নগরীর ৭টি খাল উদ্ধারে আবারো উদ্যোগ নিচ্ছে পাউবো তৃতীয় দফায় দরপত্র আহবান

‘ধান-নদী-খাল, এই তিনে বরিশাল’। বরিশালের পরিচিতি তুলে ধরার ইতিহাসের সেই চিত্র এখন পাল্টে গেছে। কালের বিবর্তনে দখল, দূষণ আর অপরিকল্পিত নগরায়নে হারিয়ে গেছে ইতিহাসের খালগুলো। টিকে থাকা খালগুলোও এখন দখল-দূষণে মৃতপ্রায়।
তবে দীর্ঘদিন পরে হলেও অস্তিত্ব ফিরে পেতে যাচ্ছে খালগুলো। নগরীর কোলঘেঁষে বয়ে যাওয়া আমানতগঞ্জ, জেলখাল, রূপাতলী খাল, পলাশপুর খাল, সাগরদী খাল, চাঁদমারী খাল এবং ভাটারখাল পুনরুদ্ধার করবে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এজন্য নানা বাধা বিপত্তি পেরিয়ে তৃতীয় দফায় দরপত্র আহ্বান করেছে দরপ্তরটি।
চলতি মাসে না হলেও আগামী আগস্টের শুরুতে ৭টি খালের নগর অংশের ১২ কিলোমিটারের বেশি খাল খনন এবং পুনরুদ্ধার কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের পর্যবেক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ (পওর) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিব হোসাইন।
তিনি জানিয়েছেন, ‘২০২২ সালে ৭টি খালের বরিশাল নগর অংশে খনন এবং পুনরুদ্ধারে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু সিটি করপোরেশনের অসহযোগিতার কারণে খাল উদ্ধার সম্ভব হয়নি। তবে নবনির্বাচিত মেয়র আবুল খায়ের আবদুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাতের সহযোগিতায় খাল উদ্ধারে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। খালগুলো উদ্ধার হলে নগরবাসী জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পাবে।
জানা গেছে, ‘বাংলাদেশ স্বাধীনতার পূর্বে বরিশালে ৪৬টি খালের অস্তিত্ব ছিলো। তবে স্বাধীনতা পরবর্তী তা কমে দাঁড়ায় ২৩টিতে। বর্তমানে বড়-ছোট মিলিয়ে টিকে থাকা ২২টি খাল অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। দখল-দূষণ আর অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে মাড়াখালে পতিত হচ্ছে।
স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, ‘১৯০৬ সালের ১৫ এপ্রিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বজরায় করে বরিশালে এসেছিলেন। তাকে বহনকারী বজরা ভিড়েছিল কীর্তনখোলা নদী সংলগ্ন ভাটারখালে। বরিশালের রূপ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। খাল-বিল-পুকুর-নদী পরিবেষ্টিত বরিশালের রূপে মুগ্ধ হয়ে এই বরিশালকে ‘বাংলার ভেনিস’ আখ্যায়িত করেছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
তাছাড়া নগরীর ঐতিহ্যবাহী জেলখাল কেন্দ্রীক জমজমাট ছিলো বরিশালের বাণিজ্যিক কার্যক্রম। বড়-বড় গয়নার নৌকা চলতো এই খালটিতে। বর্তমানে অপরিকল্পিত নগরায়ন, ব্রিজ নির্মাণ এবং দখল-দূষণে ঐতিহ্যবাহী জেলখাল এখন মৃতপ্রায়। দখল-দূষণের মুখে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে জেলখালের মতো অন্য খালগুলোও।
প্রবীণ নাগরিকরা জানিয়েছেন, ‘বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র প্রয়াত আহসান হাবিব কামাল পৌরসভার চেয়ারম্যান থাকার সময় খাল ভরাট এবং দখল শুরু হয়। ১৯৯৮ সালে বটতলা খাল ভরাট করে দোকানপাট নির্মাণ করে পৌর কর্তৃপক্ষ।
পরে ২০০০ সালে প্রথম শ্রেণির পৌরসভা থেকে বরিশাল সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয়। শুরুর দিকে কিছুদিন মেয়র ছিলেন আহসান হাবিব কামাল। সেই সময় খালটির বটতলা থেকে হাতেম আলী কলেজ চৌমাথা পর্যন্ত অংশ ভরাট করা হয়। তাছাড়া ২০০৩ সালে বিএনপির মজিবর রহমান সরোয়ার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর খালের নবগ্রাম থেকে বটতলা মার্কেট পর্যন্ত খাল ভরাট করা হয়।
