বিপদসীমার নীচে কীর্তনখোলার পানি, তবুও জলাবদ্ধ নগরী

নগরীর কোলঘেঁষে বয়ে যাওয়া কীর্তনখোলা নদীর পানি বর্তমানে বিপদসীমার ৬২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অথচ তার পরেও অতিভারী বর্ষণে নগরীতে জমে থাকা বৃষ্টির পানি সরছে না। দুদিন আগে আবহাওয়া পরিস্থিতি উন্নতি হলেও এখনো নগরীর নিচু এলাকাগুলো পানিতে ডুবে আছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ বলছে, ‘অপরিকল্পিত নগরায়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাশয় ভরাট এবং খাল দখল-দূষণের কারণেই জমে থাকা পানি নদীতে নামতে পারছে না ।
এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে নগরীতে জলাবদ্ধতা আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিবে। জোয়ারের সময় নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে গেলে এবং একই সময় ভারীবর্ষণ হলে ৩-৫ ফুট জলে তলিয়ে যেতে পারে নগরী। তাই এখনই পরিকল্পিত নগরায়নের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
যদিও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিকল্পিত নগরায়নের কথা বলেছেন, নবনির্বাচিত মেয়র আবুল খায়ের আবদুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত। তিনি বলেছেন, ‘বিশেষজ্ঞদের পরামর্শেই নগর উন্নয়ন হবে। দূর হবে জলাবদ্ধতাও।
তাছাড়া নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তারা নগরীর ৭টি খাল খননের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছেন। যদিও নগরীতে জলাবদ্ধতার এই পরিস্থিতির জন্য সিটি করপোরেশনকেই দায়ী করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, শহরের জলাবব্ধতা নিরসনে বড় ভূমিকা রেখে আসছে কীর্তনখোলা নদী। নগরীর আবাসন এবং কলকারখানা থেকে নির্গত সব পানি ড্রেন এবং খাল হয়ে নদীতে গড়াচ্ছে। এর ফলে জলাবদ্ধতা মুক্ত থাকছে নগরী।
তবে গত তিনদিন আগে বরিশালে অতিভারী বর্ষণ নগরবাসীকে ভাবিয়ে তুলেছে। কেননা মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টির দিনে কীর্তনখোলা নদী পানিশূন্য থাকলেও সীমাহীন জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় নগরীতে। এমনকি বৃষ্টির পানিতে এখনো ডুবে আছে নগরীর নিচু এলাকা।
বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জানা গেছে, ‘গত ৭ আগস্ট বরিশালে মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়। ওইদিন সকাল ৯টা থেকে পরদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত ১৭৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়।
একই দিন কীর্তনখোলা নদীর পানি জোয়ারের সময় বিপদসীমার ২৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। অথচ তার পরও জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি হয়নি নগরবাসীর।
অপরদিকে, বরিশাল আবহাওয়া অফিস বলছে, ‘বরিশালে বিগত প্রায় ৬০ বছরের বৃষ্টির রেকর্ড ভেঙেছিল গত বছর অর্থাৎ ২০২২ সালের অক্টোবরে। ওইসময় ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে বরিশালে ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩২৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। এর ফলে তখন নগরজুড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। তখন কীর্তনখোলা নদীর পানি বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বৃষ্টির সাথে জোয়ারের পানিও ঢুকে পড়েছিল নগরীতে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের পানি বিজ্ঞান বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মাসুম বলেন, ‘ড্যাপ ঢাকা শহরের জন্য সুপারিশ রেখেছে জলাধারগুলো সংরক্ষণ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য। প্রয়োজনে ব্যক্তি মালিকদের জমি অধিগ্রহণ করে জলাধার সৃষ্টি করতে হবে।
সেখানে বরিশালের প্রেক্ষাপট একেবারেই উল্টো। ব্যক্তিমালিকানাধীন জলাধার যেমন ভরাট হচ্ছে, তেমনি খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠানও জলাধার ভরাট করে অবকাঠামো নির্মাণ করে চলেছে। নগরীতে জলাবদ্ধতার এটি একটি অন্যতম কারণ।
অপরদিকে, নদীর নাব্যতা কমে যাচ্ছে। ছোট নদী এবং খালগুলো পুনঃখনন হচ্ছে না। তার ওপর যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলে প্রবাহমান লিংকগুলো বন্ধ করে ফেলা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এসব কারণগুলো যেখানে বিদ্যমান সেখানে বর্তমান সময়ে যদি ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয় এবং একই সময় নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় তাবে এর চেয়েও ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখতে হতে পারে নগরবাসীকে। তাই জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বিআইডিব্লিউটিএসহ কয়েকটি দপ্তর মিলে সমন্বিত এবং পরিকল্পিতভাবে পদক্ষেপ না নিলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই যাবে।
যদিও নদীতে নাব্যতা সংকটের তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেছে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি যেই স্থানে নব্যতা সংকট সৃষ্টি হয়, সেখানে নিয়মিত ড্রেজিং করে নদীর গতিপথ স্বাভাবিক রাখা হয়।
তাছাড়া ২০১৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত কীর্তনখোলা নদীর কর্ণকাঠি এবং নগরীর রসুলপুর পয়েন্টের গভীরতা ২.৫০ থেকে ৩ মিটার পর্যন্তই রয়েছে। তবে কিছু কিছু জায়গায় প্লাস্টিক বর্জ্যরে কারণে নাব্যতা হারাচ্ছে বলে স্বীকার করেছেন বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম।
তিনি বলেন, ‘নদীর নাব্যতা স্বাভাবিক রাখতে আমাদের ড্রেজিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এমনকি ইতিপূর্বে প্রতি মাসে একবার করে নদীর গভীরতা পরীক্ষা করা হলেও এখন তা প্রতি ১৫ দিন পর পর করতে হচ্ছে।
তবে বরিশাল নগরীতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখানে পর্যাপ্ত ড্রেন নেই। যা আছে সেগুলো অপরিকল্পিত। নাগরিকদের অসহযোগিতার কারণেও নগরীতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা।
এদিকে, ‘গত সোমবার এক আলোচনা সভায় বরিশাল সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র আবুল খায়ের আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘নগরীতে জলাবদ্ধায় নগরবাসীর দুর্ভোগের চিত্র তিনি দেখেছেন। এই দুর্ভোগ থাকবে না। খুব শিঘ্রই নগরীর খালখনন করে পানির অবাধ প্রবাহ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি দায়িত্ব গ্রহণের পর সর্বপ্রথম ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে মনোনিবেশ করবেন বলে জানান মেয়র।
আরজেএন