বরিশালের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা জামায়াতের

গত ২০১১ সালের পর থেকে বরিশালে রাজনৈতিক ভাবে নিস্ক্রিয় ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। মাঝে মধ্যে গোপনে দুই-একটি ঝটিকা মিছিল ছাড়া অন্য কোনো কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে দেখা যায়নি তাদের।
তবে দীর্ঘ একযুগ পর আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে দলের নেতা-কর্মীরা। বরিশাল সদরসহ বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জ্যেষ্ঠ নেতারা। এমনকি বরিশাল জেলার ৪টি আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীও ঘোষণা করা হয়েছে। তারা গত ঈদ-উল-আজহায় নির্বাচনী এলাকায় শুভেচ্ছা পোস্টার সাঁটিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়ে প্রকাশ্যে এসেছেন।
এর আগে গত ১২ জুন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও চারটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন জামায়াতের চারজন নেতা। যাদের মধ্যে ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে বিজয়ী হয়েছেন একজন।
জামায়াতে ইসলামী নেতারা বলছেন, ‘নানা বাধা-বিপত্তির কারণে ইতিপূর্বে রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে প্রকাশ্যে আসতে পারেননি তাঁরা। তবে সামনের দিনগুলোতে রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে থাকবেন বলে জানিয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও বরিশাল অঞ্চলের পরিচালক অ্যাডভোকেট মুয়ায্যম হোসাইন হেলাল।
জানা গেছে, ‘২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন পায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তবে এর আগে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ নামে পরিচিতি ছিল দলটি।
২০১৩ সালের ১ আগস্ট বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট জামায়াতের নিবন্ধন সম্পর্কিত একটি রুলের রায়ে সংগঠনটির নিবন্ধন অবৈধ এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করে। এরপর একই বছরের নভেম্বরে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে দলটি।
তবে নিববন্ধন বাতিলের পর থেকেই অন্যান্য স্থানের মতো বরিশালেও ঝিমিয়ে পড়ে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক কর্মকা-। ২০১৩ সালের দিকে বন্ধ হয়ে যায় বরিশাল নগরীর বাটারগলিতে তাদের অস্থায়ী রাজনৈতিক কার্যালয়টিও।
যদিও দলের নেতাদের দাবি, সরকার এবং প্রশাসনিক চাপে তারা রাজনীতিতে প্রকাশ্যে আসতে না পারলেও নানা কৌশলে দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। কাজ করতে গিয়ে মাঝে মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতারও হয়েছেন অনেকে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বরিশাল মহানগরের আমীর জহির উদ্দিন বাবর জানিয়েছেন, ‘আমাদের অনেক নেতা-কর্মী আছে। তবে এই মূহূর্তে সবাই প্রকাশ্যে আসার সাহস পাচ্ছে না। তাই কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী আমাদের রাজনৈতিক কর্মকা- চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা তো গোপনে নয়, প্রকাশ্যেই আছি। আমাদের দলের অভ্যন্তরীণ এবং সামাজিক কর্মকা- আমরা চালিয়ে যাচ্ছি। আর এগুলো প্রকাশ্যেই চলছে। তবে কোন ধরনের মিছিল, মিটিং এবং সমাবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না।
জামায়াতের এই নেতা বলেন, ‘সম্প্রতি ঢাকায় কেন্দ্র থেকে রাজনৈতিক সমাবেশ করেছে। তবে এখন পর্যন্ত তৃণমূল পর্যায়ে কোন কর্মসূচি আসেনি। থাকলে সেটা প্রকাশ্যেই পালনের প্রস্তুতি রয়েছে। তবে আপাতত আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।
জহির উদ্দিন বাবর আরো জানিয়েছেন, ‘আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল জেলার ৬টি আসনের মধ্যে ৪টি আসনে জামায়াতের প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে। এর মধ্যে বরিশাল সদর আসনে কেন্দ্রীয় জামায়াতের সহ-সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মুয়ায্যম হোসাইন হেলাল, বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনে জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর মাস্টার আব্দুল মান্নান, বরিশাল-৩ (মুলাদী-বাবুগঞ্জ) আসনে মহানগর জামায়াতের আমীর জহির উদ্দিন বাবর এবং বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন জেলার সাবেক নায়েবে আমীর মাওলানা আবুল হাসেম।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ‘বরিশাল সদর আসনের বাসিন্দাদের ঈদ-উল-আযহার শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্টার সাটিয়েছেন সংসদ সদস্য প্রার্থী মুয়ায্যম হোসেন হেলাল। নগর ছপিয়ে পোস্টার শোভা পেয়েছে সদর উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায়। স্থানীয়দের মতে নির্বাচনী পোস্টারের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে জামায়াত।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও বরিশাল অঞ্চলের পরিচালক অ্যাডভোকেট মুয়ায্যম হোসাইন হেলাল মতবাদকে বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে আমাদের দলের অবস্থান সবসময়েই ছিল। আসন্ন নির্বাচনের জন্যও আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। তবে সেই নির্বাচন যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয়, তবেই আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যাবো।
তিনি বলেন, ‘শুধু ৪টি আসনেই নয়, বরিশালের গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতেও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী থাকবে। এ নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রস্তুতি চলছে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় এই নেতা বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ভাবে বিভিন্ন সময় বরিশালে কর্মসূচি দেয়া হয়েছে। সেগুলো আমরা পালনও করেছি। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে শহর কেন্দ্রীক কোন কর্মসূচি দেয়া বা পালন হয়নি। অনেক বাঁধা বিপত্তির মধ্যে দলের কর্মকা- এগিয়ে নিতে হচ্ছে। তবে সামনের দিনগুলোতে জামায়াত রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে সক্রিয় হবেন বলে জানান এই নেতা।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘রাজনীতিতে নিস্ক্রিয় হওয়ার পর গত প্রায় এক যুগে জামায়াত ত্যাগ করে যোগ দিয়েছেন বিএনপিতে। যাদের মধ্যে অনেকেই এখন বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। আবার অনেকে রাজনীতি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন।
২০২২ সালের নভেম্বরের দিকে জহির উদ্দিন বাবরকে আমির ও মাওলানা মতিউর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে জামায়াতে ইসলামী বরিশাল মহানগরে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। তবে কমিটির মেয়াদ এক বছর পূর্ণ হতে চললেও এখনো পূর্ণাঙ্গ হয়নি।
টিইউ