এক উপজেলা থেকে তিন শতাধিক গ্রাহক বানিয়ে এমটিএফই’র সিইও হন ইউপি চেয়ারম্যান তৌফিক

বর্তমান সময়ে দেশের আলোচিত ঘটনা এমটিএফই’র প্রতারণা। প্রতারণার ফাঁদ পেতে কয়েক হাজার কোটি কাটা নিয়ে লাপাত্তা হয়েছে এমএলএম কোম্পানিটির মূল হোতারা।তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে প্রতারকদের সহযোগিরা। যারা কোম্পানির সিইও হয়ে বিনিয়োগকারীদের ফাঁদে ফেলার মূখ্য ভূমিকায় ছিলেন। তাদেরই একজন বরিশালের হিজলা উপজেলা হরিনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তৌফিকুর রহমান।
তার সহযোগিতায় হিজলা উপজেলার তিন শতাধিক মানুষকে বোকা বানিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এমটিএফই নামক হায়হায় কোম্পানিটি। এমনকি অনলাইন ট্রেডিংয়ের নামে বাংলাদেশিদের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে টাকা তোলার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরই আত্মগোপনে চলে যান তৌফিকুর রহমান ওরফে তৌফিক চেয়ারম্যান।
বর্তমানে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি খোলা থাকলেও তিনি কল রিসিভ করছেন না। হিজলার হরিনাথপুর বাজার সংলগ্ন বাড়িতে তার ভাই-বোন এবং বাবা-মা থাকলেও স্ত্রী-সন্তানরা থাকেন ঢাকার সাভারে।
তৌফিকুর রহমানের ভাই বাদল সিকদারের দাবি, সবশেষ গত রোববার গ্রামের বাড়িতে দেখা হয়েছে চেয়ারম্যান তৌফিকুরের সাথে। এরপর থেকেই তিনি নিরুদ্দেশ।
জানা গেছে, ‘এমটিএফই মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ গ্রুপ নামে একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি (বিট কয়েন) ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম। যেখানে বিনিয়োগকারীদের উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলানো হতো। তবে ক্রিপ্টো ট্রেডিং বাংলাদেশে নিষিদ্ধ থাকলেও চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে দেশে এমএলএম কোম্পানিটির কার্যক্রম শুরু হয়।
অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রতারণার জাল বিস্তার করা এমটিএফইতে ক্রিপ্টো ট্রেডিং মুনাফা লাভের পাশাপাশি এমএলএম কোম্পানির মতই প্রলোভন দেখানো হয়। একজন গ্রাহক যদি নতুন কাউকে এখানে বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করেন, তবে তিনি নতুন গ্রাহকের বিনিয়োগ থেকেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে অতিরিক্ত আয় করতে পারবেন।
এমএলএম কোম্পানির প্রতারণার জাল বিস্তার করতে তারা নিয়োগ দেয় সিইও। একশত জন বিনিয়োগকারী যুক্ত অথবা দেড় কোটি টাকা বিনিয়োগকারীদের সিইও পদে নিয়োগ দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির শর্ত মেনে বিনিয়োগকারী যুক্ত করে সিইও বনে যান তৌফিকুর রহমান।
ভুক্তভোগীরা ‘একজন নাগরিক এমটিএফই এবং বাইনান্স নামের একটি অ্যাপ ডাউনলোড করে খুব সহজেই এমটিএফইতে রেজিস্ট্রেশন করতে পারতেন। রেজিস্ট্রেশনের পর তাদের নিজস্ব ওয়ালেটে ট্রেডের জন্য ডলার রাখতে হতো। ডলারের পরিমাণ অনুযায়ী তাদের প্রতিনিয়ত লাভ দেওয়ার প্রলোভনও দেওয়া হতো।
তারা বলেন, ‘হিজলা উপজেলায় সর্বপ্রথম হরিনাথপুর ইউপি চেয়ারম্যান তৌফিকুর রহমান এমটিএফই একাউন্ট চালু করেন। তিনি উপজেলার লোকেদেরকে নিজেদের ডলার আয়ের বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেন। একজন নির্বাচিত চেয়ারম্যান হওয়ায় এলাকার মানুষ খুব সহজেই তাকে বিশ্বাস করে তার মাধ্যমে একাউন্ট খুলতে শুরু করে। তার মাধ্যমে তিনশ’র বেশি একাউন্ট খোলা হয়েছে। সবমিলে ৪-৫ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছেন উপজেলাবাসী।
