গরমের শুরুতেই বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট

‘পানির অপর নাম জীবন’। জন্ম থেকে মৃত্যু সকল পর্যায়ে পানির চাহিদা অপরিসিম। বসন্তের শুরুতে রোদের তাপমাত্রার সাথে সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে বিষুদ্ধ পানির চাহিদা। কিন্তু গরমের শুরুতেই নগরজুড়ে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। গভীর নলকূপ থেকে মিলছে না চাহিদা অনুযায়ী পানি। পর্যাপ্ত নলকূপ না থাকার পাশাপাশি পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এমন সংকটের সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের। এ সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তণের পাশাপাশি নগরায়নকে দুষছেন তাঁরা।
বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের পানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ‘একজন মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পানির প্রয়োজনীয়তা অপরিসিম। গোসল থেকে শুরু করে জীবন বাঁচাতে পানি প্রয়োজন। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের তথ্য মতে প্রতিজন মানুষের গোসল থেকে শুরু করে পান করা পর্যন্ত ৯ লিটার পানির চাহিদা রয়েছে। কিন্তু গরম মৌসুমে নগরজুড়ে সেই পানির সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
শুক্রবার সকালে নগরীর কালিবাড়ি রোড এলাকায় চোখে পড়ে পানি নিয়ে এলাকাবাসির দূর্ভোগের দৃশ্য। সকাল থেকেই কালিবাড়ি ধর্মরক্ষিণী সভা চত্বরে পানি পেতে ভীর জমান এলাকার অসংখ্য মানুষ। নলকূপের চার-দিক ঘিরে রাখা হয়েছে পানির কলসী, ড্রাম, বালতীসহ বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে। একে একে লাইনে দাঁড়িয়ে চাহিদা অনুযায়ী পানি নিচ্ছেন কালিবাড়ি রোড এলাকার বসবাসকারীরা।
কথা হয় পানি নিতে আসা ওই এলাকার বাসিন্দা সীমা রাণী ধরের সাথে। তিনি বলেন, ‘আমাদের ছয় সদস্যের পরিবার। পরিবারে পানির চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ লিটার পানির প্রয়োজন। কিন্তু পর্যাপ্ত সরবরাহের অভাবে চাহিদা অনুযায়ী পানি মিলছে না। আবার কালিবাড়ি রোড এলাকায় পর্যাপ্ত টিউবওয়েল নেই। যে কারণে সকাল থেকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে কালিবাড়ি রোড ধর্মরক্ষিণী সভা থেকে পানি নিতে হচ্ছে।
অপরদিকে, পানির সংকটের মধ্যে পড়তে হয়েছে নগরীর সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সেখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসবাসের কলোনীগুলোতে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠান শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ এবং এর আওতাধিন চিকিৎসক ও স্টাফ কোয়ার্টারগুলোতে পানির তীব্র সংকটের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজন, বরগুনার গিলাতলী গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে চারদিন ধরে হাসপাতালে আছি। এখানে বিষুদ্ধ পানির বড়ই সংকট। সাফলাই পানি দিনের দুবার পাওয়া যায়। তাও সর্বোচ্চ এক ঘন্টা করে। কিন্তু যে পানি সরবরাহ দেয়া হচ্ছে তা পান করার উপযোগী নয়। মাঝে মধ্যে সৌচাগারেও পানি থাকে না। বাইরে থেকে বিষুদ্ধ পানি কিনে এনে তা দিয়ে পান করাসহ সকল প্রয়োজনে ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এদিকে, হাপাতালের সামনেই চতুর্থ শ্রেণি স্টাফ কোয়ার্টার। ওই কোয়ার্টের বাসিন্দা ওয়ার্ড মাস্টার (চলতি দায়িত্ব) ইউনুস খান বলেন, ‘শীতের সময় পানির সংকট ছিলো না। সকাল বিকাল সব সময় সাফলাই পানি পাওয়া যেতো। কিন্তু গরমের শুরুতেই পানির সংকট দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন বেলা ১২টার দিকে একবার এবং সন্ধ্যায় এক পানি সরবরাহ দিচ্ছে। যা দিয়ে দৈনন্দিন চাহিদা পুরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। কলোনীর মধ্যে একটি মাত্র গভীর নলকূপ রয়েছে। তা দিয়েই কলোনীর মানুষ সংকট দূর করার চেষ্টা করছেন।
বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের পানি সরবরাহ বিভাগের সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মো. সোহরাব হোসেন জানিয়েছেন, নগরবাসির পানির চাহিদা মেটাতে মোট ৩৭টি পানির পাম্প, ৭টি ট্যাংক এবং সিটি কর্পোরেশনের বিলের আওতায় ১২শ টিউবওয়েল রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সিটি কর্পোরেশনের ৩০টি ওয়ার্ডে মোট প্রতিদিন ৬৫ লক্ষ গ্যালনের ওপর পানির চাহিদা রয়েছে। কিন্তু যেসংখ্যক পানি এবং টিউবওয়েল রয়েছে তা দিয়ে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে ব্যক্তিগত টিউবওয়েল দিয়ে পানির চাহিদা পুরণ করছেন অনেকে।
সিটি কর্পোরেশনের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘মুলত গরমের সময় পানির স্তর নিচে নেমে যায়। এ কারণে এই সময়টাতে পানির সংকট সৃষ্টি হয়। আমরা যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করছি নগরবাসির পানির চাহিদা পুরণের। এ ক্ষেত্রে পানির অপচয় রোধ করার পাশি নলকূপে মটারের ব্যবহার বন্ধ করা জরুরি বলে উল্লেখ করেন সোহরাব হোসেন।
এদিকে, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি গরম মৌসুমে পানির সংকট শুধু নগরজুড়েই নয়। এই সংকট বরিশাল জেলা ছাপিয়ে উপকূল এলাকায়ও পৌঁছেছে। পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছেন না উপকূলীয় এলাকার মানুষও। এমন তথ্যই জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইনুল হাসান।
তিনি বলেন, ‘যতটুকু পানির প্রয়োজন রয়েছে ভূগর্ভ থেকে সেই পরিমাণ পানি পাওয়া যাচ্ছে না। পানির লেয়ার যা থাকার কথা তার থেকে অনেক নিচে নেমে গেছে। এর প্রধান কারণ জলবায়ু পরিবর্তন এবং নগরায়ন। এ কারণে শুধু বরিশাল নগরী নয়, এখন বরগুনা, পটুয়াখালীসহ নদী এবং সাগর তীরে অর্থাৎ উপকূলের মানুষও চাহিদা অনুযায়ী নলকূপ থেকে পানি পাচ্ছেন না।
এই কর্মকর্তা বলেন, ‘বর্তমান সময়ে দেশে উন্নয়ন হচ্ছে। অনেক বড় বড় ভবন উঠছে। এতে পানির চাহিদাও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। মূলত ভূগর্ভের একটি স্তরে বালুর মধ্যে থেকে আমরা বিশুদ্ধ পানি পেয়ে থাকি। পানি তোলার পারে স্তরটি ভরাটের আগেই আবার পানি তোলা হচ্ছে। যে কারণে চাহিদা অনুযায়ী পানি পাওয়া যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে পানির অপচয় রোধ করার পাশাপাশি যান্ত্রীক সাহাজ্যে পানি উত্তল বন্ধ করা জরুরি বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিভাগের এই কর্মকর্তা।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ থেকে জানা গেছে, ‘বরিশাল জেলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৫২ হাজার গভীর নলকূপ অর্থাৎ টিউবওয়েল রয়েছে। যার মধ্যে সচল অবস্থায় আছে ৩২ হাজার ৮২০টি টিউবওয়েল। বাকি ১৯ হাজার টিউবওয়েল এরি মধ্যে বিকল বা বন্ধ হয়ে গেছে। পানিতে আর্সেনিকট এবং লেয়ার কমে যাওয়ার কারণে এসব বিউবওয়েল অকেজো হয়ে আছে বলে জানিয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইনুল হাসান।
এসএম