ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

Motobad news
শিরোনাম
  • ভিডিও বিতর্কের জেরে জামায়াতে এমপি নজরুলের বিরুদ্ধে শ্যামনগরে বিক্ষোভ আরও ৫ দিন বৃষ্টির আভাস, উপকূলে অতিভারী বর্ষণের শঙ্কা কাঁচামরিচের কেজি ২৫০ টাকা ছাড়ালো বাবুগঞ্জে মহাসড়কের পাশ থেকে নারীর মরদেহ উদ্ধার টানা বর্ষণে তছনছ দখিনের কৃষি ও মৎস্য খাত, ক্ষতি ৩৮ কোটি টাকা  দ্বিতীয় স্ত্রী নাকি চাকরির সুপারিশ, ভাইরাল ভিডিও নিয়ে প্রশ্ন ছুড়লেন ডাকসু নেত্রী মোদির বাসভবনের সামনে থেকে রাহুল, প্রিয়াঙ্কা ও অখিলেশ আটক পেশাজীবী দলের কেন্দ্রীয় নিবার্হী কমিটির সহ সভাপতি হলেন মিজানুর রহমান অহিদ  গৌরনদীতে মাদ্রাসার কক্ষে ছাত্রীর ঝুলন্ত লাশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগে ডিসিদের ক্ষমতা বাতিল, ফিরলো আগের নিয়ম
  • ৫ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত, পাঁচ জনের মৃত্যু, আহত ২৫ কৃষক 

    টানা বর্ষণে তছনছ দখিনের কৃষি ও মৎস্য খাত, ক্ষতি ৩৮ কোটি টাকা 

    টানা বর্ষণে তছনছ দখিনের কৃষি ও মৎস্য খাত, ক্ষতি ৩৮ কোটি টাকা 
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    বরিশালে গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণে কৃষিজমি ও মৎস্য খাতে ব্যাপক বিপর্যয় নেমে এসেছে। প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব অনুযায়ী, বিভাগের ৬ জেলায় কৃষি ও মৎস্য সেক্টরে মোট ক্ষতির পরিমাণ ৩৮ কোটি টাকার ঘর ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে শুধু কৃষিপণ্যের ক্ষতির পরিমাণ ১৮ কোটি টাকারও বেশি বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। 

    বিভাগীয় মৎস্য কর্মকর্তা কার্যালয়ের প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে বিভাগের বরিশাল ও ঝালকাঠি ছাড়া ৪ জেলায়  মৎস্য খাতে ২০ কোটি ৩০ লাখ ২৪ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর ভিতরে ১৪৪টি ইউনিয়নে ৬ হাজার ৪৬৯ মাছের পুকুর ও খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৪৫৫ হেক্টর পুকুর, ঘের ও জলাশয় প্লাবিত হয়ে ৭৪৭ টন মাছ এবং ৯৩ লাখ মাছের পোনা ভেসে গেছে। এছাড়া ৪৫ মেট্রিক টন চিংড়ি মাছ, পিএল ৭ লাখ টাকার মাছও ভেসে গেছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য বিভাগ।  

    তারা জানান, এসব পুকুর ও ঘেরে চাষকৃত রুই, কাতল, মৃগেল, মাগুর, কইসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বেরিয়ে গেছে। অনেক চাষী বৃষ্টির মধ্যে ঘেরের চারপাশে নেট দিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বৃষ্টির পরিমাণ এতো বেশি ছিলো যে অনেকেই নেট দিয়েও রক্ষা করতে পারেন নি। আবার অনেক ঘেরের আয়তন অনেক বেশি। যার কারণে ৩২৮টির মতো ঘের ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। 

    এদিকে অবিরাম বর্ষণে বিভাগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিম্নাঞ্চল এবং নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলো।  পাকা ধান, শাকসবজি, রোপা আমন বীজতলা এবং উদ্যান ফসল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকার নিচু জমিতে পানি জমে যাওয়ায় সদ্য রোপণ করা চারা পচে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। মাঠের পর মাঠ সবজি খেত পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। 

    কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৯ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিপাত ও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বরিশাল অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ৪১ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ২৯ হাজার ৯১৯ মেট্রিক টন ফসল নষ্ট হয়েছে। যার আনুমানিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১৭ কোটি ৮৮ লাখ ২৯ হাজার ৯০০ টাকা। তবে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

    সবচেয়ে বেশি ফসল আক্রান্ত হয়েছে বরগুনা জেলায়, যেখানে ৬ হাজার ৭০৯ হেক্টর জমির ফসল পানিতে ডুবে গেছে। অন্যদিকে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি পিরোজপুরে, প্রায় ১ হাজার ৪৬৫ হেক্টর। এছাড়া সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে ২৫৭ হেক্টর জমির ফসল, যা পুরো অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ। আর আর্থিক ক্ষতির দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভোলা জেলা।

    জেলাভিত্তিক হিসাব বলছে, পিরোজপুরে প্রায় ২৩ হাজার ৯২৫ মেট্রিক টন আমন বীজতলা এবং ১ হাজার ৬৮০ মেট্রিক টন গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি নষ্ট হয়েছে। ঝালকাঠিতে ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ৬৪৩ মেট্রিক টন, পটুয়াখালীতে ২৪৪ মেট্রিক টন, বরগুনায় ৪৯৮ মেট্রিক টন এবং ভোলায় ১ হাজার ৯৬০ মেট্রিক টন ফসলের। সব মিলিয়ে বরিশাল অঞ্চলে প্রায় ২৯ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

    অর্থনৈতিক ক্ষতির চিত্রও উদ্বেগজনক। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে ভোলায় প্রায় ৯ কোটি টাকা, পিরোজপুরে ৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, ঝালকাঠিতে ২ কোটি ৪৫ লাখ ৪ হাজার টাকা, পটুয়াখালীতে ১ কোটি ৩ লাখ ১৫ হাজার ৯০০ টাকা এবং বরগুনায় ৮৪ লাখ ১০ হাজার টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

    কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি পিরোজপুরে, যেখানে ২৫ হাজার ৮০০ জন কৃষক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। এছাড়া পটুয়াখালীতে ৮ হাজার ৭৭০ জন, ভোলায় ৩ হাজার ৮০০ জন, ঝালকাঠিতে ১ হাজার ৭১৫ জন এবং বরগুনায় ১ হাজার ১২৫ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
    এদিকে ক্ষেতের ফসল ডুবে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা। অনেকের স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। অধিকাংশ দরিদ্র চাষীরা ধার দেনা ও ঋণগ্রস্থ হয়ে চাষাবাদ করে থাকে।

    বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের কৃষক রফিক মিয়া বলেন, টানা বৃষ্টি আর জোয়ারের পানিতে সব শেষ হয়ে গেছে। যে আশা নিয়ে চাষ করেছিলাম, তা এখন পানিতে ভেসে গেছে।

    বরিশাল সদর উপজেলার চাঁদপুরা ইউনিয়নের কৃষক রিয়াজ বলেন, ধান কাটার সময়ের আগেই ক্ষেত ডুবে গেছে। এখন আধাপাকা ধান কাটতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন অনেক কমে যাবে।

    নবগ্রাম ইউনিয়নের কৃষক ইউসুফ মোল্লা বলেন, টানা বৃষ্টিতে  বোরো ধান একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। নুয়ে পড়া ধান পরিপক্ক হওয়ার আগেই কাটতে হচ্ছে, এতে বড় ধরনের লোকসান গুণতে হবে।

    ভোলার রাজাপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সিরাজ মিয়া জানান, তাদের এলাকার অনেক জমির ফসল পানির নিচে রয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে ঘের কাটার কারণে পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না। যার কারণে কৃষকরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

    একই গ্রামের শাহজালাল শেখ বলেন, ঘেরের পাশের সিমগাছ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এই এলাকার শসা ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া টমেটোসহ সবজির ক্ষতি হয়েছে।

    এদিকে কলাপাড়া উপজেলার সোনাতলা গ্রামের রহিম উদ্দিন বলেন, আশেপাশের এলাকার অনেক ঘের পানিতে ভেসে গেছে। যার কারণে এসব মৎস্য চাষীদের স্বপ্ন পানিতে ভেসে গেছে। 

    একই উপজেলার হাজীপুর গ্রামের স্থানীয় পাভেল বলেন, তিনিসহ এলাকার অনেকই বিভিন্ন জাতের মাছের ঘের করেছিলেন।  কিন্তু টানা বৃষ্টিতে তাদের ঘের তলিয়ে মাছ সব বের হয়ে গেছে। 

    তিনি  বলেন, ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা তৈরি করে ক্ষতিপুরণ দেয়ার ব্যবস্থা করলে চাষীরা পুনরায় ঘুরে দাড়াতে পারবে।

    বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, অতি বৃষ্টি ও জোয়ারের পানির কারণে বিভাগে বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা ও সহায়তা দেয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। 

    বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক (অ.দা.)  মো. কামরুল হাসান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য খাতের প্রাথমিক ক্ষতির তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
     


    এইচকেআর
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