বরিশাল বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা উপকূলের কেওড়া বনে বাঁশ-বেত চাষে সাফল্য

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় উঁচু ও ফাঁকা হয়ে যাওয়া উপকূলীয় কেওড়া বনের অভ্যন্তরে বাঁশ ও বেত চাষে সফল হয়েছে বরিশাল বন গবেষণা ইনস্টিটিউট। দেশের উপকূলীয় এলাকা পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে জেগে ওঠা চরের কেওড়া বনের মধ্যে ২০১৮ সাল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে বাঁশ ও বেত চাষে গবেষণা করে প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে আড়াই হেক্টর প্লান্টেশনে গড়ে উঠেছে বাঁশ এবং বেতের ঝাঁড়। বরিশাল বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্লান্টেশন ট্রায়েল ইউনিট বিভাগের গবেষণা কর্মকর্তা আব্দুল কুদ্দুস মিয়া জানিয়েছেন, ‘বাঁশ ও বেত উৎপাদনশীল এবং লাভজনক দুটি বৃক্ষ। যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় যেমন বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তাই উপকূলীয় এলাকায় এখন বাঁশ এবং বেত চাষের দিকে মনোযোগ বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা।
তিনি জানান, উপকূলীয় এলাকায় ক্রমাগতত পলি পড়ার কারণে প্রতি বছর নতুন নতুন চর সৃষ্টি হচ্ছে। উঁচু হয়ে যাচ্ছে পুরানো চরগুলো। এর ফলে উপকূলীয় এলাকার কেওড়া ও বাইন প্রজাতির গাছগুলোর মৃত্যুর হার অনেকাংশে বেড়ে গেছে। এতে বনের ভেতরে বিশাল জায়গাজুড়ে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই কেওড়া বনের অভ্যন্তরে বাঁশ ও বেতের সম্ভাবতা যাচাই শুরু করে বরিশাল বন গবেষণা ইনস্টিটিউট।
ইনস্টিটিউটের প্লান্টেশন ট্রায়েল ইউনিট বিভাগের গবেষণা কর্মকর্তা মোহা. আব্দুল কুদ্দুস মিয়া জানান, ২০১৭ সালে গবেষণার জন্য পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে চর কাশেমে এক হেক্টর পরিমাণ কেওড়া বনের অভ্যন্তরে উঁচু ও ফাঁকা হয়ে যাওয়া ভূমি বেছে নেই। যেখানে জোয়ারের পানি ৩-৫ মাস প্লাবিত হয়। পরে সেখানে ‘বাংলা’ ও ‘বরাক’ প্রজাতির বাঁশ এবং কেওড়া বনের অভ্যন্তরে দুটি প্রজাতির ‘জালি’ ও ‘কেরাক’ বেতের পরীক্ষামূলক বাগান করা হয়। সেখানে আমরা ৭০০টি ঝাড় তৈরি করে ছিলাম। তবে গবেষণা কার্যক্রম শুরুর পর পরই নদী ভাঙনে বিলিন হয়ে যায় ঝাড়গুলো। বর্তমানে সেখানে একশর মতো ঝাড় রয়েছে।
তিনি বলেন, ২০১৮ সালে পুনরায় রাঙ্গাবালীর চর নজির (চর আগাস্তি) এলাকায় বেত এবং ২০১৯ সালে একই স্থানে দুটি প্রজাতির বাঁশ চাষের গবেষণা শুরু হয়। প্রথম দিকে অর্থাৎ ২০১৮ সালে ০.৫ হেক্টর জমিতে ৩৮৪টি বাঁশ এবং এক হাজার ৪০০ বেতের চারা রোপন করা হয়েছিল। প্রথম বছরেই আমরা সফলতা পাই।