তৌফিকুর রহমান একটি হোয়ার্সঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে এমটিএফই’র প্রতারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতো। ওই গ্রুপের এডমিন ছিলেন তিনি। তবে তার এই কাজে সহযোগিতা করতেন তারই ভাই বাদল সিকদার ও ভাগিনা সাইফুল ইসলাম। তৌফিক বিনিয়োগকারীদের সাথে কথা বলে তাদের দুজনকে পাঠানো হতো একাউন্ড খোলার জন্য।
হোয়ার্সপ্যাপ গ্রুপে কথপোকথনের একাধিক স্ক্রিনশটে দেখা যায়, এমটিএফই’র গ্রাহকরা তাদের অ্যাকাউন্টে ডলার থাকলেও তা উত্তোলন করা যাচ্ছে না বলে তৌফিকুর রহমানকে জানান। তাছাড়া গত বৃহস্পতিবার রাতে অনেকের ওয়ালেটের ডলারের পরিমাণ শূন্য এবং ঋণাত্মক হয়ে যায় দেখতে পান। বিষয়টি গ্রুপে জানানো হলে তৌফিক এ বিষয়ে সকলকে ধৈর্য্য ধরার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘বিচলিত হওয়ার কিছু নেই, একেক একাউন্টে একেক রকম লস বা প্রফিট দেখাচ্ছে। সফটওয়্যার আপডেট জনিত কারণে এমনটা ঘটছে। আশাকরি সব ঠিক হয়ে যাবে’।
অপর একটি বার্তায় তৌফিকুর রহমান বিনিয়োগকারীদের জানান, ‘চলমান রক্ষণাবেক্ষণ এবং আপগ্রেডের ফলে আপনার সম্পত্তির সুরক্ষা এবং সম্ভাব্য ক্ষতি প্রতিরোধ করার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অবিলম্বে কার্যকর, ‘এআই’ ট্রেড বোতামটি রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়ার সময়কালের জন্য অ্যাক্সেসযোগ্য হবে না।’
এছাড়াও বিভিন্ন আশার বাণী লিখে বিয়োগকারীদের শান্ত রাখার চেষ্টা করেন তৌফিকুর রহমান। এরপর গত শনিবার থেকেই এমটিএফই’র সিইও এবং হরিনাথপুর ইউপি চেয়ারম্যান তৌফিকুর রহমান আত্মগোপনে চলে যায়। ভুক্তভোগী বিনিয়োগকারীরা তার বাড়িতে গিয়ে খোঁজ খবর নিয়েও তাকে পায়নি। এমনকি তার-স্ত্রী সন্তানদেরও খুঁজে পাচ্ছেন না। বাড়িতে বসবাসকারী স্বজনদের কাছে জানতে চাইলে তারা কিছু জানেন না বলে ফিরিয়ে দিচ্ছেন।
এ বিষয়ে হরিনাথপুর ইউপি চেয়ারম্যান ও এমটিএফই তৌফিকুর রহমানের ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে তাকে প্রতারণার কাজে সহযোগিতা করা ভাই বাদল সিকদার বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। যতটুকু যেনেছি অনলাইনে ভাই কী একটা ব্যবসা করতো। যাদের সাথে ব্যবসা করতো তারা নাকি টাকা নিয়ে পালিয়েছে। ওখানে আমিও ৮ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছিলাম। তবে সেই টাকা আমি ফেরত পেয়েছি।
তিনি বলেন, ‘ভাই তৌফিকুর রহমানের সাথে সবশেষ রোববার সকালে একবার দেখা হয়েছিল। তবে এরপর থেকে তার সাথে আর কোন যোগাযোগ বা দেখা সাক্ষাত নেই। তিনি কোথায় আছেন সেটা বলতে পারবো না। ঢাকার সাভারে তার বাড়ি আছে। তার স্ত্রী-সন্তান সেখানেই থাকে। তবে আমি বা আমরা কখনো সেখানে যাইনি। এখন সেখানে আছে কিনা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারবো না।
এ বিষয়ে বরিশাল জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাজাহান হোসেন বলেন, ‘বরিশাল জেলা পর্যায়ে এমটিএফই’র মাধ্যমে প্রতারণার শিকার কোন ব্যক্তি আমাদের কাছে কোন অভিযোগ করেনি। তাছাড়া এ বিষয়ে হেডকোয়ার্টার থেকেও কোন নির্দেশনা আমরা পাইনি। হেডকোয়ার্টার থেকে যেভাবে নির্দেশনা আসবে আমরা সেভাবে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
আরজেএন