বরিশাল নদীবন্দরে কোটি টাকার সোলার প্যানেল এখন গলার কাঁটা

বিদ্যুৎ অপচয় রোধ ও সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করতে বরিশাল নদীবন্দরে কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৪ সালের ১১ জুন স্থাপন করা হয়েছিল ‘সোলার প্যানেল’। তবে এটি অকার্যকর হতে সময় লাগেনি ছয়মাসও। ফলে সরকারের গচ্চা দেয়া কোটি টাকার সোলার প্যানেলটি এখন গলার কাঁটা হয়ে আছে নদী বন্দর কর্তৃপক্ষের। প্যানেল স্থাপন প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হয় ২০১২ সালের মার্চে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সোলার প্যানেল স্থাপনের জায়গা থেকে ছাদের দেয়াল চুইয়ে পানি ঢুকছে বন্দর ভবনে। এতে দরকারি কাগজপত্র যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, তেমনি নষ্ট হচ্ছে ভবনের দেয়াল। তাই দুই বছর আগে পরিত্যক্ত সোলার প্যানেল অপসারণের জন্য চিঠি দিলেও ব্যবস্থা নেয়নি বিআইডব্লিউটিএ’র মেকানিক্যাল এন্ড মেরিন বিভাগ।
এদিকে, সোলার প্যানেল স্থাপনের নামে পাহাড় সমান দুর্নীতি হলেও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া তো দূরের কথা, কোন তদন্তও হয়নি। ফলে অধরাই থেকে গেছে উন্নয়নের নামে সরকারি সম্পদ লুটকারীরা।
জানা গেছে, ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সেবা নিশ্চিত করতে ২০১২ সালের মার্চে ৫০ কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ‘সোলার প্যানেল’ স্থাপন প্রকল্প গ্রহণ করে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। এই প্রকল্পের আওতায় দেশের চারটি নদী বন্দর ঢাকায় ২০ কিলোওয়াট ও বরিশাল, চট্টগ্রাম এবং নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরে ১০ কিলোওয়াট করে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়।
বিআইডব্লিউটিএ বরিশাল প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন-উর-রশিদ জানান, ‘সোলার প্যানেল স্থাপন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে বিআইডব্লিউটিএ’র মেকানিক্যাল ও মেরিন বিভাগ। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছিল এক কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
তিনি বলেন, ‘বরিশাল নদীবন্দরে দ্বিতল টার্মিনাল ভবনের ছাদে ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষমতাসম্পন্ন ৬টি সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছিল। এটি কবে এবং কীভাবে বিকল হলো, সেটা আমি অবগত নই। তবে ২০১৯ সালে আমি বরিশালে যোগদানের পর থেকেই সোলার প্যানেল অকার্যকর অবস্থায় দেখতে পাচ্ছি।
এদিকে সোলার প্যানেলগুলো কতদিন সচল ছিলো, সেই তথ্য জানেন না বরিশাল বিআইডব্লিউটিএ’র কেউ। তবে অনেকে জানিয়েছেন, স্থাপনের দুই সপ্তাহের মাথায় এটি বিকল হয়ে পড়ে। আবার কেউ বলছে মাত্র ছয় মাসের মতো কার্যকর ছিল।
বরিশাল নদী বন্দরে কর্মরত ইলেক্ট্রেশিয়ান সাহাবুদ্দিন মল্লিক বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সোলার প্যানেল অকেজো অবস্থায় আছে। প্যানেল চালুর প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা গেছে। এরপর থেকেই প্যানেল আর কাজ করছে না। বিষয়টি আমি তাৎক্ষণিক যথাযথ কর্তৃপক্ষকে চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছি। কিন্তু আজ পর্যন্ত চালু হয়নি।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে সোলার প্যানেলের বিকল্প ৪০ কিলোওয়াটের একটি জেনারেটর রয়েছে। যেটাতে প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ লিটারের বেশি জ্বালানি (ডিজেল) লাগে। তাতে বছর শেষে জ্বালানি ব্যয় হয় অনেক টাকা। তাছাড়া বছর শেষে বিদ্যুৎবিলও দিতে হচ্ছে অনেক। সোলার প্যানেল চালু থাকলে এ খরচগুলো কমে আসতো।
এ প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিএ বরিশাল নদী বন্দর ও পরিবহন শাখার যুগ্ম পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমি বরিশালে নতুন যোগদান করেছি। আমার যোগদানের বহু বছর আগে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। তাই এ বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারবো না। আমাদের প্রকৌশল বিভাগ এ সম্পর্কে ভালো বলতে পারবে না। তবে সোলার প্যানেলের কারণে ছাদ হয়ে পানি চুইয়ে ভবনের ভেতরে ঢুকছে। এটি অপসারণ করা প্রয়োজন।
বিআইডব্লিউটিএ বরিশাল সিভিল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন-উর-রশীদ বলেন, ‘একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরে পাঁচ বছর পর্যন্ত প্রকল্পের ফাইলটি সংরক্ষণ করার বিধান রয়েছে। যে সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। সবশেষ দুই বছর আগে আমি এ প্রকল্পের ফাইল হেড অফিসে পাঠিয়েছি।
তিনি বলেন, ‘বরিশাল নদী বন্দরে অকেজো সোলার প্যানেল আমাদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্যানেলের কারণে বৃষ্টি হলেই ওপর থেকে পানি চুইয়ে ভবনের ভেতরে ঢুকছে। এজন্য মাঝে মধ্যেই সংস্কার কাজ করতে হচ্ছে। তাছাড়া পানি আটকাতে বন্দর কর্মকর্তার কক্ষটি টাইলস করা হয়েছে। এটা এখন যতদ্রুত অপসারণ করা যায় ততই ভালো। এ বিষয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী দপ্তর মেকানিক্যাল এন্ড মেরিন বিভাগকে কয়েক দফা চিঠি দেয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এটি অপসারণে উদ্যোগ গ্রহণ করেনি সংশ্লিষ্ট দপ্তর।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা বলেন, ‘তৎকালীন এক মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল প্যানেল প্রকল্পটি। এর ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে সরকারের কোটি টাকা লোপাট হলেও জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.এইচ.এম ফরহাদউজ্জামান বরিশাল নদী বন্দর ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল থাকার বিষয়টি শুনে অনেকটা বিস্মিত হন। বরিশাল নদী বন্দরে সোলার প্যানেল থাকার বিষয়টি অজানা ছিলো তার। তাই এ বিষয়ে তার কাছে কোন তথ্য নেই বলে জানান তিনি।
এএস