ঢাকা শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

Motobad news
অপরিকল্পিত নগরায়ন, শব্দ ও পরিবেশ দূষণ, কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা

হারিয়ে যাচ্ছে বিবিপুকুর পাড়ের সৌন্দর্য পাখির অভয়স্থল

হারিয়ে যাচ্ছে বিবিপুকুর পাড়ের সৌন্দর্য পাখির অভয়স্থল
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

পাখিদের কিচিরমিচির কলরবে মুখর বরিশাল শহরের অন্যতম সৌন্দর্য পরিসর বিবিরপুকুরের পূর্বপাড়ের পাখির অভয়স্থল নানাভাবেই এখন হুমকির মুখে। এক সময় পরম নিরাপদ স্থান ভেবেই হয়তো শহরের কর্মব্যস্ত এলাকায় পাখিরা এই অভয়স্থল গড়ে তুলেছিল। কিন্তু শহর উন্নয়নের মহড়ায় পুকুরের চারপাশ ঘিরে গড়ে ওঠা বহু হাইরাইজ বিল্ডিং ও এর আলোকসজ্জায় ব্যবহৃত মেটাল হ্যালাইডের উজ্জ্বল আলো, দিনের অধিকাংশ সময়ই রাস্তার যানজটে বাজানো গাড়ির হাইড্রোলিক হর্ন ও যত্রতত্র মাইকের আওয়াজ, আতশবাজি উল্লাস, অতিরিক্ত বিষাক্ত ধোঁয়া সৃষ্টিকারী শব্দবাজি তা-বের ভয় ইত্যাদি কারণে এখানকার পাখিরাÑতাদের দীর্ঘদিনের নিরাপদ জায়গা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই বিবিরপুকুর পাড়ের বাংলাদেশ টেলি কমিউনিকেশনের দেয়াল ঘেরা অরণ্য শোভিত বিশাল অফিস চত্বরের গাছে গাছে শত শত পাখির আগমন ঘটে। আর তখনই শহরের অন্যতম ব্যস্ত গির্জামহল্লা এলাকা পাখির ডাকে মুখরিত হয়ে ওঠে। এখানের প্রতিটি গাছের ডালপালায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে থাকে সাদা ও হালকা খয়েরি পালকের অজস্র বক। আর তাতেই যেন বড় বড় গাছের সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে জীবন্ত বকফুল ফুটে থাকার অনন্য দৃশ্য তৈরি হয়। ডালে ডালে দেখা যায় পাখিদের বাসা, কোনো কোনো পাখি বাসায় ডিমে তা দিচ্ছে, আবার কোনো পাখির বাসাতে বাচ্চা ফুটেছে। সেইসব বাসায় পাখি মা-বাবার মুখ থেকে হাঁ করে খাবার খাচ্ছে ছানাগুলো। শুধু বক নয়, রঙের বৈচিত্র্য ফোটাতেই কি না, ছোপ ছোপ কিছু কালো পানকৌড়ির দেখাও মেলে উজ্জ্বল সাদা বকের ভিড়ে। প্রতিদিন বিকেল পড়লেই এই এলাকায় পাখিদের সুরেলা ধ্বনিতে মুগ্ধ হয়ে বহু পথচারী থমকে দাঁড়িয়ে দুদ- পাখিদের ওড়াউড়ি দেখে। পাখি দেখার আনন্দ উপভোগ করতে শিশু, বয়বৃদ্ধ, যুবক-যুবতী অনেকেই আসেন। সারা বছরই এখানকার পাখির সমারোহ থাকত বলে শহরের দূর-দূরান্ত থেকেও বহু পাখিপ্রেমী ও সৌখিন মানুষও বিবিরপুকুর পাড়ের পাখি সমারোহ দেখতে আসতেন। বরিশালে আসা বহু পর্যটকও শহরের একচিলতে অরণ্যে এতো পাখির সমাবেশ দেখে আশ্চর্য হতেন। সাধারণত সারাবছরই এখাকার বড় বড় মেহগনি, রেইনন্ট্রি, কাঁঠাল, আম এবং চাম্বল গাছের ঝোপঝাড়ের আশ্রয় পেতে ঝুঁট-শালিক, বুলবুলি, বসন্তবৌরি, দোয়েল, বেনেবৌ, কুটুরে পেঁচা, গো-শালিক, কোকিল, কাক, টিয়া, ঘুঘু, বক, চড়–ই, মুনিয়া, মাছরাঙাসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির পাখিরাই এখানে নিয়মিত আসত।
কিন্তু বিরূপ পরিবেশ সৃষ্টির কারণে, এখানকার হাজারো পাখি আগমনের অপরূপ সেই দৃশ্যপট তেমনটি আর নেই। শহরের মানুষের অপরিকল্পিত নগরায়ন, সিটিময় যত্রতত্র অধিক উজ্জ্বল স্ট্রিট লাইটিং এবং শব্দ দূষণের অত্যাচারে এখানকার পাখি আগমনের অভয়স্থল এবং সিটি মেয়রের অফিস সংলগ্ন পাখিদের কলকাকলীময় সুমধুর ডাক ক্রমশই হারিয়ে যাচ্ছে।

