রূপাতলী হাউজিং এস্টেট এখন বাণিজ্যিক কেন্দ্র!

সরকারের সকল নিয়মকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলিকে দেখিয়ে আইন বর্হিভ‚তভাবে নগরীর রূপাতলী হাউজিং এলাকায় গড়ে উঠছে একের পর এক অবৈধ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এতে করে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। তবে অবৈধ এসব প্রতিষ্ঠানকে মাসোহারার বিনিময়ে বৈধতা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।
সূত্রমতে, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে ৪৭০টি আবাসিক প্লট নিয়ে বিসিসির ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে গড়ে তোলা হয় ‘রূপাতলী হাউজিং এস্টেট’। বরাদ্দ প্রাপ্তির নীতিমালা অনুযায়ী কোন গ্রাহক তাদের নির্মিত স্থাপনায় কোন ধরণের বাণিজ্যিক স্থাপনা বা প্রতিষ্ঠান নির্মঠু করতে পারবেন না। বিষয়টি মনিটরিংয়ের জন্য জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের একজন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর নেতৃত্বে ১৮ সদস্যের একটি দফতর কাজ করলেও তাঁরা আছেন ঠুটোজগন্নাথের ভূমিকায়।
সরেজমিনে দেখাগেছে, ‘রূপাতলী হাউজিং এস্টেট’ এ অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে কাঁচা বাজার, বেসরকারি স্কুল ও কলেজ, মাদ্রাসা, কিন্ডার গার্ডেন, এনজিও, হাসপাতাল, আবাসিক হোটেল, ফার্নিচারের শো-রুম, বিউটি পার্লার, ফ্যাশন হাউজ, ইলেকট্রিক শপ, হার্ডওয়ার, স্যানিটারি, খাবার হোটেল, স্টুডিও, কম্পিউটার শো-রুম, ফোন-ফ্যাক্স, মোবাইল শো-রুম, গার্মেন্টস শো-রুম, জুতার শো-রুম, অটোমোবাইল মেশিনারি শো-রুম, স্টেশনারি, মুদি দোকানসহ কয়েকশ’ অবৈধ বাণিজ্যিক স্থাপনা। এমনকি এস্টেটের প্রধান প্রবেশ গেটটিও ব্যবহৃত হচ্ছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড হিসেবে। আর এগুলো বরাদ্দ দিয়ে মালিকপক্ষ জামানত হিসেবে আদায় করছে কোটি কোটি টাকা যা সম্পূর্ণ আইন বহিভর্‚ত। তার ওপর এ সকল বাণিজ্যিক স্থাপনায় ব্যবহৃত বিদ্যুৎবিল পরিশোধ হচ্ছে আবাসিক হিসেবে।
নিয়ম অনুযায়ী হাউজিং এলাকায় সরকারিভাবে বাজারের জন্য একটি স্থান বরাদ্দ থাকলেও সেখানে কোন স্থাপনা গড়ে উঠেনি। ভাসমান ব্যবসায়ীরা নিজ উদ্যোগে বাজার বসিয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে বাণিজ্যিককে আবাসিক বিলে রূপান্তরিত করে দুই-একটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে মাসিক তিন থেকে পাঁচ শ’ টাকা করে উৎকোচ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের দায়িত্বরত লাইন সাহায্যকারীর বিরুদ্ধে।
রূপাতলী হাউজিং এস্টেট এ অবস্থিত হাওলাদার মার্কেটের মালিক জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমি টাকা দিয়ে জমি ক্রয় করে মার্কেট করেছি। আইন অনুযায়ী আপনি এখানে মার্কেট করতে পারেন কিনা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি দ্বিতীয় পার্টি। আমার জন্য ওই আইন প্রযোজ্য নয়।’
তবে বিষয়টি সঠিক নয় দাবি করে রূপাতলী হাউজিং এস্টেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের উপ-সহকারী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দ্বিতীয় হোক কিংবা তৃতীয়, এখানে বসবাসকারী সকলের ক্ষেত্রেই একই আইন প্রযোজ্য।’
তিনি বলেন, ‘আমরা রূপাতলী হাউজিং এস্টেটে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণকারীদের নোটিশ দিয়েছি। তাঁরা বিষয়টি কর্ণপাত করছে না। বিষয়টি ঢাকা অফিসকে অবহিত করা হয়েছে উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘পটুয়াখালী হাউজিংয়ের ভিতর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে বরিশালে অর্থাৎ রূপাতলী হাউজিংয়ের অবৈধ স্থাপনাও উচ্ছেদ করা হবে। তবে বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে। এ ভবনটি নির্মিত হলে অবৈধ স্থাপনা এমনিতে থাকবে না।’
এ প্রসঙ্গে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্টিবিউশন কোম্পানির বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ এর নিবার্হী প্রকৌশলী মো. আমজাদ হোসেন বলেন, ‘রূপাতলী হাউজিং এস্টেটে বাণিজ্যিক সংযোগ দেয়ার কোন সুযোগ নেই। যারা অবৈধভাবে আবাসিক মিটারের মাধ্যমে বাণিজ্যিক সংযোগ ব্যবহার করছে সুনিদিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
রূপাতলী হাউজিং এস্টেট কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. আবুল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মো. কাওছার হোসেন শিপন বলেন, ‘এখানে বসবাসকারী কোন ব্যক্তি কোন ধরণের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন না। তাঁর পরেও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আমাদের অনুরোধ এবং মৌখিক নির্দেশকে অমান্য করে একের পর এক বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছি তাঁরা যেন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে পূর্বের অবস্থান ফিরিয়ে আনেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাগেছে, ১৯৮০ সালে হাউজিং এলাকায় ৪৫ একর জমিতে ৪৭১টি প্লট বরাদ্দকালে হাউজিংয়ের বাসিন্দাদের জন্য ১২তলা মার্কেট নির্মাণের জন্য একাংশে জমি বরাদ্দ রেখে নকশা তৈরী করা হয়। এর মধ্যে জমির মূল্য বেড়ে যাওয়ায় ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে জেলা পরিষদ থেকে ছয় শতক জমির ওপর ১৫টি স্টল নির্মাণের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হয়। নির্মাণ কাজ শুরুর পর থেকে হাউজিংয়ের বাসিন্দারা লিখিত এবং মৌখিকভাবে জেলা পরিষদকে বিষয়টি অবহিত করলেও তা কর্ণপাত হয়নি। বরং ক্ষমতাসীন দলের ওই ঠিকাদার প্রভাব খাটিয়ে ১২ শতক জমি দখলে নিয়ে ১৪০ ফুটের স্থলে ৩ শ’ ফুট জমিতে ৫৮টি স্টল নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে কোনভাবে কাজ বন্ধ করতে না পেরে হাউজিংয়ের বাসিন্দা জনৈক আবুল কালাম উচ্চাদালতে রীট করেন। একই বছরের ৮ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের বিচারপতি কাজী রেজাউল হক এবং বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের ডিভিশন বেঞ্চ মার্কেট নির্মাণ কাজ বন্ধের নির্দেশ দেন।
এইচকেআর