খুঁড়িয়ে চলছে বরিশাল জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তর

মাত্র একজন উপ-পরিচালক ও সহকারীর পরিচালক দিয়ে চলছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বরিশাল কার্যালয়। এই দুই কর্মকর্তা মূলত: বিভাগীয় অফিসের কর্মকর্তা। জেলা কার্যালয়ে একজনও কর্মকর্তা না থাকায় সেই দায়ভার পড়েছে তাদের ওপর। অথচ কাগজে কলমে সংস্থাটির কার্যালয়ে জনবল থাকার কথা ২০ জন। জনবল ও নিজস্ব গবেষণাগার ছাড়া খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েই চলছে ভোক্তাদের অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত সংস্থাটি।
ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলা কার্যালয়ে উপ-পরিচালক, সহকারী পরিচালক, গবেষণাগার সহকারী, সহকারী প্রোগ্রামার, হিসাবরক্ষক, নমুনা সংগ্রহকারী, নমুনা পরীক্ষক, ব্যক্তিগত সহকারী, অভিযোগ গ্রহণকারী, সহকারী হিসাবরক্ষক, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর, ক্যামেরাম্যান, গাড়ি চালক, নিরাপত্তা প্রহরী ও ক্লিনারসহ মোট ২০টি পদ রয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র একজন সহকারী পরিচালক আর অফিস সহকারী ছাড়া বাকি পদই শূন্য।
এদিকে পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে ভোক্তার অধিকার রক্ষায় হিমশিম খেতে হচ্ছে সংস্থাটির। সহকারী পরিচালককেই অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে যাবতীয় কার্যক্রম সামলাতে হচ্ছে। ফলে নগরীতে সচেতন ভোক্তাদের সুবাদে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কিছুটা ব্যবস্থা নেওয়া গেলেও এই সুবিধা পান না গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দারা।
একই দশা বিভাগীয় কার্যালয়েরও। জেলা অফিসের মতো জনবল শুন্যতায় ধুকছে বিভাগীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর। ১৫ পদ থাকলেও কর্মরত রয়েছেন মাত্র পাঁচজন। এর মধ্যে উপ-পরিচালক, সহকারী পরিচালক, গাড়ি চালক, নিরাপত্তা প্রহরী ও ক্লিনার রয়েছেন। তবে বিভাগের ৬ জেলাকে সামাল দিচ্ছেন ২ জন কর্মকর্তা। ১০ পদশূণ্য হল, উপপরিচালক একজন, সহকারী পরিচালক তিনজন, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর একজন, গবেষণাগার সহকারী ও ক্যামেরাম্যান একজন, সহকারী হিসাব রক্ষক একজন, নমুনা সংগ্রহকারী একজন, অফিস সহকারী একজন, অফিস সহায়ক দুইজন, ক্লিনার ও নিরাপত্তা প্রহরী একজন।
নেই অভিযোগ ও নমুনা গ্রহণকারীর পদ
বরিশাল বিভাগে ৬ জেলার অধীনে ৪২টি উপজেলা। ভোক্তার অধিকার রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো অভিযোগ গ্রহণকারী ও নমুনা গ্রহণকারীর। অভিযানে গিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ধরতে নমুনা সংগ্রহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ দুই পদে কোন লোকবলই নেই। তাই অভিযোগ গ্রহণের কাজও করছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
নেই গবেষণাগার
ভোক্তা অধিকারের বিভাগীয় কার্যালয়ের অধীনে একটি গবেষণাগার থাকার কথা। কিন্তু গত ১১ বছরেও তা গড়ে তোলা হয়নি। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খাদ্যপণ্যে ব্যবহার করা রাসায়নিক, রঙ ও ফরমালিনসহ বিভিন্ন অস্বাস্থ্যকর পদার্থ পরীক্ষা করার জন্য এই গবেষণাগারটি জরুরি প্রয়োজন। কিন্তু এটি না থাকায় পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করলেও পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
