শেবাচিমে র্যাগিংয়ের শিকার দুই ছাত্রীর ঘটনা আড়াল করতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে (শেবামেক) দুই ছাত্রীকে র্যাগিংয়ের অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগ নেত্রীদের বিরুদ্ধে। এর নেপথ্যে ছিলেন মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক দুই নেতা। এ ঘটনার নেতৃত্ব দেয়া দুই ছাত্রীকে মদদ দেন তারা। যারা বর্তমানে শেবাচিম হাসপাতালে শিক্ষানবিশ চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত।
আর এ কারণেই র্যাগিংয়ের ঘটনা আড়াল করতে ঘটে সংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা। এমনকি সাংবাদিকদের ওপর হামলার সময় অভিযুক্ত ইন্টার্ন ডাক্তার আতিক এবং আজিম দুইজনেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
এদের দুজনকেই সাংবাদিকদের প্রকাশ্যে ধাক্কা দিয়ে অধ্যক্ষের কক্ষ থেকে বের করে দেন। তাছাড়া সাবেক দুই ছাত্রলীগ নেতার ইন্ধনেই নির্যাতনের শিকার ছাত্রী ও তার মাকে মানসিক রোগী হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন কলেজ অধ্যক্ষ।
অভিযুক্ত দুই ছাত্রলীগ নেত্রী হলেন- মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগ নেত্রী ও ছাত্রী হোস্টেলের সেক্রেটারি ফাহমিদা রওশন প্রভা, সহকারী হোস্টেল সেক্রেটারি নীলিমা হোসেন জুঁই। দুই ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মধ্যে রয়েছেন-সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আজিম হোসেন ও আতিক। এরা সম্পর্কে পরস্পর স্বামী-স্ত্রী বলে জানা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী মেডিকের কলেজের একাধিক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, ‘গত বৃহস্পতিবার শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের ছাত্রী হোস্টেলে ৫২ তম ব্যাচের ছাত্রী নুজহাত খান ও সামিয়া সুলতানাকে র্যাগিং করেন ডেন্টাল ৭ম ব্যাচের ছাত্রী ও হোস্টেল সেক্রেটারি ফাহমিদা রওশন প্রভা এবং ৫০তম ব্যাচের ছাত্রী ও সহকারী হোস্টেল সেক্রেটারি নীলিমা হোসেন জুঁইসহ তাদের সহযোগিরা।
সূত্রটি জানিয়েছে গত বৃহস্পতিবার জুনিয়র ব্যাচের দুই ছাত্রীকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে ব্যাপক নির্যাতন করে অভিযুক্ত ছাত্রীরা। এ ঘটনার শিকার নুজহাত খান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এছাড়া অপর ছাত্রী সামিয়া সুলতানা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
এ ঘটনায় বিচার চাইতে শনিবার সকালে ওই ছাত্রী ও তার মা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ফয়জুল বাসারের কাছে যান। খবর পেয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য মেডিকেল কলেজ অধ্যক্ষের কার্যালয়ে যান বরিশালের সাংবাদিকরা। তারা কলেজ অধ্যক্ষের কার্যালয়ের পাশের কক্ষে ভুক্তভোগী ছাত্রী ও তার মায়ের সঙ্গে ঘটনার বর্ণনা জানতে চান। এর কিছুক্ষণ পর আকস্মিক ভাবে অধ্যক্ষ ডা. ফায়জুল বাশারের কক্ষ থেকে বের হয়ে ডা. পবিত্র, ডা. মাসুম বিল্লাহ এবং ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. আতিক ও আজিম হোসেনসহ তাদের সহযোগিরা সাংবাদিকদের ওপর হামলা করেন।
এদিকে মেডিকেল কলেজের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ‘র্যাগিংয়ের শিকার ছাত্রী ও তার মা অধ্যক্ষের কাছে অভিযোগ দিতে যাওয়ার খবর পেয়ে সেখানে হাজির হন মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা, ইন্টার্ন চিকিৎসক আজিম হোসেন ও ডা. আতিক।
শুরু থেকেই তারা র্যাগিংয়ের ঘটনায় যাতে কোন বিচার না হয়, সেজন্য অধ্যক্ষকে চাপ সৃষ্টি করেন। এমনকি অভিযোগকারী শিক্ষার্থীকে মানসিক রোগী বানিয়ে ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রভাবিত করার পরিকল্পনা করেন। তাদের এ বিষয়ে সহযোগিতা করেন শিক্ষক ডা. পবিত্র ও ডা. মাসুম বিল্লাহ।
তবে খবর পেয়ে সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ায় ডা. পবিত্র, ডা. মাসুম বিল্লাহ, ডা. আতিক ও ডা. আজিম হোসেন সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন। এসময় তারা চর-থাপ্পর, চেয়ার দিয়ে ক্যামেরা ও ট্রাইপড ভাঙচুর করে। এক পর্যায়ে ধাক্কিয়ে অধ্যক্ষের কার্যালয় থেকে বের করে দেয়া হয় তাদের।
শুধু তাই নয়, র্যাগিংয়ের প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে র্যাগিংয়ের শিকার ছাত্রীকে অধ্যক্ষের কক্ষে ঘণ্টাব্যাপী আটকে রাখা হয়। পরে পুলিশ গিয়ে শিক্ষার্থী ও তার মাকে উদ্ধার করে।
যদিও এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন মেডিকেল কলেজ অধ্যক্ষ ডা. ফয়জুল বাশার। তার দাবি, ‘রাতে ঘুমানো নিয়ে দুই ছাত্রীর মধ্যে সামান্য ঝামেলা হয়েছিলো। তবে সেখানে র্যাগিংয়ের কোন ঘটনা ঘটেনি।
তিনি দাবি করেন, ‘অভিযোগকারী ছাত্রী আগে থেকেই মানসিকভাবে অসুস্থ। সামান্য কিছুতেই সে ঘাবড়ে যায়। এ কারণেই সে র্যাগিংয়ের অভিযোগ করেছে। তার পরেও আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শিক্ষার্থী মানসিকভাবে অসুস্থ, তবে অভিযোগকারীর মা অসুস্থ কী-না এমন প্রশ্নে কলেজ অধ্যক্ষ অকপটেই বলে ফেলেন, শিক্ষার্থীর মাও মানসিকভাবে অসুস্থ। মেয়ের এমন আচারণের কারণে তিনি কিছুটা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। এ কারণে তিনিও মেয়ের পক্ষ নিয়ে কথা বলছেন।
এ প্রসঙ্গে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) আলী আশরাফ ভূঁইয়া বলেন, ‘সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ এবং হামলার শিকার সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ঘটনাটি মীমাংসা হয়েছে। তবে র্যাগিংয়ের যে অভিযোগ উঠেছে সেটা কলেজ কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে দেখছে। আর থানায় লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ঘটনাস্থলে থাকা শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেন বলেন, ‘সাংবাদিকদের সাথে যে ঘটনা ঘটেছে সেটা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি নিয়ে কলেজ অধ্যক্ষ সকল সাংবাদিকদের কাছে দুঃপ্রকাশ করেছেন। বিষয়টি সমাধান হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেজন্য সকলকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
আরজেএন