ঢাকা শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারী ২০২৬

Motobad news
সবচেয়ে বেশি হত্যার ঘটনা ঘটেছে বরিশাল জেলায়

বরিশাল বিভাগে বছরজুড়ে ৪৬ খুন, ৩৮ মরদেহ উদ্ধার 

বরিশাল বিভাগে বছরজুড়ে ৪৬ খুন, ৩৮ মরদেহ উদ্ধার 
ছবি: প্রতীকী
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

ক্ষমতার পালাবদল হলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। প্রতিনিয়তো ঘটছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটছে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। এমন পরিস্থিতিতে বছরজুড়ে খুন-খারাবি ও অরাজক পরিস্থিতির দীর্ঘশ্বাস নিয়েই ২০২৫ সালকে বিদায় জানিয়েছে বরিশালবাসী। 

বিদায়ী বছরে বরিশাল বিভাগে ৪৬টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক দন্ধ পূর্ববিরোধ, জমি সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক কলহসহ নানা কারণে এ হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে  সবচেয়ে বেশি বরিশাল জেলায় ১২টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ভোলায় ১১, পটুয়াখালী ১০, পিরোজপুরে ৯ এবং বরগুনা জেলায় ১টি খুন হয়েছে।  একের পর এক নৃশংস ঘটনায় সাধারণ মানুষের মনে এখন কেবলই ভয় আর আতঙ্ক। 

অপরদিকে, নদী-খাল ও ডোবাসহ বিভিন্ন জলাশয় থেকে বছরজুড়ে লাশ উদ্ধারের অনেক ঘটনা ঘটেছে। এক হিসেবে অজ্ঞাত, পুকুরে ডুবে শিশু মৃত্যুসহ বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় ৩৮টি মরদেহ উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। 

গত বছর (২০২৫ সাল) গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। 

এদিকে অপরাধ করেও সহজেই পার পেয়ে যাওয়া, কিশোর অপরাধ, মাদক, সামাজিক অবক্ষয় ও বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতার কারণেই এসব খুন-খারাবি বেড়েই চলেছে বলে মত দিয়েছেন নাগরিক নেতারা।

সূত্রে জানা যায়, মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় ‘কিশোর গ্যাং’ অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। ছোট ছোট গ্রুপে মাদক সেবন, চাঁদাবাজিসহ খুনের মতো অপরাধে যুক্ত হচ্ছে নগরীর উঠতি কিশোর-যুবকরা।

তাদের সহিংস আচরণের কারণে ভয়ে এলাকায় কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। একাধিকবার এসব কিশোরের তালিকা করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে দুই-একটি গ্রুপ ছাড়া বাকিরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেক লাইসেন্স করা অস্ত্র-গুলি লুট হয়েছে। অস্ত্রগুলো পেশাদার অপরাধীদের হাতে চলে গেছে। এছাড়া অনেক সন্ত্রাসী ৫ আগস্টের পর জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে।

আলোচিত হত্যাকাণ্ড
গত ৩০ ডিসেম্বর বিকেলে ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার আওরাবুনিয়া গ্রামে ১৭০ টাকা হারানোর জেরে ভাতিজি লামিয়া আক্তারকে (১৪) শাবল দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। 

৩০ ডিসেম্বর দিবাগত রাত আনুমানিক ১১টার দিকে লালমোহন উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের ২নম্বর ওয়ার্ডের কচুখালী গ্রামে আবু বকর ছিদ্দিক (৫১) নামে এক ব্যাটারিচালিত রিকশাচালককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। 

৯ এপ্রিল নগরীর কলেজ রোড এলাকায় প্রেমিকা শান্তার ছুরিকাঘাতে মাসুদুর রহমান (৪৫) নামে এক ব্যবসায়ী নিহত হন। তিনি নতুন বাজার টেম্পুস্ট্যান্ড এলাকার হাবিবুর রহমানের ছেলে।

১৯ জুন সকালে উজিরপুর উপজেলার পৌর সদরের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ভিআইপি রোডের একটি বসতবাড়িতে আলেয়া বেগম (৬০) নামের এক বিধবা নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। তিনি  ওই এলাকার মৃত নূরে আলম তালুকদারের স্ত্রী।

২ মার্চ রাত সাড়ে ৮টার দিকে নগরীর ৭ নম্বর কাউনিয়া ওয়ার্ডের শেরে বাংলা নগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পেছনে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে যুবদল নেতা সুরুজ গাজী (৩৫) কে হত্যা করে প্রতিপক্ষরা। পরে বিক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্তর ঘরে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়। নিহত মো. সুরুজ গাজী কাউনিয়া হাউজিং এলাকার কাঞ্চন গাজীর ছেলে। 

১৫ মার্চ সন্ধ্যায় নগরীর ধান গবেষণা রোডে স্থানীয়রা শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে সুজন (২৪) নামের এক যুবককে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করে। সুজন নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ড ধান গবেষণা জিয়ানগর এলাকার মো. মনিরের ছেলে।

