বিক্রেতা ছাড়াই ২০ বছর ধরে চলছে দোকান

সমাজে যখন মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস কমে যাচ্ছে, আস্থাহীনতা বাড়ছে-এমন সময়ই এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত গড়ে উঠেছে পটুয়াখালীতে। কোনো দোকানদার ছাড়াই দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে পরিচালিত হচ্ছে একটি দোকান, যা বিস্মিত করছে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষদের। পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার হযরত ইয়ার উদ্দিন খলিফা (রহ.) এর দরবার শরীফে গেলেই দেখা মিলবে এই ব্যতিক্রমী দোকানটির।
শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দরবার শরীফের বৈঠকখানা ও দান গ্রহণ কেন্দ্রের পাশেই দোকানটির অবস্থান। দোকানটিতে নেই কোনো বিক্রেতা বা তদারককারী। ভেতরে সুন্দরভাবে সাজানো রয়েছে চাল, গুড়, আগরবাতি ও পবিত্র কুরআন শরীফসহ নানা ধরনের পণ্য। পাশে টাঙানো রয়েছে একটি মূল্য তালিকা।
ক্রেতারা নিজেরাই প্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী টাকা রেখে যাচ্ছেন পাশে রাখা একটি বাক্সে। দোকানের সামনে বড় করে লেখা—‘ইয়ার উদ্দিন খলিফা (র.) এর আদর্শে পরিচালিত দোকান’।
জানা যায়, মরহুম ইয়ার উদ্দিন খলিফা (র.) ছিলেন একজন ধর্মীয় সাধক, যাকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে নানা অলৌকিক ঘটনার কথা। জীবদ্দশায় তিনি মির্জাগঞ্জ, ছোট বিঘাই, বড় বিঘাই, কাকড়াবুনিয়া, সুবিদখালীসহ বিভিন্ন হাটে ঘুরে ব্যবসা করতেন। তিনি অধিকাংশ সময় কোরআন তিলাওয়াত ও জিকিরে মগ্ন থাকতেন। কেউ কিছু কিনতে এলে নিজেই পণ্য মেপে দিয়ে ইশারায় ক্রেতাকে চটের নিচে টাকা রেখে যেতে বলতেন। মানুষের সততা ও নৈতিকতার ওপর ছিল তার অগাধ বিশ্বাস। তার মৃত্যুর পর মির্জাগঞ্জে তাকে দাফন করা হয় এবং সেখানে গড়ে ওঠে দরবার শরীফ। তার আদর্শকে অনুসরণ করেই দরবারের পাশে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এই দোকানদারবিহীন দোকানটি। যা এখনও সেই বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
গলাচিপা উপজেলা থেকে দরবারে জুমার নামাজ আদায় করতে আসা শুভ বলেন, এমন দোকান বিস্ময়কর। এর আগে কোথাও এমন ধরনের দোকান দেখিনি। মানুষের প্রতি সমাজে যখন মানুষের বিশ্বাস নেই, তখন এমন দোকান দেখে আমরা মুগ্ধ। বিষয়টি খুবই ভালো লেগেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. জাকির হোসেন বলেন, খলিফা হুজুরেও এভাবে দোকানদারি করতেন। সেই নিয়মেই এই দোকানটি চলছে। এখান থেকে কেউ কখনও টাকা না দিয়ে নেয় না। সবাই মালামাল কিনে পাশের বাক্সে টাকা রেখে যায়।
আব্দুল খালেক নামে এক মানতকারী বলেন, এখান থেকে মানতের চাল ও গুড় কিনে বাক্সের মধ্যে টাকা রাখলাম। এমন দোকান আর কোথাও দেখিনি। এখানে আসলে মনে হয় যে মানুষের সততা ও নৈতিকতা এখনও বেঁচে আছে।
হযরত ইয়ার উদ্দিন খলিফা (র.) এর মাজার ওয়াকফ এস্টেটের সাধারণ সম্পাদক মো. সহিদুল ইসলাম ফয়সাল মল্লিক বলেন, ২০০৮ সাল থেকে মরহুম ইয়ার উদ্দিন খলিফা হুজুরের আদর্শে এই দোকানটি চলছে। তিনি মারা গেছেন প্রায় ১০০ বছর আগে। তবে তার আদর্শকে টিকিয়ে রাখতে এবং মানুষের মাঝে জানান দিতে গত ১৮ বছর ধরে দোকানদার ছাড়াই দোকানটি চলে আসছে।
বিশ্বাস, সততা ও নৈতিকতার এমন অনন্য উদাহরণ আজকের সমাজে বিরল। দোকানটি শুধু পণ্য কেনাবেচার স্থান নয়, বরং মানুষের প্রতি মানুষের আস্থার এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
এইচকেআর