বরিশালে ঢুকছে মাদকের বড় চালান
হঠাৎ করেই বরিশালে ঢুকছে একের পর এক মাদকের বড় চালান। এ ক্ষেত্রে মাদক পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে নৌ-পথ। আবার সমুদ্রপথে কুয়াকাটা, বরিশাল হয়ে ঢাকায় যাচ্ছে ইয়াবার বড় চালান। ছোট চালান হাতবদল হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামাঞ্চলে। আর বেশিরভাগ মাদকের চালান আসছে কুমিল্লা এবং চাঁদপুর থেকে। সম্প্রতি নৌ পথে আসা মাদকের বেশ কয়েকটি বড় চালান আটক করেছে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা ইউনিট।
মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের গত ৮ মাসে ২১৪৫৮ ইয়াবা, ১১৬ কেজি গাঁজা, ৪৬০ ফেনসিডিল ও ১০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার হয়েছে। এসময় আটক হয়েছে বেশ কয়েকজন মাদক কারবারি। তবে এর পরেও থামছে না মাদক পাচার। মাদক পাচার রোধে সীমান্তে কঠোর নজরদারির অভাবে বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদকদ্রব্য ঢুকে পড়ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
অপরদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, তাদের মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের ফলে শহরে ইয়াবার ব্যবহার কমলেও গ্রামে বিস্তার ঘটছে। সেখান থেকে কাঁচা টাকা লুটে নিচ্ছেন আড়ালে থাকা মাদক কারবারিরা। তবে আগের চেয়ে এই ব্যবসার জৌলুস কমেছে। এখন কেউ প্রকাশ্যে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক বিক্রি করছে না বলে দাবি আইনশঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের।
সূত্রে জানা গেছে, কথিত ইয়াবা এখন অনেকটাই মহামারি রূপ ধারণ করেছে শহর এবং গ্রামীণ পর্যায়ে। নগরীর প্রায় প্রতিটি অলিগলিসহ গ্রামঞ্চলের আনাচেকানাচে হাত বাড়ালেই মিলছে ইয়াবার ট্যাবলেট। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও বহন করছে এই মরণ বড়ি। মাদকের আসক্ত হয়ে ধর্ষণ ও খুনের মতো অপরাধে জড়াচ্ছে যুবসমাজ। এমনকি সামাজিক অবক্ষয়ের মূলে ইয়াবা সেবন বড় কারণ বলে মনে করছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। অথচ এই মরণ নেশা ইয়াবা কারবারির নেপথ্যে রাজনীতির ব্যানার গায়ে লাগানো মুখোশধারী কিছু নেতার হাত রয়েছে বলে গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে উঠে এসেছে। আবার প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার খবরও পাওয়া গেছে। এসব কারণে মাদক নিয়ন্ত্রণে আনা অনেকটা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা জানান, নতুন কৌশেলে ইয়াবা পাচার করা হচ্ছে। সড়ক পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধির কারণে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইনের বড় চালান পাচারের জন্য নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে নৌ-পথ। নৌপথে ইয়াবা পাচারে সহায়তা করছে কিছু ফিশিং ট্রলারের মালিক এবং জেলে। একশ্রেণির জেলে মাছ ধরার নামে মাদক বহন করে। তাদের হাত ধরে ইয়াবার চালান উপক‚লে উঠছে। সেখান থেকে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। গভীর সমুদ্রেও ইয়াবা চালানের হাতবদল হচ্ছে। সমুদ্র পথ থেকে ইয়াবার বড় চালান কুয়াকাটা, কলাপাড়া, মহিপুর আসছে। সেখান থেকে চালানটি সড়ক পথে ঢাকায় যাচ্ছে। এছাড়া ইয়াবার ছোটচালান পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ভোলা এবং