হাসপাতালগুলোতে সাপেকাটা রোগীর পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন নেই

বরিশাল বিভাগের বেশিরভাগ সরকারি হাসপাতালে সাপেকাটা ও কুকুরে কামড়ানো রোগীর ভ্যাকসিন নেই। কেউ এ ধরনের অপঘাতের শিকার হলে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন গ্রামাঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষ। তাই বিষধর সাপে কাটা রোগীরা বেশিরভাগ সময়েই দ্বারস্থ হচ্ছেন স্থানীয় ওঝাদের ঝাড়ফুঁকের ওপর। অনেক সময় এ ধরনের অপচিকিৎসার শিকার হয়ে মৃত্যুও হচ্ছে অনেকের। এতে সাপেকাটা রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। এছাড়া অনেক হাসপাতালে সাপেকাটা রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসকও নেই। এতে ঠিকমত চিকিৎসা সেবাও পাচ্ছেন না রোগীরা। জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
ভোলা প্রতিনিধি জানান:
দ্বীপজেলা ভোলার ১৮ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার জন্য পাঁচটি উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে সাপেকাটা রোগীদের পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন নেই। তাই অনেক সময় চিকিৎসার জন্য রোগীদের ছুটতে হচ্ছে ভোলা সদর হাসপাতাল অথবা বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
জানা গেছে, চরফ্যাশন উপজেলা স¦াস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩০টি ভ্যাকসিন থাকলেও বোরহানউদ্দিন, লালমোহন, দৌলতখান ৫০ শয্যার হাসপাতালে সংকট রয়েছে। ভ্যাকসিন সংকট থাকায় ওইসব এলাকায় কেউ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হলে চরম বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হচ্ছে রোগীদের। জেলা সদর হাসপাতালে ভ্যাকসিন থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।
চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শোভন কুমার বসাক বলেন, আমাদের হাসপাতালে ৩০টি ভ্যাকসিন সরবরাহ রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যান্য রোগীর চেয়ে সপ্তাহে দু’একজন সাপেকাটা রোগী চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তবে এসব রোগী বিষধর সাপে কাটা রোগী নয়। চলতি বছরের গত ছয় মাসে সাপেকাটা ২০ জন রোগীর চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে জুন মাসে সাপে কাটা এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
ভোলার সিভিল সার্জন ডা. কেএম শফিকুজ্জামান বলেন, সাপেকাটা রোগীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ভ্যাকসিন সংকট থাকলে দ্রুত সরবরাহ করা হবে। এছাড়াও চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের স্টোর কিপার মনিরুল ইসলাম জানান, প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে ২০টি করে ভ্যাকসিন রয়েছে। এছাড়া সদর হাসপাতালে মজুদ রয়েছে ২৫০টি।
পিরোজপুর:
সাপেকাটা রোগীর চিকিৎসা নেই পিরোজপুর জেলা সদর হাসপাতালে। তবে কুকুরের ভ্যাকসিন আছে। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়ছেন।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া পিরোজপুরের বাসিন্দা আবুল হোসেন জানান, মাঠে কাজ করার সময় বাঁ হাতে সাপে কামড়ানোর পর গ্রামের ওঝার কাছে যান। সেখানে ঝাড়-ফুঁকের পর দ্রুত পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে ভর্তি হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসা পেয়ে এক দিন পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. হাসনাত ইউসুফ জাকি জানান, গত ৬ মাসে আমরা ২ হাজার ১১০ জন কুকুর-বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ে বা আঁচর পাওয়া রোগীকে চিকিৎসা সেবা দিয়েছি। এখানো ৪৪৫টি ভ্যাকসিন মজুদ রয়েছে।
স্বরূপকাঠি:
জলাতংক ও সাপে কামড়ের ভ্যাকসিন নেই স্বরূপকাঠি হাসপাতালে। এই এলাকায় এ ধরনের রোগী কম বলে জানিয়েছেন ডা. ফিরোজ কিবরিয়ার। তিনি বলেন, ২ মাস আগে জলাতংকের কিছু ভ্যাকসিন হাসপাতালে আসছিল। এখন ২ ধরণের ভ্যাকসিন কোনটাই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেই।
বরগুনা:
এদিকে বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও সরকারি ভ্যাকসিন অ্যান্টিভেনম সরবরাহ নেই দীর্ঘদিন ধরে। তাই চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাপে কামড় দেয়া রোগীরা। এ উপজেলায় বছরের পর বছর সাপে কামড়ের রোগীরা চিকিৎসা না পেয়ে অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন।
বেতাগী উপজেলা মেডিকেল অফিসার ডা. জিয়াউল হক লিখন বলেন, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী উপজেলা পর্যায়ে ‘অ্যান্টি স্নেক ভেনম ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হয় না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি, যাতে দ্রুত ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হয়।
এ বিষয়ে বরিশাল শের ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সাবেক অধ্যক্ষ জাহিদ হোসেন জানান, সাপে কামড়ানোর প্রথম ১০০ মিনিট খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে ১০০ মিলি লিটার অ্যান্টিভেনম শরীরে প্রবেশ করালে রোগী বাঁচানো সম্ভব। কিন্তু গ্রামের মানুষ সাপে কামড়ালে আগে ছোটে ওঝার কাছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়। রোগী ততক্ষণে কোমায় চলে যায়।
এ বিষয়ে বরিশাল স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হুমায়ুন শাহীন বলেন, বরিশাল, পটুয়াখালী আর পিরোজপুরে গত বছর ১৮৮ ভায়াল অ্যান্টিভেনম ছিল। তা ঐ বছরের চলতি বছরের আগস্টে মেয়াদ শেষ হয়েছে। চলতি বছরের তালিকা করা হয়নি। তবে বিভাগের কোনো হাসপাতালে ভ্যাকসিন সংকট থাকার কথা নয়। যদি না থাকে তাহলে দ্রুত পাঠিয়ে দেয়া হবে।
আরজেএন