মৃতদেহ আটকে রেখে গভীর রাতে পাঁচ লাখ টাকায় রফাদফা

বরিশালে রাহাত আনোয়ার হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলায় রোগী মৃত্যুর ঘটনা পাঁচ লাখ টাকায় রফাদফা করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। মামলা বা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করার শর্তে শিশুর পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
বুধবার রাত ২টার দিকে বিষয়টি সমঝোতা হলে এ্যাম্বুলেন্সে লাশটি তাদের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার ডাকুয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ছোটো চতরা গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর বুধবার দুপুরে শিশুটির দাফন কাফন সম্পন্ন হয়েছে।
শিশুর বড় মামা রিয়াজ প্যাদা জানিয়েছেন, সমঝোতার জন্য তাদেরকে নানাভাবে চাপ দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ কারণে বাধ্য হয়ে প্রস্তাবে রাজি হয়েছেন। তবে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ক্ষেত্রেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে বলে অভিযোগ তার। ছয় লাখের কথা বলে পাঁচ লাখ টাকা ধরিয়ে দেয়া এবং অ্যাম্বুলেন্স দেয়ার কথা থাকলেও তা দেয়নি বলে অভিযোগ তার।
এর আগে মঙ্গলবার বিকেলে বরিশাল নগরীর বান্দ রোডের রাহাত আনোয়ার হাসপাতালে নিতম্বের সুঁই ওঠাতে গিয়ে চিকিৎসকের অবহেলায় মৃত্যু হয় ওই ছয় মাসের শিশু তানজিমের। তানজিম গলাচিপা উপজেলার ডাকুয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ছোটো চতরা গ্রামের বাসিন্দা মো. ফিরোজ খান ও শিরিনা বেগম দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান।
এছাড়া অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. তৌহিদুল ইসলাম, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরে ২০ হাজার টাকা চুক্তিতে অপারেশন করার কথা বলে শিশুটিকে রাহাত আনোয়ার হাসপাতালে ভর্তি করান তিনি।
রিয়াজ প্যাদা জানান, খেলা করতে গিয়ে তার ভাগ্নের নিতম্বে সুঁই ঢুকে পড়ে। সেটি বের করার জন্য গত সোমবার সকাল ১০টার পরে তাকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়। এসময় ওই বিভাগের প্রধান ডা. তৌহিদুল ইসলাম শিশুটির অপারেশনের জন্য আগামী শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেন। এছাড়া বাইরে অপারেশন করলে একদিনের মধ্যে করা যাবে বলে জানান ওই চিকিৎসক।
রিয়াজ বলেন, ‘হাসপাতালে ভর্তি রেখে অপারেশন করার জন্যও ৬ হাজার টাকা দাবি করেন ডা. তৌহিদুল। আর বাইরে করতে হলে ২০ হাজার টাকা ফি দাবি করেন তিনি। এক পর্যায়ে ডা. তৌহিদুল কথায় মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বান্দ রোডের রাহাত আনোয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তানজিমকে।
তানজিমের অপর মামা রাকিব প্যাদা বলেন, ‘সুই বের করার জন্য দুপুর ৩টার দিকে তানজিমকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়। অপারেশনের কিছুক্ষণ আগে আমি অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশ করে দেখতে পাই ভাগ্নের মুখের অক্সিজেন মাস্কটি খোলা।
বিষয়টি চিকিৎসককে বার বার বলার পর ডা. তৌহিদুল অক্সিজেন মাস্কটি তার মুখে পরিয়ে দেন। তবে অক্সিজেন মাস্ক মুখে পড়ালেও দেখি তানজিম আর শ্বাস নিচ্ছে না। ঘটনাটি সন্দেহ হলে আমি জাতীয় সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে সহযোগিতা চাই।
খবর পেয়ে গণমাধ্যম কর্মীরা রাহাত আনোয়ার হাসপাতালে ছুটে গেলে চিকিৎসক ঘটনাস্থল থেকে কৌশলে কেটে পড়েন। পরে তাকে ফোন করা হলেও নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। এমনকি বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে অস্বীকার করেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এ প্রসঙ্গে কোতয়ালী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘৯৯৯ নম্বরে কল পেয়ে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। শিশুর পরিবারের কথা শুনেছি। তাদেরকে এ বিষয়ে মামলা করার জন্য থানায় ডাকা হয়েছে। তবে বুধবার বিকেল ৬টা পর্যন্ত তারা কেউ থানায় আসেনি। শুনেছি বিষয়টি তারা নিজেরাই সমঝোতা করেছে।
তানজিমের বড় মামা রিয়াজ বলেন, ‘আমরা মামলা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু রাহাত আনোয়ার হাসপাতালের লোকেরা আমাদের হাসপাতাল থেকে বের হতে দেয়নি। তারা সমঝোতার জন্য নানাভাবে চাপ দেয়ায় সমঝোতার প্রস্তাবে রাজি হই।
তিনি বলেন, ‘আমরা ক্ষতিপূরণবাবদ ছয় লাখ টাকা এবং এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া দাবি করেছিলাম। তাছাড়া এটুকু শিশুর ময়নাতদন্ত এবং কাটাচেড়া করার বিষয়টি তার বাবা-মা মেনে নিতে পারেনি। তাই রাহাত আনোয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সমঝোতার প্রস্তাব মেনে নিয়েছি। কিন্তু রাত ২টার দিকে তারা আমাদের হাতে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে বলে ছয় লাখ টাকা দিয়েছি। পরে বাড়ি এসে দেখতে পাই সেখানে পাঁচ লাখ টাকা। তাছাড়া এ্যাম্বুলেন্স বাড়ি পৌঁছানোর পরে জানতে পারি তারা অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়াও দেয়নি। আমাদের সাথে প্রতারণা করেছে।
সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী বাগিয়ে নিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে চুক্তিকে অপারেশনের অভিযোগ প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তৌহিদুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের কোন ঘটনা আমার জানা নেই। তবে ভুক্তভোগী পরিবার লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
আরজেএন