লোকবল সংকটে বিঘ্নিত উপজেলা পর্যায়ে অভিযান
বরিশালের আয়তন ৫৮ বর্গ কিলোমিটার। এর মধ্যে মহানগরে প্রায় ৬ লাখ মানুষের বসবাস। জনবল সংকটে শুধু মহানগরে অভিযান চালাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্মকর্তাদের। আর জেলার ১০ উপজেলায় পরিবহন সংকটের কারণে রীতিমতো অভিযান পরিচালনা করতে পারছে না ভোক্তা অধিকারের কর্মকর্তারা।
উপজেলা পর্যায়েও প্রয়োজন ভোক্তা অধিকারের কার্যালয়
শুধুমাত্র বরিশাল বিভাগ ও জেলার দুটি কার্যালয় দিয়ে ভোক্তার অধিকার রক্ষায় কাজ করা মুশকিল বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা বলেন, সীমিত জনবলে মহানগরেই কাজ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের পর থেকেই এভাবে চলছে কার্যক্রম। বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়ে পর্যাপ্ত জনবলের পাশাপাশি উপজেলাগুলোতে একজন সহকারী পরিচালকের অধীনে একটি করে কার্যালয় স্থাপন করা প্রয়োজন। এতে পুরো জেলায় মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করা সম্ভব হবে।
সংকট পরিবহন ব্যবস্থায়ও
ভোক্তা অধিকারের বিভাগীয় কার্যালয়ে বর্তমানে একটি মোটর সাইকেল ও একটি পিকআপ ভ্যান রয়েছে। কিন্তু জেলা কার্যালয়ে কোন গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে গাড়ি ভাড়া করে অভিযানে যেতে হচ্ছে কর্মকর্তাদের। নিজস্ব পরিবহন না থাকায় অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত সময়ের মধ্যে কোন জায়গায় গিয়ে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। তাই ভোক্তারা সেবা না পেলেই সব সময় অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভুল বুঝে নানা মন্তব্যও করেন।
ভোক্তা অধিদপ্তরের জনবল সংকটের বিষয়ে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) বরিশাল জেলার সভাপতি হিরন কুমার দাস মিঠু বলেন, ক্রেতা প্রতারিত হলেও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার অভাবে প্রতিকার পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ।
ভোক্তা অধিকার ও সংরক্ষণ অধিদপ্তরের জেলার সহকারি পরিচালক (অতিরিক্ত) সাফিয়া সুলতানা বলেন, একটি উপজেলার বাজারে অভিযান চালাতে গিয়ে অনেক সময় সারাদিন পার হয়ে যায়। তিনি বলেন, আমি ঝালকাঠি জেলায় দায়িত্ব পালন করছি। বরিশাল জেলায় লোকবল না থাকায় এখন অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এখানে কাজ শেষ করে অন্য জেলায় যেতে সমস্যা হচ্ছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ইন্দ্রানী দাস বলেন, পরিবহন সংকট ও লোকবলের অভাবে আমরা উপজেলাগুলোতে অভিযান পরিচালনা করতে পারি না। অভিযোগ গ্রহণকারী ও নমুনা গ্রহণকারীর মত দুটো গুরুত্বপূর্ণ পদে লোক না থাকায় সে কাজটা আমাদেরই করতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অন্য কাজের ক্ষতি হচ্ছে।
একই কার্যালয়ের বিভাগীয় উপ-পরিচালক অপূর্ব অধিকারী জানান, অধিদপ্তরের জনবল বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আশা করি, দ্রুত এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে। তিনি বলেন, আমাদের এই জনবল দিয়েই রাতদিন কাজ করে যাচ্ছি।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালে যাত্রা শুরু হয় জাতীয় ভোক্তা অধিকার বরিশাল কার্যালয়ের। তখনও সাতটি পদের অনুকূলে জনবল ছিল ৫ জন।
এএস