এছাড়া আওয়ামী লীগের তৎকালীন মেয়র শওকত হোসেন হিরনের সময় বটতলা খালের ওপর নির্মাণ করা হয় সড়ক। একইভাবে নগরীর ভাটারখালের সার্কিট হাউজের পেছনের অংশে খালের ওপর রাস্তা ড্রেন এবং সড়ক নির্মাণ করেন তিনি। তাছাড়া জেলখালের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা হয় কয়েকটি বক্স কালভার্ড। এ কারণে জেলখালে এখন নৌকা প্রবেশ করতে পারে না।
অপরিকল্পিন্ন উন্নয়নের পাশাপাশি খালগুলোর তীর দখল করে বাড়ি এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। যা এখনো দৃশ্যমান। ইতিপূর্বে জেলখালসহ নগরীর অন্যান্য খালগুলো উদ্ধারে জেলা প্রশাসন এবং সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। স্থানীয়দের অংশগ্রহণে খালের সীমানা নির্ধারণ এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা আবার দখল হয়ে যায়।
যদিও বর্তমান মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ নগরীর সকল খাল উদ্ধার এবং খননের জন্য একটি বড় প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রকল্প আদৌ আলোর মুখ দেখেনি।
এদিকে, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ‘বরিশাল সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর অনুরোধে নগরীর ৭টি খাল খানন এবং উদ্ধার প্রকল্প গ্রহণ করেছিলো পানি উন্নয়ন বোর্ড। এমনকি সাতটি খাল খননের জন্য অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করেন সদর আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম। কিন্তু রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে শেষ পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের সেই প্রকল্পও বাস্তবায়ন হয়নি গত প্রায় দুই বছরে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের পর্যবেক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ (পওর) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিব হোসাইন বলেন, ‘পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর প্রচেষ্টায় ৭টি খালের নগর অংশের ১২ কিলোমিটারের বেশি খনন ও উদ্ধার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল ২০২২ সালে। ওই বছরের মার্চে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতার কারণে দরপত্র বাতিল করা হয়েছিল। পরবর্তীতে একই বছরের নভেম্বরে দ্বিতীয় দফায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু একই কারণে তখনও দরপত্র বাতিল করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘বরিশাল সিটির নবনির্বাচিত মেয়র খাল খননের জন্য প্রতিমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন। এজন্য নতুন করে খাল খনন প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। গত ৪ জুলাই দরপত্র গ্রহণ হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই মূল্যায়ন এবং চলতি মাসেই কার্যাদেশ দিয়ে মূল কাজে ফেরার চেষ্টা চলছে।
তিনি জানান, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই প্রকল্পের আওতায় নগরীর আমানতগঞ্জ খালের ৩ কিলোমিটার, জেলখালের ২ কিলোমিটার, রূপাতলী খালের ১.১ কিলোমিটার, পলাশপুর খালে ১.৭ কিলোমিটার, সাগরদী খালের সর্বোচ্চ ৯ কিলোমিটার, চাঁদমারী খালের ১.৮ কিলোমিটার এবং ভাটারখালের দৃশ্যমান পুরো অংশ অর্থাৎ ১.৮০ কিলোমিটার খনন করা হবে।
এজন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ কোটি ৭১ লক্ষ। তবে প্রকল্প ব্যয় আরও বাড়বে।
আরজেএন