়া এই কমিটির সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম সেলিমও আওয়ামী লীগের এজেন্ট বলে অভিযোগ বঞ্ছিতদের।

অপরদিকে, সদর উপজেলা বিএনপির কমিটি নিয়ে বিতর্ক না কাটতেই ঘোষণা করা হয় বাকেরগঞ্জ উপজেলা এবং পৌরসভা এবং বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির কমিটি। এরমধ্যে বাকেরগঞ্জ উপজেলায় হিরণ সিকদারকে আহবায়ক ও মিজানুর রহমান চুন্নুকে সদস্য সচিব, বাকেরগঞ্জ পৌরসভায় নাসির জমাদ্দারকে আহবায়ক এবং মোফাজ্জেল হোসেনকে সদস্য সচিব, বাবুগঞ্জ উপজেলায় ইসরাত হোসেন কচিকে আহবায়ক এবং অহিদুল ইসলাম প্রিন্সকে সদস্য সচিব করা হয়।

দলীয় সূত্র বলছে, ‘বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপিতে প্রার্থী দিয়েছিলেন দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন। কিন্তু নতুন কমিটিতে তার লোকেদের জয়গা দেয়নি দক্ষিণ জেলা বিএনপি। আবার বাকেরগঞ্জ উপজেলা এবং পৌর বিএনপিতে ত্যাগি এবং নির্যাতিত নেতাদের অমূল্যায়ন করা হয়। কমিটি নিয়ে দক্ষিণ জেলা বিএনপির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের পাহার জমে কেন্দ্রে। তাই শেষ পর্যন্ত পদ হারাতে হয়েছে দক্ষিণ জেলা বিএনপির ৪৭ নেতার।

এদিকে, ‘দক্ষিণ জেলার আহবায়ক কমিটি ভাঙলেও এখনো বহাল রয়েছে বিতর্কের সৃষ্টি করে গঠন হওয়া উপজেলা এবং পৌরসভা ইউনিট কমিটিগুলো। এমনকি বিতর্কিত কমিটির নেতারাও নিজেদের পদ ঠিক রাখতে নিয়মিত তৈলমর্দন করে যাচ্ছেন নতুন আহবায়কএবং সদস্য সচিবের। তবে নেতাদের তৈলমর্দন শেষ পর্যন্ত বিতর্কিতদের পদে টিকিয়ে রাখতে পারবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপি নেতারা। কেননা এরিমধ্যে বিতর্কিত কমিটিগুলো ভেঙে দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা জানিয়েছেন নেতারা।

গত ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে গ্রেফতার হন দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহবায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হোসেন খান। গ্রেফতারের দুদিন আগে তিনি মতবাদকে বলেন, ‘বিতর্কের সৃষ্টি করে গঠন হওয়া কমিটির বিষয়ে আমরা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছতে যাচ্ছি। যেহেতু কমিটিগুলো নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তাই সবাইকে নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হবে এ বিষয়ে। আর এটা ঢাকার সমাবেশের পর পরই নেয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার গ্রেফতারের কারণে সেই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।

যদিও আবুল হোসেনের গ্রেফতারের বিষয়টি নিয়ে দলীয় ফোরামে সমালোচনা রয়েছে। বলা হচ্ছে যেসব বিতর্কিত কমিটি ভাঙার সিদ্ধান্ত হয়েছে সেইসব কমিটির বিতর্কিত নেতারাই আবুল হোসেনের গ্রেফতারের পেছনে কলকাঠি নেড়েছেন। পুলিশের সাথে ঘোপনে সংখ্যতা এবং তথ্য দিয়ে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাকে। এমন গুঞ্জণ দলীয় ফোরামে থাকলেও কেউ জোড় দিয়ে তার প্রমাণ দিতে পারছেন না।

বিএনপির বরিশাল জেলা দক্ষিণের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবুল কালাম শাহিন বলেন, ‘আমরা কমিটি পেয়েছি মাত্র কয়েকদিন হলো। এরমধ্যেই আমার আহবায়ক গ্রেফতার হয়েছে। যে কারণে সাংগঠনিক কার্যক্রম কিছুটা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। তবে তাকে গ্রেফতারের পেছনে বরিশালের কোন নেতারা হাত রয়েছে কিনা সে বিষয়টি আমি নিশ্চিত নই বা কেউ আমাকে এমন কথা বলেওনি।

তিনি বলেন, ‘বিতর্ক সৃষ্টি করে যেসব কমিটি গঠন হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবার কথা ছিল ঢাকা বিভাগের সমাবেশের পরে। কিন্তু আহবায়ক গ্রেফতার হওয়ায় সেটা আর হয়নি। তিনি মুক্তি পেলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে। দলের জন্য ক্ষতিকর এমন কোন কিছুকেই আমরা প্রশ্রয় দিবো না। দলকে শক্তিশালী করতে সবাইকে নিয়েই বিতর্কিত কমিটিগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। এতে যদি প্রয়োজন হয় বিতর্কিত কমিটি ভেঙে দেয়ার, তবে সেটাই করা হবে।
 


এএজে
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন