দুদকের মামলায় রেকর্ড, ইউনূস সরকারের দেড় বছরে প্রায় এক হাজার মামলা

২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কার্যক্রমে নজিরবিহীন গতি এসেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে সংস্থাটি প্রায় এক হাজার মামলা করেছে, যা দুদকের গত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
দুদকের কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ৯৮০টি মামলা করা হয়েছে। এ হিসাবে সরকারি ছুটির দিন বাদে প্রতিদিন গড়ে দুইটির বেশি মামলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা অভিযোগগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ায় মামলার সংখ্যা বেড়েছে।
দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কমিশনের কার্যক্রমে গতি এসেছে। আগে যেসব অভিযোগ নানা কারণে আটকে ছিল, সেগুলো এখন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলায় রূপ দেওয়া হচ্ছে।
একাধিক কর্মকর্তা জানান, দায়ের করা মামলাগুলোর বড় অংশই আগের সরকারের সময় জমা পড়া অভিযোগ থেকে এসেছে। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বের কারণে এসব অভিযোগ দীর্ঘদিন তদন্তের বাইরে ছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই বাধা অনেকটাই কমে যাওয়ায় পুরোনো ফাইলগুলোতে দ্রুত অগ্রগতি হচ্ছে।
সূত্রটি আরও জানায়, সাম্প্রতিক মামলাগুলোর মধ্যে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, ব্যাংক খাতের দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, টেন্ডার কারসাজি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগই বেশি। এসব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, উচ্চপদস্থ আমলা ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুদক অনেকটা ভয়ডরহীনভাবে কাজ করেছে। আগের সরকারের সময় জমে থাকা অভিযোগ নিয়ে কাজ করেছে। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগপত্র দিয়েছে।
এ বিষয়ে দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল ও প্রসিকিউশন) মঈদুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবের মধ্যে থাকে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সেই বাস্তবতায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে, যার সুফল দুদকের কার্যক্রমে দেখা গেছে।
তার ভাষ্যে, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে কমিশন তুলনামূলক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পেরেছে। ফলে দীর্ঘদিনের স্থগিত অভিযোগগুলোতেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে এই তৎপরতা ধরে রাখতে হলে শুধু মামলা দায়ের নয়, কার্যকর তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় সফলতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দুদকের এই সক্রিয়তা দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত বার্তা দিলেও এর টেকসই প্রভাব নির্ভর করবে মামলাগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত, বিচার এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার ওপর। এ জন্য সংস্থাটির প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত এক বছরে বেড়ে যায় দুদকের মামলার সংখ্যা। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত সময়ে সংস্থাটি ৪৫২টি দুর্নীতি মামলা করেছে। যেখানে আসামি করা হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দুইশর বেশি হেভিওয়েট ব্যক্তিকে। এসব মামলায় মোট আসামির সংখ্যা এক হাজার ৭৪৩ জন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও তার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদসহ দুই শতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে। আসামিদের মধ্যে আরও রয়েছেন- সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিব, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত সামরিক কর্মকর্তারা।
দুদক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত কমিশন ৮৪৫টি অভিযোগ অনুসন্ধান করে। অনুসন্ধানের ভিত্তিতে ৪৫২টি মামলার পাশাপাশি ৩৪৮টি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করে। এসব অভিযোগপত্রে আসামির সংখ্যা এক হাজার ৪৪৩ জন। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে মামলা ও অনুসন্ধানের রেকর্ড হলেও দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের খুব বেশি হেরফের হয়নি।
গত ফেব্রুয়ারিতে বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) প্রকাশিত দুর্নীতির ধারণা সূচক বা করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স (সিপিআই) ২০২৫ প্রকাশ করে।
তাতে দেখা যায়, ২০২৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৩ তম। ২০২৪ সালে এই অবস্থান ছিল ১৪তম। ১৮২টি দেশের মধ্যে ১০০-এর স্কেলে বাংলাদেশের স্কোর ২৪, যা বৈশ্বিক গড় স্কোরের (৪২) চেয়ে অনেক নিচে। অবশ্য গত বছরের চেয়ে এবার বাংলাদেশের ১ পয়েন্ট উন্নতি হয়েছে। তবে সামগ্রিক র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়েছে এক ধাপ।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কর্তৃত্ববাদ পতনের পরও বাস্তবিক অর্থে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রীয় ও আইনি কাঠামোর প্রত্যাশিত পরিবর্তন হয়নি। বরং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক ও অন্যান্যভাবে ক্ষমতাবান নানা শক্তির প্রভাবের পাশাপাশি দুর্নীতি দমনে দায়িত্বপ্রাপ্ত দুদকসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রস্তাবিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো অবহেলিত হওয়া অথবা বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারাও তাদের প্রকৃত ভূমিকা পালন করতেও ব্যর্থ হয়েছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি। দলটি সরকার গঠনের দুই সপ্তাহ পরই গত ৩ মার্চ দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন, কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহ্সান ফরিদ পদত্যাগ করেন। ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি দুদকের চেয়ারম্যান ও এ দুজন কমিশনারকে নিয়োগ দেন।
নতুন কমিশন গঠনের জন্য এখনো বাছাই কমিটি (সার্চ কমিটি) গঠন করা হয়নি।
দুদক সূত্র জানায়, কমিশন না থাকায় অভিযোগ অনুসন্ধানের অনুমোদন, নতুন মামলা করা, চার্জশিট অনুমোদন, সম্পত্তি ক্রোক এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। এতে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
এইচকেআর