এ কারণে পরবর্তীতে পরবর্তী ২০১৯ সালে এক হেক্টর জমিতে ৭৬৪টি, ২০২০ সালে একই পরিমাণ জমিতে ৭৬৪টি এবং ২০২১ সালে ৫৬০টি বাঁশ এবং মোট আড়াই হেক্টর জমিতে প্রথম বছর এক হাজার ৪০০, পরবর্তী দুই বছরে ২ হাজার করে মোট ৫ হাজার এবং সবশেষ ২০২০ সালে ৭-৮ শত বেত চারা রোপন করা হয়। তবে ২০২০ সালে ঘূণিঝড় মহাসে আঘাত হানে উপকূলে। এতে বনের কিছু বাঁশ এবং বেত ঝাড়ের ক্ষতি হয়।
বাগান উত্তোলন, চারা রোপণ ও পরিচর্যা:
গবেষণা কর্মকর্তা আব্দুল কুদ্দুস মিয়া বলেন, ‘পরীক্ষামূলক বাগান করতে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি নির্বাচিত স্থানে আগাছা, লতাপাতা কেটে ফেলা হয়। বাঁশের দুটি প্রজাতির ২ ফুট জায়গা ধরে ২ ফুট উঁচ্চতার মাটির ঢিঁবির ওপরে (মিনি মাউন্ড) সমতল ভূমিতে উত্তোলন করা হয়। সমতল ভূমিতে বাঁশের চারা রোপণের জন্য এক ফুট জায়গাজুড়ে ১ ফুট গর্ত করা হয়। প্রতিটি মাউন্ডে ১০ কেজি এবং গর্ত প্রতি ৩-৫ কেজি গোবর সার মিশ্রণ করা হয়। এরপর প্রতিটি বাঁশের চারা ৩ ফুট দূরত্বে রোপণ করা হয়।
অন্যদিকে ‘জালি’ ও ‘কেরাক’ বেত কেওড়া গাছের গোড়ার কাছাকাছি রোপন করা হয়। ২০১৮ সাল হতে ২০২১ পর্যন্ত বাঁশ ও বেতের পরীক্ষামূলক বাগান উত্তোলন করা হয়। বেতের চারা লাগানোর জন্য কেওড়া গাছের কাছাকাছি ১ ফুট গর্ত করা হয় এবং প্রতিটি গর্তে ৩-৫ কেজি পরিমাণ গোবর সার মিশ্রণ করা হয়। বাঁশ ও বেতের ৫-১২ মাস বয়সি চারা এপ্রিল-মে মাসে বৃষ্টির পর লাগানো হয়। বাগান উত্তোলনের পর প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে মিনি মাউন্ডের গোড়ায় মাটি দেয়া হয় এবং আগাছা পরিস্কার করা হয়।
বাঁশ ও বেতের নার্সারী উত্তোলনঃ
গবেষণা কর্মকর্তা আরো জানান, ‘বাংলা’ ও ‘বরাক’ বাঁশের কঞ্চিকলম পদ্ধতিতে চারা উত্তোলন করা হয়। অন্যদিকে জালি বেতের বীজ স্থানীয় ঝাড় থেকে সংগ্রহ করে কেরাক বেতের বীজ চট্টগ্রাম থেকে সংগ্রহ করা হয়। এছাড়া জালি ও কেরাক বেতের বীজ বপন করা হয় বালুর ওপর। বীজ থেকে চারা গজানোর পর চারা বালির বেড হতে পলিব্যাগে স্থানান্তর করা হয়।
গবেষণায় সাফল্যঃ
গবেষণা কর্মকর্তা মোহা. আব্দুল কুদ্দুস মিয়া জানান, ‘উপকূলীয় উঁচু ও ফাঁকা হয়ে যাওয়া কেওড়া বনের অভ্যন্তরে ছোট ঢিঁবি এর ওপরে উত্তোলিত বাঁশের প্রজাতির মধ্যে তিন বছর বয়সি বাংলা বাঁশের বেঁচে থাকার হার গড়ে ৮৭ ভাগ এবং কোঁড়ল গজানোর হার শতভাগ। ঝাড়ে প্রতি বছরে গড়ে পাঁচটির ওপর নতুন কোঁড়ল গজিয়েছে। এর গড় উঁচ্চতা প্রায় ৫ মিটার।
আরজেএন