কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতেও বিভক্ত বরিশাল জেলা-মহানগর বিএনপি

সংকটের সময়েও ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি বরিশাল বিএনপি। কর্তৃত্ব আর গ্রুপিংয়ের কারণে কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতেও বিভক্ত বরিশাল জেলা ও মহানগর বিএনপি। নেতাদের কর্তৃত্বের জানান দিতেই পৃথকভাবে সকল রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করছে তারা।
সম্প্রতি কেন্দ্র ঘোষিত সকল কর্মসূচিই তারা আলাদা ভাবে পালন করেছে। এমনকি সোমবারের জনসভায় মুখও দেখাদেখি হয়নি দক্ষিণ জেলা ও মহানগর বিএনপি নেতা-কর্মীদের। এর ফলে কর্মী পর্যায়েও বিভক্তি এবং সংগঠন পর্যায়ে দূরত্ব বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ অবস্থার জন্য জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতারা একজন দূষছেন আরেকজনকে। চেষ্টা করছেন পরস্পরের কাঁধে দোষ চাপানোর। তারা বলছেন, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সভাপতি এবং অতিথিসহ সকল পদে কর্তৃত্ব দেখানোর জন্য আলাদা মঞ্চে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করছেন তারা।
তবে জ্যেষ্ঠ নেতাদের দাবি, ‘জেলা মহানগর এক সঙ্গে কর্মসূচি পালনে কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তারা চাইলে এক সঙ্গে অথবা আলাদ কর্মসূচি পালন করতে পারে। এজন্য গ্রুপিং বা বিভক্তির সুযোগ নেই।
জানা গেছে, ‘রাজধানীতে বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর সরকার দলীয় নেতাকর্মী এবং পুলিশের অত্যাচার নিপীড়নের প্রতিবাদ ও সরকার পতনের এক দফা দাবিতে দেশের সকল মহানগর ও জেলা সদরে সোমবার জনসমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় বিএনপি।
তাই বরিশালে জেলা এবং মহানগর বিএনপি পৃথকভাবে জনসমাবেশ করে। এর মধ্যে মহানগর এবং বরিশাল (উত্তর) জেলা বিএনপি যৌথভাবে সকাল ১০টায় নগরীর সদর রোডে বিএনপির দলীয় কার্যালয় চত্বরে জনসমাবেশ করেছে।
মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুকের সভাপতিত্বে জনসমাবেশে সঞ্চালনা করে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব মীর জাহিদুল কবির জাহিদ ও উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মিজানুর রহমান খান মুকুল। এছাড়া বক্তব্য দেন উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক দেওয়ান মো. শহিদুল্লাহসহ উত্তর জেলা ও মহানগর বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা।
অপরদিকে, একই দাবিতে সদর রোড দলীয় কার্যালয়ের সামনে সোমবার বিকেলে পাল্টা কর্মসূচি পালন করে বরিশাল (দক্ষিণ) জেলা বিএনপি। এতে সভাপতিত্ব করেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবুল হোসেন খান। সঞ্চালনায় ছিলেন কমিটির সদস্য সচিব আবুল কালাম শাহীন। এছাড়া স্থানীয় এবং কেন্দ্রীয় নেতারা অংশগ্রহণ করে দক্ষিণ জেলা বিএনপির জনসমাবেশে।
এদিকে, দেশের অন্যান্য জেলা এবং মহানগরে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি এক প্লাটফর্মে হলেও বরিশালে একই জেলায় পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিভক্তি বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে পৃথক কর্মসূচির কারণে জেলার নেতাদের মহানগরে এবং মহানগরের নেতাদের জেলার কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ কমে গেছে। এর ফলে দলীয় কর্মসূচিগুলো জোড়ালো হচ্ছে না। এতে নেতাদের নাম-ডাক বাড়লেও ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে দল।
দলীয় নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, ‘বছর খানেক আগেও বরিশাল জেলা এবং মহানগর বিএনপি দলীয় সকল কর্মসূচি এক মঞ্চে পালন করেছে। তবে বরিশাল মহানগর এবং জেলা বিএনপির নতুন আহ্বায়ক কমিটি হওয়ার পর থেকেই বিভক্ত হয়ে পড়েছেন তারা। দলীয় কোন কর্মসূচিতেই এক মঞ্চে উঠছেন না সংগঠনের নেতারা।
ইতিপূর্বে সরকার বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে সভা-সমাবেশ এবং পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি। সেখানেও বরিশাল মহানগর, বরিশাল জেলা (উত্তর ও দক্ষিণ) বিএনপি পৃথকভাবে কর্মসূচি পালন করে। তবে সম্প্রতি সময়ে মহানগর এবং উত্তর জেলা যৌথভাবে দলীয় কার্মসূচি পালন করছে। কিন্তু দক্ষিণ জেলা এখনো আলাদাভাবেই কর্মসূচি পালন করছে।
বরিশাল দক্ষিণ জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাফিজ আহমেদ বাবলু বলেন, ‘মহানগর এবং জেলা বিএনপি এক সঙ্গে কর্মসূচি পালন করলে আন্দোলন আরও শক্তিশালী হবে। তবে কৌশলগত কারণে বরিশালে কর্মসূচিগুলো পৃথকভাবে পালন হচ্ছে।
যদিও মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব মীর জাহিদুল কবির জাহিদ বলেন, ‘আমরা আগেও উত্তর জেলা বিএনপির সঙ্গে একসাথে কর্মসূচি পালন করেছি। তবে মতের অমিল থাকায় দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাথে যৌথ ভাবে কর্মসূচি পালন করা যাচ্ছে না। একটি কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি, সভাপতি, প্রধান বক্তা, সঞ্চালক সই তারা চায়। এ কারণে তাদের আমরা যৌথভাবে কর্মসূচি পালন করছি না। তাছাড়া পৃথকভাবে কর্মসূচি পালনের জন্য মহানগর বিএনপির যথেষ্ট লোকবল এবং ক্ষমতা রয়েছে।
তবে পাল্টা অভিযোগ করেছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবুল হোসেন খান। তিনি বলেন, ‘সমন্বয়করে কর্মসূচি পালন করতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনা রয়েছে। রোটেশন অনুযায়ী একেক কর্মসূচিতে একেক ইউনিটের নেতৃবৃন্দ প্রধান অতিথি, সভাপতি, প্রধান বক্তা এবং সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু মহানগর বিএনপি কোনভাবেই সেই নির্দেশনা মানছে না।
তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ জেলা দলের আলাদা ইউনিট। পৃথকভাবে কর্মসূচি পালনের সক্ষমতা আমাদের আছে। আমাদের অধীনের উপজেলা এবং পৌর কমিটির নেতারাও চায় পৃথকভাবে কর্মসূচি পালন করতে। এ কারণে আমরা সকল কর্মসূচি পৃথক ভাবেই পালন করছি। তবে বর্তমানে রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্তে এক মঞ্চে কর্মসূচি পালন করলে আন্দোলন আরো জোড়ালো হবে বলে স্বীকার করেন আবুল হোসেন।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিছ আক্তার জাহান শিরিন বলেন, ‘এক সাথে কর্মসূচি পালন করতে হবে এমন কোন বাধ্য বাধকতা নেই। যে যার অবস্থান থেকে কর্মসূচি পালন করছে। এতে দলের ক্ষতি বা নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিভক্তির কোন কারণ দেখছি না। কেননা কর্মসূচিন পৃথক হলেও সবার দাবি একটাই, অবৈধ সরকারের পদত্যাগ। যে কারণে এটাকে পাল্টা কর্মসূচিও বলা যাবে না।
আরজেএন