২৭ জুলাই দুপুরে উজিরপুর উপজেলার বরাকোঠা ইউনিয়নের খাটিয়ালপাড়া গ্রামে মাদকাসক্ত ছেলের ছুরিকাঘাতে শাহ আলম খান (৬২) নামে এক বৃদ্ধ নিহত হয়।  শাহ আলম ওই গ্রামের মৃত আব্দুর রহমান খানের ছেলে।

৩১ জুলাই রাত দেড়টার দিকে বাউফল উপজেলার নুরাইনপুর এলাকায় সালমা আক্তার (৩২) নামের নারী শিক্ষককে গলা কেটে হত্যা করে স্বামী। সালমা আক্তার ভান্ডারিয়া উপজেলার ধাওয়া গ্রামের মৃত রুস্তম আলীর মেয়ে। 

২৯ আগস্ট ভোলা পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মসজিদ ই নববী সংলগ্ন এলাকার মো. বশির মাস্টারের ছেলে সাইফুল্লাহ আরিফ (২৮) নামের এক ছাত্রলীগ নেতাকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। 

১৭ নভেম্বর বাবুগঞ্জ উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের আগরপুর স্টিল ব্রিজ এলাকায় শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় মিষ্টি বিতরণ নিয়ে সংঘর্ষে ছাত্রদল নেতা রবিউল ইসলামকে প্রতিপক্ষরা কুপিয়ে হত্যা করে। 

৩১ জুলাই বরিশাল মহানগর স্বেচ্ছাসেবকদলের সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. লিটন সিকদার লিটুকে প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। 

২৭ জুন দিনগত রাত ১২টার দিকে  পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার চন্ডিপুর ইউনিয়নের চরবলেশ্বর এলাকায় ২ নম্বর ওয়ার্ডে পরকীয়াকে কেন্দ্র করে ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম হাওলাদার (৫০) ও তার ভাবি মৌকলি বেগম (৪৮) কে হত্যা করা হয়। 

১৩ ফেব্রুয়ারি ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের চাপড়ি এলাকায় গরুচুরির অভিযোগে নয়ন (২৬) ও আমির হোসেন (২৭) গণপিটুনিতে নিহত হয়। 

১৯ মার্চ ভোলার মনপুরা উপজেলার দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের নুরউদ্দিন মার্কেট সংলগ্ন বেড়িবাঁধে জিও ব্যাগের কাজ করাকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে মো. রাশেদ (২৮) নামে এক ছাত্রদল নেতা নিহত হয়।

২ এপ্রিল ভোলায় জমি-জমার বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে মো. জামাল হাওলাদার নামে এক বিএনপি নেতা নিহত হন। 

এদিকে একই বছরে বিভাগের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার নদী-খাল ও ডোবাসহ বিভিন্ন জলাশয় থেকে ৩৮টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর ভিতরে পানিতে ডুবে মারা যায় ১২জন শিশু। তবে পচে-গলে যাওয়ার কারণে যার এক তৃতীয়াংশের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

এসব অপরাধের ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত স্থানীয় বাসিন্দারা। নগরীর কাউনিয়া এলাকার বাসিন্দা চপল মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, কীভাবে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটছে! আমাদেরও তো মেরে ফেলতে পারে?

শুধু চপল মিয়াই নয়, নগরের কাশিপুর, কালিজিরা, বটতলা, মহাবাজ, আমানগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দারা নিরাপত্তার হীনতায় রয়েছেন বলে প্রতিবেদকদের কাছে অভিযোগ করেছেন। 

ব্যবসায়ীরাও রয়েছেন চরম উৎকণ্ঠায় নগরীসহ অধিকাংশ উপজেলায় চুরি, ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দোকানগুলোর নিরাপত্তার জন্য আগে নিয়মিত পুলিশ টহল থাকলেও এখন আর প্রশাসনের কোনো দেখা পাওয়া যায় না। 

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বরিশাল নগর সম্পাদক মো. রফিকুল আলম বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সরকারের উদাসীহনতার কারণে আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি এমন নাজুক দশা হয়েছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। গত বছর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল না। কারণ পুলিশ এখনও সরাসরি অপরাধ নিমূলে কাজ করতে সাহষ পাচ্ছে না। মব সৃষ্টি করে এখনও পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। 

বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটি সনাক সভাপতি অধ্যক্ষ (অবঃ) গাজী জাহিদ হোসেন বলেন, বিদায়ী বছরে মহানগর থেকে জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম, প্রতিটি জায়গায় খুনের ঘটনা ঘটেছে। এটা আগেও চলমান ছিল, এখনও থেমে নেই। তবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা দায়ের ও কিছু কিছু ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য জেলার চেয়ে বরিশালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলনামূলক ভাবে স্বাভাবিক ছিল।  

আইনশৃঙ্খলার অবনতির কথা অস্বীকার করে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজ মো. মঞ্জুর মোর্শেদ আলম বলেন, রাত্রিকালীন টহল কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা  রক্ষায় শিগরই  যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরু করা হবে। 

হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ডিআইজি দাবি করেন, অধিকাংশ ঘটনায় আসামিদের ধরতে তারা সফল হয়েছেন। কোনো অপরাধীই আইনের ফাঁক দিয়ে পার পাবে না বলে তিনি জনগণকে আশ্বস্ত করেন।


 


এইচকেআর
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন