দেশ-বিদেশে ক্রীড়া অঙ্গনে পরিচিত মুখ আগৈলঝাড়ার শহিদুলের অর্থনৈতিক দৈন্যদশায় কাটছে জীবন

বরিশালের আগৈলঝাড়ার ক্রীড়া অঙ্গনে পরিচিত মুখ শহিদুল ইসলাম, বিশেষ করে ফুটবল খেলায় ৩ যুগ ধরে মাঠ কাপানো এই খেলোয়ার ফুটবল প্রেমীদের মাঝে প্রশংসা কুরিয়ে আসছেন।
আগৈলঝাড়া উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী সকল জেলা উপজেলায় যে কোন ফুটবল খেলায় শহিদুল ইসলামের উপস্থিতি প্রচার হলে, তার ফুটবলের অসামান্য ক্রিড়া নৈপুণ্য উপভোগ করতে দর্শকদের ভিড়ে মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। জেলা উপজেলার সেরা খেলোয়ার ও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অসংখ্য গৌরব অর্জন করে, ডাক পেয়েছিলেন ঢাকা আবাহনী অনূর্ধ্ব ১৯ দলে, পরিবারের অসচ্ছলতার কারনে সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি আজো।
বিদেশের মাঠে খেলার অভিজ্ঞতাও রয়েছে শহিদুল ইসলামের। বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে ও ফুটবল খেলার মান উন্নয়নে প্রতিদিন বিকেলে স্থানীয় কলেজ মাঠে খেলোয়ারদের অনুশীলন দিয়ে আসছেন তিনি এবং নিজ উদ্যোগে তরুন খেলোয়ারদের মাঝে ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণও করেছেন।
জানাগেছে উপজেলার বাকাল ইউনিয়নের ফুল্লশ্রী গ্রামের হাসেম ফকিরের ছেলে শহিদুল ইসলাম স্কুল জীবন থেকেই খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী ছিল। একটা সময় বরিশাল উত্তরে ভাল খেলোয়ার হিসেবে শহিদুলের নাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে, ফুটবল খেলায় সেরা নৈপুণ্য মানেই শহিদল ইসলাম। ফুটবল খেলায় অসামান্য অবদানের জন্য শহিদুল ইসলাম আগৈলঝাড়া একাদশের অধিনায়ক ছিলেন দীর্ঘদিন, আগৈলঝারাসহ আশে-পাশের জেলা উপজেলায় বড় কোন ফুটবল খেলার আয়োজন হলে ভাল খেলোয়ার হিসেবে ডাক পরতো শহিদুলের।
খেলোয়ার হিসেবে শহিদুল মাঠে উপস্থিত হলে মাঠ পরিপূর্ণ হত দর্শকে, তার খেলায় দর্শকরা ভিন্ন মাত্রার অনুভূতি ও আনন্দ খুজে পেত, শহিদুলের পা'এ বল মানে ফুটবলে প্রতিপক্ষের খেলোয়ারদের কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা দিত, মাঠে তার খেলায় সু-দক্ষ কৌশল ও নৈপূণ্যতা দেখে সে সময় দর্শকরা তাকে করতালি ও স্লোগান দিয়ে উৎসাহ দিতেন। অনেকে আবার দেশী-বিদেশী অনেক খেলোয়ারের সাথে তুলনা করে শহিদুলকে কালো মানিক বলেও ডাকতেন।
একাধিক ফুটবল টুর্নামেন্টে কখনো সেরা খেলোয়ার, কখনো সর্বাধিক গোলদাতা, আবার কখনো বা হ্যাট্রিক করার অর্জন রয়েছে শহিদুলের, তার ঝুড়িতে রয়েছে অসংখ্য সনদ, মেডেল ও ট্রফি। এভাবেই জেলা উপজেলা আন্ত জেলা, স্কুল কলেজ ও বিভাগীয় পর্যায় ফুটবল ও এ্যাথলেটিকস সহ বিভিন্ন ইভেন্টে রয়েছে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার গৌরব।
১৯৯৪ সালে জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় উচ্চ লাফে প্রথম স্থান অধিকার করে গোল্ড মেডেল পান, ১৯৯৬ সালে বরিশালের হয়ে জাতীয় এ্যাথলেটিকসে ঢাকায় প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করে আগৈলঝাড়ার শহিদুল, পরবর্তীতে ঢাকা আবাহনী ক্লাবে অনূর্ধ্ব ১৯ এ মনোনিত হন তিনি।
দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় সংসারে অসচ্ছলতার কারণে ১৯৯৭ সালে জীবিকার তাগিদে পাড়ি জামান মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে, সেখানে কাজের ফাকে সময় পেলে ছুটে যেতেন খেলার মাঠে, তার ক্রিড়ানৈপুণ্য দেখে ওমানের আল বিধিয়া ক্লাবের হয়ে ফুটবল খেলতে মনোনিত হন বাংলাদেশের শহিদুল ইসলাম।
ফুটবল খেলায় শহিদুলের সু-নৈপূণ্য দেখে সে সময় আরব দেশের মানুষের মাঝে বাংলাদেশের খেলোয়ার শহিদুলের নাম ছড়িয়ে পরে। প্রবাসে অবস্থানকালে ও দেশে ফিরে আগৈলঝাড়ার খেলোয়ারদের মাঠে টানতে দিতেন উৎসাহ উদ্দিপনা ও বিভিন্ন পরামর্শ, এমন কি খেলোয়ারদের মাঝে ক্রীড়া সামগ্রীও প্রদান করেছেন নিজ উদ্যোগে।
সাবেক খেলোয়ার হিসেবে শহিদুল ইসলামকে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে জাতীয় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্মানী ভাতা হিসেবে অর্থ সহায়তা প্রদান করেছেন ।
দীর্ঘদিন প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরলে তার স্ত্রী মুন্নি বেগমের দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে প্রবাস জীবনের সঞ্চিত সমস্ত অর্থ ব্যয় করে ভারতে চিকিৎসা করিয়ে স্ত্রীকে সুস্থ করে তোলেন।
অর্থ উপার্জনের কোন পথ না থাকায় নিজের জমিসহ অন্যের জমিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন শহিদুল। বর্তমানে মা স্ত্রীসহ তিন সন্তান নিয়ে অর্থনৈতির দৈন্যদশার মধ্যে দিয়ে জীবন পার করছেন পঞ্চাশউর্ধ্ব বয়সী এই খেলোয়াড়।
শহিদুলের পরিবার যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সাবেক খেলোয়ার হিসেবে শহিদুলের সম্মানী ভাতা অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছে।
এবিষয়ে শহিদুল ইসলাম জানান ছোট বেলা থেকেই খেলা-দুলার প্রতি আমার ভালবাসা ছিল প্রবাসী জীবনেও কাজের ফাকে খেলায় অংশ নিয়েছি, বর্তমানে সংসারের চাহিদা মিটাতেই হিমসিম খাচ্ছি, এরপরেও খেলা-দুলায় মাঠে সময় দিয়ে যাচ্ছি, আমি আগৈলঝাড়ায় ক্রীড়া এ্যাকাডেমী খোলার উদ্যোগ নিয়েছি, অর্থ সংকটের কারণে এগোতে পারছি না।
আগৈলঝাড়ার একাদশের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শৈলেশ তপাদার বলেন অত্র অঞ্চলের মধ্যে শহিদুল ভাল মানের একজন ফুটবল খেলোয়ার এবং উচ্চ লাফে জাতীয় পর্যায় গোল্ড মেডেল প্রাপ্ত, বিদেশের মাটিতেও খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার, আমি তার সাফল্য কামনা করছি।
এ ব্যাপারে আগৈলঝাড়া উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারন সম্পাদক সরদার হারুন রানা বলেন, আগৈলঝাড়া একাদশের সাবেক অধিনায়ক শহিদুল ইসলাম একজন ভাল মানের ফুটবল খেলোয়ার, পরিবারের অর্থ সংকটের কারণে খেলোয়ার হিসেবে জীবনে সফলতা পায়নি, আমি সরকারের কাছে শহিদুলকে সব ধরনের সহযোগীতা প্রদানের জন্য দাবি জানাই।
এইচকেআর