বরিশাল নগরীতে আসে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (গোয়েন্দা ইউনিট) মো. এনায়েত হোসেন জানান, ঢাকা থেকে বাইরুটে (সড়ক) কিছু চালান আসলেও বেশি আসছে নৌ পথে। সমুদ্রপথে ইয়াবার বড় চালান এসে কুয়াকাটা, কলাপাড়া ও মহিপুরে নামছে। সেখান থেকে সড়ক পথে ঢাকার উদ্দেশে চলে যায় বিভিন্ন যানবাহনে। এছাড়া ছোট চালান কয়েকটি জেলা উপজেলায় ছড়িয়ে যায়। তিনি বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, চাঁদপুর থেকে গাঁজা এবং সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসছে ফেনসিডিল সড়ক ও নৌ রুটে আসছে।
এদিকে, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পূর্বের তুলনায় কয়েকগুন বেশি মাদকের চালান ঢুকছে বরিশালে। গত কয়েকমাস ধরে এই প্রবণতা প্রশাসনেরও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ইয়াবা ও গাঁজার ছোটো-বড়ো চালান ধরা পড়ছে। সম্প্রতি বানারীপাড়া থেকে গাঁজার বিশাল এক চালান আটক করে র্যাব-৮। যা বরিশালের ইতিহাসে সর্বোচ্চ চালান ছিলো।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেল ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা ইউনিটের চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাসের পরিসংখ্যক বলছে, মেট্রোপলিটন পুলিশের অভিযানে ৪ হাজার ৪৫৩ পিস ইয়াবা, ৬০ কেজি ৫০০ গ্রাম গাঁজা, ৬৪ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়েছে। এসকল ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৬ জনকে আটক করা হয়। অপরদিকে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা ইউনিট বিভাগে ২৭৮টি মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছেন। এসব অভিযানে ৭৬ জনকে আটক করেছে সংস্থাটি। পাশাপাশি আটককৃতদের কাছ থেকে ১৭ হাজার ৫ পিস ইয়াবা, ৫৫ কেজি ৩৩০ গ্রাম গাঁজা, ৩৯৬ বোতল ফেনসিডিল, ১০০ গ্রাম হেরোইন, বিলাতি মদ ৮০ বোতল, চোলাইমদ ৩০ লিটার, চোলাইমদ তৈরির উপকরণ ৬০০ লিটার উদ্ধার করা হয়। এছাড়াও নগদ ৩ লাখ ৬৪ হাজার ১০০ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা ইউনিটের কর্মকর্তারা বলেন, প্রশাসনের কঠোর নজরদারির কারণে মাঝখানে অনেকদিন ইয়াবা ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য কম ছিল। কিন্তু গত কয়েকদিনে অনেকগুলো ইয়াবার চালান ধরা পড়েছে; যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁরা বলেন, দীর্ঘদিন দেখেছি মিয়ানমার থেকে আনা ইয়াবার চালান দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে একাধিক স্থানে ছড়িয়ে দেওয়া হতো। তবে বরিশাল ভিত্তিক সিন্ডিকেট অনেক আগেই ভেঙে দেওয়া হয়েছে। গডফাদারদের অধিকাংশই হয়তো কারাগারে, নয়তো বিদেশে পলাতক রয়েছে।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার উপ-পুলিশ কমিশনার মো. মঞ্জরুল রহমান বলেন, মাদক পাচারকারীদের রুট পরিবর্তন হয়েছে এমন তথ্য আমাদের কাছে আছে। সড়ক ও নৌ পথে ইয়াবা এবং গাঁজার মতো মাদকের বড় চালান বরিশালে আসছে। সম্প্রতি কিছু মাদকের চালান আটক করা হয়েছে, তা বেশির ভাগই নৌ-পথে এসেছে। তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা যে ধরণের কৌশলের আশ্রয় নেবে, নিয়ন্ত্রণে আমরাও সেই ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করব। মাদকের বিরুদ্ধে সর্বদাই জিরো টলারেন্স বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ।
এইচকেআর