পার্বত্য শান্তিচুক্তির অগ্রদূত আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ্

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট নির্মমভাবে জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে এ-দেশের রাজনীতিতে মুজিব পর্বেরঅবসান ঘটাতে মরিয়া ছিলেন ঘাতক খুনির দল। তাইতো বার বার ক্যু, মুক্তিযোদ্ধা খুন, সাধারণ মানুষ হত্যা ও ক্ষতবিক্ষত সাংবিধানিক পন্থায় স্বেচ্ছাচারি জেনারেল জিয়া এবং স্বৈরাচারি এরশাদের শাসনামল পেরিয়ে বিএনপি জামায়াত জোট সরকারের ২১ বছর পর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে আওয়ামী লীগ ফের রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পায়। সে বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পরেই পার্বত্য জেলায় দীর্ঘস্থায়ি সংঘাতের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান এবং দেশের বিধিবিধান ও আইন যথাযথ অনুসরণ করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে কয়েক দফা সংলাপের মাধ্যমেই সমঝোতাপূর্ণ পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক সেই শান্তিচুক্তিতে অসামান্য অবদান রেখেছিলেন দক্ষিণাঞ্চলের সিংহপুরুষ আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা বরিশালের আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ। তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন তিনি এবং বলা বাহুল্য যে, তাঁর মাধ্যমেই জননেত্রী শেখ হাসিনা পাহাড়ের চূড়োয় উড়িয়েছেন শান্তির পতাকা। কেননা, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে সেদিন তৎকালীন চিফ হুইপ আলহাজ্ব আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ ও শান্তিরক্ষী বাহিনীর পক্ষে তাদের শীর্ষ নেতা সন্তু লারমা ঐতিহাসিক এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এ চুক্তি স্বাক্ষরের সময় তৎকালীন এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও উপস্থিত ছিলেন। সন্তু লারমার বাহিনী তখন শেখ হাসিনার হাতেই অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিলেন এবং সেদিনের চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমেই তৎকালীন সশস্ত্র গ্রুপ শান্তি বাহিনীর দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের রক্তাক্ত সংগ্রামের অবসান ঘটেছিল। বলা যায়, কোনো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই এবং আন্তর্জাতিক কোনো বিদেশি শক্তিকে যুক্ত না করেই এ শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন হয়েছিল, যা বিশ্বের ইতিহাসেও এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিল। আজ সেই চুক্তি বাস্তবায়নের দুইযুগ পূর্তীর মাহেন্দ্রক্ষণ...!
বলা বাহুল্য যে, পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইল ফলক এবং চিরস্মরণীয় অধ্যায়। তাই, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তিতে অগ্রণী ভূমিকা রেখে দেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ। সেদিনের দ্বিপাক্ষিক শান্তি চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন আর কোন পিছিয়ে পড়া জনপদ নয়। দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় তারাও এখন সমান অংশীদার। যদিও পার্বত্যাঞ্চলে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস অনেকটাই ভয়ঙ্কর ও দীর্ঘকাল এখানে ক্ষমতার জন্য লড়াই, হিংসার প্রতি হিংসা ছিল। যুগের পর যুগ পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এবং বাঙালিদের মধ্যে এই সংঘাতময় পরিস্থিতির ভয়াবহতা ছিল মৃত্যুপুরীর অন্ধকার। স্বাধীন বাংলাদেশে উত্তপ্ত পাহাড়ি অঞ্চল নিয়ে উদ্বেগ, শঙ্কা, উৎকণ্ঠার শেষ ছিল না। রক্তক্ষয়ী সেই সংঘাতময় পরিস্থিতির পরিসমাপ্তি ঘটেছিল যে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে, সেই চুক্তি ও শান্তির অগ্রদূত হলেন আলহাজ্ব আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ।
বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক ঘনিষ্ঠজন তখনকার আওয়ামী লীগ নেতা ও পানিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের সন্তান আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ। রাজনৈতিক পরিবারের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে আজ তিনি দক্ষিণবাংলার রাজনৈতিক অভিভাবক ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতার সিংহপুরুষ খ্যাত। বরিশাল জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রধান ও পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পরিবীক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক (মন্ত্রী), জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য ভাগিনা তিনি। আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ১৯৪৪ সালের ১০ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা যাকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে হত্যা করা হয়। সেদিন তার মা এবং সহোদরকেও হত্যা করা হয়েছিল। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই। তার ছেলে সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ বর্তমানে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের জননন্দিত মেয়র।
আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ ১৯৭৩ সালে বরিশাল উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বরিশাল-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২৬ জুন ২০০০ সালে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। হাসানাত আব্দুল্লাহ ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ছিলেন। ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ২০১৪ সাধারণ নির্বাচনে হাসানাত আব্দুল্লাহ তৃতীয় বারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৮ জানুয়ারি ২০১৮ সালে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির আহবায়ক মনোনীত হয়ে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীর পদমর্যাদায় আসীন আজও।
আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ পার্বত্যাঞ্চলের শান্তিচুক্তির কারণে সর্বত্রই সম্মানিত এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় প্রশংসিত রাজনীতিবিদ। তিনি বরিশাল-১ (গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলা) আসনে বারবার নির্বাচিত জনপ্রিয় সংসদ সদস্য এবং পার্বত্য শান্তি চুক্তির রূপকার হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবেও সমাদৃত। তাই তো তিনি দেশবাসীর কাছে যুগ যুগ শান্তির অগ্রদূত হয়েই থাকবেন অনন্তকাল।
লেখক : কবি, দৈনিক মতবাদ এর যুগ্ম সম্পাদক।
এইচকেআর