বরিশাল জিলা স্কুলে প্রধান শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী মুখোমুখি, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

বিভিন্ন অনিয়ম এবং দুর্নীতির প্রতিবাদে নিজ অফিস কক্ষে বরিশাল জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষককে অবরুদ্ধ রেখে বিক্ষোভ করেছে শিক্ষক-কর্মচারীরা। মঙ্গলবার দুপুরের দিকে জিলা স্কুল ক্যাম্পাসে এই ঘটনা ঘটে। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে মুক্ত হন তিনি। যদিও এমন কোন ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছেন জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের দুর্নীতি বন্ধ করেছি। এ কারণেই সবাই আমার বিরুদ্ধে এক জোট হয়ে কাজ করছে। তারা আমাকে অসম্মানিত করতেই এমন অপপ্রচার চালাচ্ছে। এর সুষ্ঠু তদন্তের দাবিও জানান তিনি।
বিক্ষোভকারী শিক্ষক ও কর্মচারীরা জানান, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ছবি বিদ্যালয়ের মূল ফটোকে স্থাপন করা হয়েছিল। প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম কারো সাথে আলোচনা না করেই ওই ছবির ওপরে নিজের স্বাক্ষর দিয়ে রেখেছেন। এর বিরোধিতা করলে তিনি সকলের সাথে অসাধারণ করেছেন।
তারা বলেন, ‘বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টিফিনের জন্য যে টাকা ব্যয় করা হয় তা থেকে একটি অংক প্রতিদিন রেখে দেন প্রধান শিক্ষক। ওই টাকা দিয়ে তিনি নিজ পরিবারের জন্য বাসায় টিফিন পাঠান। শিক্ষার্থীদের টাকায় অস্থায়ী ভিত্তিতে বিদ্যালয়ে বেশ কয়েকজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ওই কর্মচারীদের দিয়ে তিনি তার বাসার কাজ করাতেন।
অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া নারী কর্মচারী শিল্পী, শাম্মী, মালা তার বাসায় যেতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাদের চাকরি থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। যারা দীর্ঘ বছর স্কুলে কাজ করলেও প্রধান শিক্ষকের রোষানলে পড়ে বিদায় নিতে হয়েছে তাদের। প্রধান শিক্ষক তার কোয়াটারের বিদ্যুৎ বিল বিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ বিল এর সাথে সংযুক্ত করে পাঠিয়ে দেন। এর বিরোধিতা করায় চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের মারধর করেণ তিনি।
এছাড়া নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগও তোলা হয়েছে প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। জিলা স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীরা বলেন, ‘ডিজির প্রতিনিধি হিসেবে বেসরকারি নিয়োগে থাকেন জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক। সেখানে নিয়োগ বাণিজ্যের একাধিক অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
এদিকে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ছাত্রের কাছ থেকে মাসে আইসিটি বাবদ ২০ টাকা করে আদায় করার পরেও এককালীন ছাত্র প্রতি ২৪০ টাকা আদায় করেন, যা আইন পরিপন্থী। এই টাকার হিসাব কোন শিক্ষকই জানেন না।
প্রধান শিক্ষকের এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সহায়তা করেন প্রভাতি শাখার ৪র্থ “খ” শাখার শ্রেণী শিক্ষক রফিকুজ্জামান। তিনি স¤প্রতি অনুষ্ঠিত অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষায় কোড নম্বর সম্বলিত খাতায় যারা তার কাছে প্রাইভেট পড়ছে তাদেরকে খাতার শেষে রোল লিখতে বলেন। পরবর্তীতে বিষয়টি প্রধান শিক্ষককে অবহিত করার পরে তিনি তার টেবিলে একাধিক শিক্ষকের সমন্বয়ে খাতা যাচাইয়ের পরে প্রমাণিত হলেও কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।
বিষয়টি নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষোভ এবং অসন্তোষ বিরাজ করছে। শামসুজ্জামান শিশির নামের এক অভিভাবক বলেন, বিষয়টি এখন সকলেরই জানা। আমাদের সন্তানদের কথা চিন্তা করে প্রতিবাদ করতে পারছি না।
অপরদিকে, বেআইনিভাবে নিজের অনুসারী শিক্ষকদের ‘অতিরিক্ত ক্লাস’র অনুমতি দিয়েছেন প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম। ছাত্র প্রতি ১০০০-১২০০ টাকা নিয়ে অতিরিক্ত ক্লাস করতে শিক্ষার্থীদেরকে বাধ্য করা হচ্ছে। একটি ‘অতিরিক্ত ক্লাসে ১০-১৫ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়ানোর কথা বলা হলেও সেখানে ৫০-৬০ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়ানো হয়। আর সকাল ১০টা থেকে শুরু হয় ‘অতিরিক্ত ক্লাসের নামে কোচিং বাণিজ্য। যেখানে স্কুল টাইম সকাল সাতটা থেকে সোয়া এগারোটা। এছাড়াও পর্যাপ্ত টাকার বিনিময়ে ছাত্রদের তিনি শিফট পরিবর্তন করে থাকেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম বলেন, স¤প্রতি অনুষ্ঠিত অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষায় কোড নম্বর সম্বলিত খাতায় কিছু ছাত্রের রোল নম্বর লেখার বিষয়টি অধিকতর তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। তবে দোষী শিক্ষকের নাম জানা যায়নি। তাছাড়া কক্ষ সংকটের কারণে অনেক শিক্ষার্থীদের নিয়ে এক সাথে ‘অতিরিক্ত ক্লাস করানো এবং বাড়তি ক্লাসের জন্য টাকা নেয়ার কথাও স্বীকার করেন তিনি।
বঙ্গবন্ধুর ছবিতে সই করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জিলা স্কুলে আমিই প্রথম বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙিয়েছি। এজন্য বঙ্গবন্ধুর পায়ের কাছে একটি সই করেছি। এটি নিয়ে ইতিপূর্বে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের কাছেও অভিযোগ করা হয়েছিল। তারা বিষয়টি খোঁজ খবর নিয়ে দেখেছেন।
অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আইসিটি বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আগে ২৪০ টাকা নেয়া হতো। তবে এখন প্রতি মাসে ২০ টাকা করে নেয়া হয়। এ সময় তিনি নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘ছাত্রদের টিফিন ফান্ড থেকে আমি বাসায় টিফিন পাঠাই না। বরং আগে টিফিন থেকে প্রতিদিন ৫-৭শ টাকা আত্মসাত হতো। আমি সেটা বন্ধ করেছি। তাছাড়া আমার নিজের নামেও টিফিন বরাদ্দ। আমি সেটা খাই না। সেই টিফিন আমি না বলা সত্যেও কর্মচারীরা আমার বাসায় পৌঁছে দেয়। এখানে আমার কি দোষ।
বিদ্যুৎ বিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একমাত্র আমিই নিজের টাকায় বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করি। অথচ পূর্বে অন্য শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের ব্যক্তিগত বিল স্কুলের ফান্ড থেকে দিতো। আমি আসার পরে সেটাও বন্ধ হয়েছে।
এ বিষয়ে বরিশালের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) মনদীপ ঘরাই বলেন, প্রধান শিক্ষককে অবরুদ্ধ করার বিষয়টি আমি অবগত নয়। তবে আগামীকাল (বুধবার) প্রধান শিক্ষককে ডেকে বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে দেখবো। তাছাড়া ভুক্তভোগী শিক্ষক-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা যদি লিখিত অভিযোগ দেয় তাহলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণে সুবিধা হবে।
বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এইচকেআর