বরিশালে ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত নারীর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৭০ জন

বরিশালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। জোছনা আক্তার (৩৫) নামের ওই নারী বরিশাল সদর উপজেলার চানপুরা গ্রামের আবুল সিকদারের স্ত্রী। তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত শনিবার বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছিলেন। গত সোমবার রাতে তিনি মারা যান। এ নিয়ে বিভাগে ডেঙ্গুতে দুজনের মৃত্যু হলো।
গত সোমবার সকাল ৬টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে ১৭০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন ৪৩ জন। এ ছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর মধ্যে বরিশালে ২৩ জন, পটুয়াখালীতে ৩১, ভোলায় ২৭, পিরোজপুরে ২০, বরগুনায় ২৩ ও ঝালকাঠিতে ৩ জন ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছেন ১৩০ জন ডেঙ্গু রোগী।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, বরিশাল বিভাগে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত ২ হাজার ৯২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে জুন—এই ছয় মাসে এ বিভাগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন ৪৩৩ জন। চলতি জুলাই মাসের ১৭ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৬৫৯ জন। এই হিসাব থেকে দেখা যায়, বিভাগে মোট ডেঙ্গু রোগীর ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশই আক্রান্ত হয়েছেন চলতি জুলাই মাসের ১৭ দিনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে ২০১৯ সালের জুলাইতে প্রথম ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ওই বছর বিভাগে সাড়ে সাত হাজার রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন। আর মৃত্যু হয়েছিল ১৪ জনের। এর আগে এই বিভাগে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের কোনো ইতিহাস নেই। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে দুই বছর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও গত বছর বিভাগে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব পুনরায় মারাত্মক রূপ নিয়েছিল। গত বছর বিভাগে তিন হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। মৃত্যু হয়েছিল ১১ জনের।
স্বাস্থ্য-বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরিশাল বিভাগে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ঈদুল আজহার পর প্রতিদিনই রোগী বাড়ছে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ভয়াবহ হতে পারে পরিস্থিতি। উষ্ণ আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে বাংলাদেশ মশা ও মশাবাহিত রোগ বিস্তারের জন্য উপযুক্ত জায়গা। উপযুক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সঙ্গে যোগ হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। এ জন্য এখন থেকেই সমন্বিত প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বরিশালে রোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেলেও সে অনুযায়ী চিকিৎসাসুবিধা বাড়ছে না। বিভাগের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় আলাদা ওয়ার্ড চালু হলেও এখনো প্লাটিলেট সেল সেপারেটর যন্ত্র স্থাপন করা যায়নি। বিভাগের বাকি ছয়টি জেলা হাসপাতালেও এই যন্ত্র নেই। ফলে গুরুতর রোগীদের ঢাকায় স্থানান্তর করতে হচ্ছে। এতে এ বিভাগের ডেঙ্গু রোগীরা মারাত্মক ঝুঁকিতে আছেন।
বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মনিরুজ্জামান শাহীন বলেন, ‘চলতি মাস থেকেই রোগীর চাপ বেশি। এখানে ডেঙ্গুর জন্য পৃথক ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। তবে শয্যার সীমাবদ্ধতা নেই, যত রোগী আসবে ততই ভর্তি করা হচ্ছে। প্লাটিলেট সেল সেপারেটর যন্ত্রের চাহিদা প্রতি মাসেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া হচ্ছে। তবে এখনো আমরা এই যন্ত্র পাইনি।’
চিকিৎসা ও সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, ‘ডেঙ্গুতে আক্রান্ত বেশির ভাগ রোগীরই ভ্রমণের ইতিহাস আছে। তবে কিছু রোগীর ভ্রমণের ইতিহাস নেই। এটা অশনিসংকেত।
পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলায় রোগীর সংখ্যা অপেক্ষাকৃত বেশি। ওই উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নে নমুনা সংগ্রহের জন্য একটি দল গঠন করার পর তারা সেখান থেকে নমুনা সংগ্রহ করা লার্ভা থেকে এডিস জীবাণুবাহী মশার অস্তিত্ব শনাক্ত করেছেন। এখন পটুয়াখালীতে ওই দল পাঠাব। তবে ডেঙ্গু মোকাবিলায় সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার।’
এইচকেআর