বরিশালে সাদিয়া সাথীর মৃত্যুর রহস্যে নতুন মোড়

বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেয়া গৃহবধূ সাদিয়া আক্তার সাথীর মৃত্যুর রহস্যে নতুন মোড় নিয়েছে। তিনি আত্মহত্যা করেননি, তাকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ তুলেছে তার পরিবার। তাদের অভিযোগ সাদিয়া আক্তার সাথীকে তার স্বামী বরিশাল জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কনস্টেবল মাইনুলই হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে রেখেছে। এ কারণে ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত স্বামী মাইনুল আত্মপোনে রয়েছে বলে দাবি নিহতের স্বজনদের।
এদিকে, মেয়েকে হত্যার অভিযোগ এনে মঙ্গলবার দুপুরে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতয়ালী মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন সাদিয়ার বাবা সিরাজুল ইসলাম। কিন্তু থানার ওসি হত্যার অভিযোগপত্র গ্রহণ করেননি। এমনকি এই ঘটনায় আদৌ তারা মামলা নিবেন কি নিবেন না সে বিষয়ে পুলিশ কিছু স্পষ্ট করেননি বলে জানিয়েছেন সিরাজুল ইসলাম।
তবে কোতয়ালী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আজিমুল করিম জানিয়েছেন, ‘পরিবার অভিযোগ করেছে। তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আপাতত এই ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। ময়না তদন্তের রিপোর্ট পেয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নিহত গৃহবধূ সাদিয়া আক্তার সাথীর দুলাভাই বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নূরে আলম বেপারী বলেন, ‘সাদিয়ার আত্মহত্যার কোন কারণ নেই। কিছুদিন পূর্বে ব্যাংকে চাকরি দেয়ার কথা বলে ১৩ লাখা নিয়েছে তার সাদিয়ার স্বামী। কিন্তু পরীক্ষা দেয়ার পরে চাকরি না হওয়ায় টাকা ফেরত চায় সাদিয়া। প্রথমাবস্থায় ৮ লাখ টাকা ফেরত দিলেও বাকি ৫ লাখ টাকা ফেরত দেননি। মুলত এ নিয়েই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝামেলা চলছিল।
তিনি বলেন, ‘হত্যাকান্ডের আগের দিন অর্থাৎ গত রোববার (৬ মার্চ) মাইনুল বাসায় এসেছিল। সাদিয়ার মেয়ে সাইমুন আমাদের জানিয়েছে, মাইনুল এসে ঝগড়া করে এবং সাদিয়াকে মারধর করে। তাছাড়া মাইনুল আমাদের ফোন করে জানায় সাদিয়া আত্মহত্যা করেছে। এমনকি আমার স্ত্রীকে নিয়ে আসার জন্য এক রিকশায় উঠেও মাঝপথে নেমে গিয়ে লাপাত্তা হয়ে যান মাইনুল।
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘মাইনুল যদি ওই সময়ে অফিসে থাকে তাহলে সে কিভাবে জানলো সাদিয়া বাসায় আত্মহত্যা করেছে? আমরা চাই ঘটনার সঠিক তদন্ত করা হোক। ঘটনার সাথে সাদিয়ার স্বামীর কোন সম্পৃক্ততা থাকলে তার সুষ্ঠু বিচার হোক।
নূরে আলম বেপারী বলেন, লাশ উদ্ধারের সময়ে কোতয়ালী থানার এসআই রেজা সাদিয়ার লেখা একটি ডায়রি, মোবাইল ফোন জব্দ করেছে। সেগুলোতে কি আছে তা আমরা দেখতে চেয়েছি, কিন্তু তিনি আমাদের কিছুই দেখায়নি।
নিহত সাদিয়ার পিতা সিরাজুল ইসলাম বলেন, সাদিয়া আত্মহত্যা করলে ওর ফ্লাটের দরজা ভিতর থেকে আটকানো থাকার কথা। কিন্তু পুলিশ এবং আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজা খোলা পেয়েছি। এটি যে পরিকল্পিত হত্যাকা- সেটা স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়। আমি চাই আমার মেয়ে হত্যার সঠিক বিচার। আমার মেয়ে আত্মহত্যা করেনি। যদি আত্মহত্যা করতো তাহলে তার সন্তানকে স্কুলে দিয়ে আসলো কেন?
তিনি বলেন, আমার ধারণা সাইমুনকে স্কুলে দিয়ে এসে বাসায় একা ছিল সাদিয়া। তখন তাকে নির্যাতন করে মারধর করে সিলিং ফ্যানের সাথে লাশ ঝুলিয়ে রেখেছে। তাছাড়া সাদিয়ার সাথে স্বর্ণালী নামে আরেকটি মেয়ে সাবলেট থাকতো। ঘটনার পর তাকেও খুঁজে পাচ্ছি না। পুলিশ চেষ্টা করলে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে রহস্য উদঘাটন করতে পারে।
অপরদিকে, লাশ উদ্ধারকারী উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) রেজাউল ইসলাম রেজা বলেন, সোমবার ঘটনাস্থলে গিয়ে জানতে পারি সাদিয়া সাথির স্বামী চাকরি করেন। কিন্তু কিসে চাকরি করেন তা জানতে পারিনি। তবে মঙ্গলবার সকালে জানতে পেরেছি মাইনুল ইসলাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কনস্টেবল।
এদিকে, সাদিয়ার বাবার করা লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এক বছর পূর্বে পরকীয়া প্রেমের সর্ম্পকের সূত্র ধরে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার উত্তর বাদুরী গ্রামের সোহরাব ফরাজীর ছেলে মাইনুল ইসলামের সাথে বিয়ে হয় সাদিয়া আক্তার সাথীর। ইতোপূর্বে সাদিয়া এবং মাইনুল উভয়েরই বিয়ে ছিলো। তারা দুজন দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এরপর থেকেই তারা বরিশালেই বাসা ভাড়া করে থাকতো। সাদিয়া সাথিকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা নিয়েছে মাইনুল। সেই টাকা ফেরত চাওয়ায় নির্যাতন করা হতো। এরআগে মাইনুলের নির্যাতনে কয়েকবার সাদিয়া সাথি অসুস্থ হয়ে পড়ে। তারই ধারাবাহিকতায় সোমবার নির্যাতন করে হত্যার পর লাশ সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে রেখেছে।
এ প্রসঙ্গে কোতয়ালী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আজিমুল করিম বলেন, ‘সাদিয়া আক্তার সাথীর পরিবার তাদের অভিযোগের কথা আমাদের জানিয়েছে। তবে আমরা আপাতত অপমৃত্যু মামলা গ্রহণ করেছি। তাদের অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি। যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় তাহলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উল্লেখ্য, গত সোমবার (৭ মার্চ) দুপুরে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের বৈদ্যপাড়া ডা. শাহজাহান হোসেনের মালিকানাধীন ভবনের পঞ্চম তলার একটি ফ্লাট থেকে থেকে বিসিএস পরীক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার সাথী নামের গৃহবধূর ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সাদিয়া সাথীর ৮ বছরের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। তবে এ সন্তানটি সাদিয়ার প্রথম ঘরের সন্তান বলে জানা গেছে।
এইচকেআর