যে কারণে পদ হারিয়েছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির ৪৭ নেতা

দীর্ঘ অপেক্ষার পরে ঘোষণা হয়েছিল বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির ৪৭ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি। নতুন এবং পুরানো নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করার নির্দেশনা ছিলো এই কমিটির ওপর। কিন্তু ঘটিয়েছেন উল্টোটা।
ইউনিট কমিটি গঠনে আর্থিক লেনদেনসহ একক আধিপত্য গড়তে গিয়ে বিতর্কে জড়ান আহ্বায়ক এবং সদস্য সচিব। তার ওপর দলের মহাসচিবের ফোন না ধরা এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ আরও বেকায়দায় ফেলে দেয় দক্ষিণ জেলা বিএনপিকে।
আর এসব কারণেই শেষ পর্যন্ত পদ হারাতে হয়েছে আহ্বায়ক, সদস্য সচিবসহ কমিটির ৪৭ সদস্যকে। গত ১৫ নভেম্বর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির পুরানো আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের নাম ঘোষণা করেন। এই কমিটিতে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হোসেন খানকে আহ্বায়ক ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম শাহিনকে সদস্য সচিব করা হয়েছে।
যদিও পূর্বের কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সদস্যরা নতুন কমিটিতে বহাল থাকবে কিনা সে বিষয়টি এখনো সুস্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির বরিশাল বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিলকিছ আক্তার জাহান শিরিন।
দক্ষিণ জেলা বিএনপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, ‘দীর্ঘ অপেক্ষার পরে চলতি বছরের গত ২২ জানুয়ারি সাবেক ছাত্র নেতাদের সমন্বয়ে বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটিতে মুজিবুর রহমান নান্টুকে আহ্বায়ক এবং আখতার হোসেন মেবুলকে সদস্য সচিব করা হয়।
নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, নতুন কমিটির ক্ষমতা পাওয়ার পর থেকেই দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এবং সদস্য সচিব নিজ সীমানায় একক আধিপত্য গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। কেন্দ্রের নির্দেশনাকে পাশ কাটিয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সাংগঠনিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা শুরু করেন। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে জেলা এবং পৌরসভা ইউনিট কমিটি গঠন শুরু করেন।
দলীয় সূত্র জানায়, বানারীপাড়া উপজেলা বিএনপির কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিতর্কের জাল বুনতে শুরু করেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এবং সদস্য সচিব। দলের দুসময়ের নেতা এস সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টুকে বাদ দিয়ে কমিটি ঘোষণার পর পরই বিতর্ক শুরু হয়। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সান্টুসহ নতুন কমিটির কয়েকজন নেতা বিএনপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
এদিকে, বরিশাল সদর উপজেলা (কোতয়ালী) বিএনপির কমিটি ঘোষণার পরপরই নতুন বিতর্কে জড়ান দক্ষিণের আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব। আওয়ামী লীগ অনুসারী এবং নির্বাচনে বিএনপির বিপক্ষে অবস্থান নেয়া নেতাদের নিয়ে কমিটি গঠনের অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেন বাদ পড়া এবং অবমূল্যায়নের শিকার নেতারা। তাদের অভিযোগ কেন্দ্রের নির্দেশনা উপেক্ষা করে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে জামাত থেকে আসা ব্যক্তিকে আহ্বায়ক এবং নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর নির্বাচনের প্রধান সমন্বয়কারীকে যুগ্ম আহ্বায়ক করার।
এমনসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ৫ নভেম্বর বিভাগীয় গণসমাবেশের পূর্বে বরিশাল জেলা এবং মহানগর বিএনপির কমিটি গঠন কার্যক্রমে মৌখিকভাবে স্থগিত করে কেন্দ্র। কিন্তু কেন্দ্রের নির্দেশনার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে সমাবেশের পরদিন ৬ নভেম্বর বাকেরগঞ্জ এবং বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির কমিটি ঘোষণা করেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সদস্য জানিয়েছেন, ‘বাকেরগঞ্জ এবং বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে দক্ষিণ জেলার আহ্বায়ক মুজিবুর রহমান নান্টু এবং সদস্য সচিব আখতার হোসেন মেবুলের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে কেন্দ্রে অভিযোগ করেন বাকেরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হোসেন খান। এমনকি অনুসারী নেতারা বাদ পড়ায় ক্ষুব্ধ হন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন।
সূত্রটি আরও জানায়, ‘অভিযোগ পেয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মুজিবুর রহমান নান্টুকে ফোন করেন। কিন্তু নান্টু তার ফোন রিসিভ করেননি। এছাড়া সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ফোন করে অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তার সাথে দুর্ব্যবহার করেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মুজিবুর রহমান নান্টু। আর এ কারণে শেষ পর্যন্ত পদ হারাতে হয়েছে দক্ষিণ জেলা বিএনপির ৪৭ সদস্যকে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি বরিশাল বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিলকিছ আক্তার জাহান খান শিরিন বলেন, ‘দক্ষিণ জেলা বিএনপির কমিটির নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে সমন্বয়হিনতার অভিযোগ ছিলো।
কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা ছিলো সবাইকে নিয়ে সমন্বয় করে কাজ করার। কিন্তু বিলুপ্ত হওয়া কমিটির নেতৃবৃন্দর বিরুদ্ধে কেন্দ্রের নির্দেশনা না মানার অভিযোগ ছিলো। তাছাড়া কিছু কমিটি দিয়েছেন, সেগুলো নিয়েও অভিযোগ এবং আপত্তি ছিলো। সবমিলিয়ে কেন্দ্র থেকে নতুন আহ্বায়ক কমিটি দেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘নতুন কমিটিতে দেখেছি শুধুমাত্র দুই সদস্য অর্থাৎ আহ্বায়ক এবং সদস্য সচিবের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন কমিটিতে আগের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সদস্যরা বহাল থাকবে নাকি সে বিষয়টি আমরা নিশ্চিত নই। এটি জানতে একটু সময় লাগবে। নতুন কমিটির বিষয়ে আমরা আরেকটি চিঠি পাবো। চিঠিটা পেলে বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া যাবে।
এইচকেআর