মূলত: এই অভয়স্থল সংলগ্ন উচ্চবিত্তদের বিয়ে, জন্মদিন উৎসবে উচ্চস্বরের ডিজিটাল সাউ- এবং রাজনৈতিক দলের আয়োজনে অনেক বেশি মাইকের ব্যবহার, বিভিন্ন দিবস ও বিশেষ দিনকে কেন্দ্র করে শহরের আকাশ জুড়ে দৃষ্টিনন্দন আতশবাজি বিস্ফোরণের ভয়াবহতাই এখানকার পাখি পালানোর মূল করণ। বিশেষজ্ঞ মতে জানা যায়, আতশবাজি বিস্ফোরণের ফলে সালফার ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন ভারী রাসায়নিক যৌগ পাখির দেহেই খুব বেশি পরিমাণে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং অধিক পরিমাণে বাজি পোড়ানোর জন্য চারপাশে যে বিষাক্ত ধোঁয়া উড়ে বেড়ায় তাতেও পাখির চোখের লিপিড লেয়ারে ‘ড্রাই আই’ সমস্যা ও চোখের স্থায়ী ক্ষতি সাধিত হয়।
সম্প্রতি বিবিরপুকুড় পাড়ের পাখিরা এমন সব নানাবিধ সমস্যায় একরকম নিরুপায় হয়েই দীর্ঘদিনের পরিচিত আশ্রয়স্থল ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। এমনকি শীতের পরিযায়ী পাখিরাও বিগত বছরগুলোর ন্যায় এখন আর খুব বেশি সংখ্যায় আসছে না।

পাখি আমাদের পরিবেশ ও প্রতিবেশের পরম বন্ধু। পাখির বৈচিত্র্যময় বর্ণ, সুরেলা কণ্ঠ, উড়ে চলার ভঙ্গিমা, বাসাবাঁধার শৈল্পিক নিপুণতা যে কোনও মানুষকেই মুগ্ধ করে। আমাদের দেশে পরিযায়ী পাখি প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৩০০। আবাসিক পাখি প্রজাতির সংখ্যা অন্তত ৩৫০। সব মিলিয়ে ৬৫০ প্রজাতির পাখি আমাদের চারপাশে বিচরণ করে। সাধারণত যে পাখি সারাবছর দেশে থাকে তাদের বলা হয় আবাসিক। আর যে পাখি বছরের কিছু সময় অন্য দেশ থাকে আমাদের দেশে আসে তাদের বলা হয় পরিযায়ী। পরিযায়ী পাখিদের অধিকাংশই শীত মৌসুমে এদেশে অতিথি হয়ে আসে। কিছু পরিযায়ী গ্রীষ্ম মৌসুমেও আসে। যদিও এদের সংখ্যা ১০/১২ প্রজাতির বেশী নয়। এছাড়াও কিছু পাখি আছে বছরের বিভিন্ন সময় বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরতে ঘুরতে এদেশে আসে এবং কিছুদিন থেকে চলে যায়। তাই, স্বল্পস্থায়ী এদের বলা হয় পান্থ-পরিযায়ী পাখি।

