প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে বীর মুক্তিযোদ্ধা নাটু বাবু’র নামে হলো বিদ্যালয়

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত এবং যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত কুমোদ বন্ধু রায় চৌধুরীর (নাটু বাবু) হাতে প্রতিষ্ঠিত বাকেরগঞ্জের শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সোমবার (২৯ আগস্ট) উপ-সচিব সোনামনি চাকমা স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সুপারিশের পেক্ষিতে শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়টির নাম পরিনবর্তন করে শহীদ কুমোদ বন্ধু রায় চৌধুরী (নাটু বাবু) মাধ্যমিক বিদ্যালয় নামে নামকরণ করা হয়।
এরমাধ্যমে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এই মহান মানুষটিকে সম্মান জানালো রাষ্ট্র। এই ঘোষণায় সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ কুমোদ বন্ধু রায় চৌধুরী (নাটু বাবু) এর পরিবার ও বাকেরগঞ্জবাসী।
বাকেরগঞ্জের কৃতী সন্তান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সচিব মো. আমিনুল ইসলাম খান বলেন, বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের সরকার। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানাতেই এই সরকার বিভিন্ন সড়ক, সেতু এবং বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে মুক্তিযোদ্ধাদের নামে নামকরণ করছেন।
এরই ধারিাবাহিকতায় বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করে বীর মুক্তিযোদ্ধা কুমোদ বন্ধু রায় চৌধুরী (নাটু বাবু) এর নামে নামকরণ করা হয়েছে। আমি বাকেরগঞ্জের একজন সন্তান হিসেবে বাকেরগঞ্জের জনগণের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
বরিশালের প্রবীণ সাংবাদিক ও আইনজীবী এ্যাডভোকেট মানবেন্দ্র বটব্যাল বলেন, ‘নাটু বাবু প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি তাঁর নামে নামকরণের মধ্যদিয়ে তাঁকে আরো সম্মানিত করা হল। এর মাধ্যমে বাকেরগঞ্জবাসী দীর্ঘকাল তাঁকে মনে রাখবে। তাঁর অবদান সম্পর্কে জানতে পারবে।’
জমিদার কুমোদ বন্ধু রায় চৌধুরী (নাটু বাবু) এর ছোট ছেলে লন্ডন প্রবাসী বিপ্লব বানী রায় চৌধুরী বলেন, ‘দীর্ঘদিন পরে হলেও সরকার আমার বাবাকে সন্মানিত করেছে। এর জন্য আমি বর্তমান সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যাঁরা লড়াই করছে তাদেরকেও আমি ধন্যবাদ জানাই। বিশেষ করে তিনি সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।’
বাকেরগঞ্জের কৃতী সন্তান ও কেন্দ্রীয় যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক বিশ্বাস মুতিউর রহমান বলেন, ‘বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধা বান্ধব সরকার। এই সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত সম্মান দিয়েছে। এতে আমরা খুশি ও সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।
জানা যায়, বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর গ্রামে নাটু বাবু’র জমিদার বাড়ি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর এই বাড়িটি ও জমিদার পরিবারের প্রতিষ্ঠিত শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গড়ে তোলা হয়।
২৫ মার্চ যুদ্ধ শুরুর পর বরিশাল অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছিল জমিদার বাড়িটি। এখানে বসেই মুক্তিযুদ্ধের পরিকল্পনা করা হতো।
১৬ শতকের দিকে এ জমিদার বাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেন প্রসন্ন কুমার রায় চৌধুরী। ১৯ শতকের গোড়ার দিক পর্যন্ত জমিদারির ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন তাদের পঞ্চম বংশধর কুমোদ বন্ধু রায় চৌধুরী (নাটু বাবু)। ১৯৭৩ সালে স্বাধীনতা বিরোধীরা নাটু বাবুকে হত্যা করে। এরপর থেকে হারিয়ে যায় জমিদার বাড়ির সোনালী ইতিহাস।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, আজন্ম বিপ্লবী জমিদার নাটু বাবু ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের অকুতোভয় সৈনিক। জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের সহচার্যে এসে বাঙালির মুক্তির নেশায় বিভোর ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী নাটু বাবু।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর একজন জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি (নাটু বাবু) নিজ গ্রাম শ্যামপুরে মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগঠিত করতে থাকেন মুক্তিযোদ্ধাদের। জমিদার পরিবারের প্রতিষ্ঠিত শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গড়ে তোলেন মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প।
২৫ মার্চের পর যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে বরিশাল অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের অভয়াশ্রমে পরিণত হয় এই জমিদার বাড়িটি। এখানে বসেই মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের পরিকল্পনার বৈঠক হতো। একই সাথে এই পরিবারটি জমিদার হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিক সহায়তা থেকে শুরু করে সকল প্রকার সহায়তা করেছেন জমিদারি কোষাগার থেকে।
এদিকে, বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি স্থাপিত হয় ১৯৩২ সালে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যালয়টির ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। সম্প্রতি বিদ্যালয়ে নতুন একটি চারতলা ভবন হয়েছে, মাঠ ভরাট করা করা হয়েছে।
কুমোদ বন্ধু রায় চৌধুরীর (নাটু বাবু) এর নামে বিদ্যালয়টির নামকরণ হওয়ায় বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরাও খুশি হয়েছেন। এর মাধ্যমে কুমোদ বন্ধু রায় চৌধুরী (নাটু বাবু) চিরকাল সকলের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে বলে মনে করেন এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্ট সকলেই।
এএজে