যদিও এখন সর্বত্রই আধুনিকায়নের ফলে বনাঞ্চলের মাত্রাতিরিক্ত পরিবেশ দূষণ, নির্বিচারে গাছকাটা, জমিতে ক্ষতিকারক কীটনাশকের ব্যবহার, পাখি শিকারিদের অত্যাচার, মোবাইল টাওয়ার থেকে ছড়ানো বিষাক্ত রেডিয়েশন, পাখির বিচরণক্ষেত্র ও খাদ্য সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অতিরিক্ত প্রভাবেও দোয়েল, কোকিল, ময়না, টিয়া, শালিক, বাবুই, চড়ুইসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতি পাখির বিচরণ দৃশ্যপট হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে আজকাল দূরবীণ ব্যবহার করেও গ্রাম-গঞ্জের মাঠে-ঘাটে, বনে-জঙ্গলে রং-বেরঙের দেশীয় নানা ধরনের পাখি দেখা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। কালের আবর্তে সচরাচর আমাদের চিরচেনা সেইসব পাখিও এখন আর গ্রামীণ অরণ্য, হাওড়, দীঘি, পুকুরের জলে সাঁতার কাটতে দেখা যায় না। বলা যায়, এসব কারণেও পাখি কলরবে মুখর বিবিরপুকুর পাড়ের পাখি অভয়ারণ্য প্রতিনিয়ত পাখি শূন্য হতে চলছে।

বিবিরপুকুর পাড়ের পাখিদের সম্পর্কে খোঁজ নিতে গিয়ে, এখানকার দোকানদার মো. হানিফ ও মনিরের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ‘প্রতিদিন আছরের আযানের সময় থেকেই এখানে পাখি আসতে থাকে। টেলিফোন অফিসের গাছের ডালে, ঝোপঝাড়ে বসা শত শত পাখির ডাক শুনতে, ওড়াউড়ি দেখতে আমাদের ভাল লাগে। প্রায় সারাবছরই এখানে পাখি থাকে। সকাল-বিকাল পাখির ডাকে সরব থাকত এই এলাকা, আজকাল পাখি অনেক কমে গেছে।’

সাধারণত: প্রজননের মৌসুম থাকায় এখানকার গাছের ঝোপঝাড়ে পাখির বাসা চোখে পড়ে বেশি। সাধারণত বর্ষা মৌসুমেই দেশী পাখির আনাগোনা খুব বেশি থাকে। প্রতিদিন এখানে আসা হাজার হাজার পাখির বিষ্ঠায় প্রতিটি গাছের নিচের সবুজ ঘাস, কচুবন সাদা হয়ে আছে। আশ-পাশের বাড়ির ছাদ, রাস্তার পাশের দোকানের সমস্ত পলিথিনচাল ও সামিয়ানা পাখি-বিষ্ঠায় সয়লাব। বিষ্ঠার আধিক্যে এই চত্বরের অনেক ছোট-মাঝারি বৃক্ষ ও বহুবুনোফুল গাছও মরে গেছে। চারদিকে বিষ্ঠার গন্ধ। তবুও, এখানকার পাখিরা আশে-পাশের বাসিন্দাদের বাড়ির অংশ হয়ে উঠেছে।

তেমনি এই এলাকার এক গৃহিণী মোসাম্মৎ বিউটি বেগম বললেন, ‘পাখিরা এখানে নিরাপদে আছে। পাখি-বিষ্ঠায় গন্ধ হলেও দিনরাত পাখিরা কিচিরমিচির করে। পাখির ডাকে মুখর থাকে, এক সঙ্গে অনেক পাখির মেলা দেখে আমরা পাখিদের সব অত্যাচার সয়ে নিয়েছি। আমাদের ভালো লাগে।’

এ বিষয়ে বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর মতিয়ার রহমান বলেন, ‘স্বাধীনতা পরবর্তী প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানের আদেশক্রমে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আইন তৈরি হয়েছে, তাতে পাখির অভয়ারণ্য, শিকার, ভীতি প্রদর্শন ইত্যাদি কখনোই করা যাবে না। এই আইনভঙ্গকারীর জন্য জরিমানা ও শাস্তির বিধান রয়েছে।’

ডেইলি স্টার ও দেশ টিভি’র সাংবাদিক ও গবেষক সুশান্ত ঘোষ বললেন, ‘বনাঞ্চলে নির্বিচারে পাখি শিকার হয়। বন উজাড় করে গাছ কাটার ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এতে পাখির বিচরণক্ষেত্র কমে যাচ্ছে। এখনি পরিবেশ রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ না নিলে, পাখি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।’

আমরা, মানুষ যেমন প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ জীব, প্রকৃতিও আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের নিয়ন্ত্রক। আর সুন্দর এই প্রকৃতি ও পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ বন্যপ্রাণী। ফলে, প্রকৃতির এই অমূল্য সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই। তাই, কেনো না কোনোভাবে মানুষের অস্তিত্বের জন্যই বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করা জরুরি।##

 

 

 


এমবি
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন