ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

Motobad news

আগৈলঝাড়ায় টিউশনি ও সেলাই মেশিন চালিয়ে এইচএসসিতে এ প্লাস তিথির

আগৈলঝাড়ায় টিউশনি ও সেলাই মেশিন চালিয়ে এইচএসসিতে এ প্লাস তিথির
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

বাবা ভ্যানচালক। চার মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। অভাবের সংসারে প্রাইভেট কিংবা কোচিং করার সামর্থ্য ছিল না। কিন্তু উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখতেন তিথি বিশ্বাস। সেই স্বপ্ন পূরণে বাবার কাঁধের বোঝা কিছুটা কমাতে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই শুরু করেন টিউশনি। পাশাপাশি শিখে নেন সেলাইয়ের কাজ। অন্যের সন্তানকে পড়িয়ে আর সেলাই মেশিন চালিয়ে জোগাড় করেছেন নিজের পড়াশোনার খরচ।

দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেই এসএসসি পরীক্ষায় পেয়েছিলেন গোল্ডেন এ প্লাস। এবার এইচএসসি পরীক্ষাতেও অর্জন করেছেন এ প্লাস। তবে একের পর এক সাফল্যের পরও তিথির পরিবারের দুশ্চিন্তা কাটছে না। কারণ, মেধাবী মেয়েটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই ভ্যানচালক বাবার। এখন উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে আর্থিক সহযোগিতার অপেক্ষায় তিথি ও তার পরিবার।

তিথি বিশ্বাস বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার বাকাল গ্রামের ভ্যানচালক সুখরঞ্জন বিশ্বাসের মেয়ে। তিনি আগৈলঝাড়া সরকারি ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। কলেজের ৫২০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে একমাত্র তিথিই এ প্লাস অর্জন করেছেন।

ছোটবেলা থেকেই অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা তিথি বুঝতে শিখেছিলেন, তার পড়াশোনার খরচ জোগাতে বাবাকে কতটা পরিশ্রম করতে হয়। চার মেয়ের সংসারে সীমিত আয়ের বাবার পক্ষে সবার পড়াশোনার ব্যয় বহন করা কঠিন ছিল। তাই অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই নিজের পড়াশোনার খরচ নিজে জোগানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। শুরু করেন টিউশনি। পাশাপাশি শিখে নেন সেলাইয়ের কাজ। পড়াশোনার ফাঁকে সময় বের করে ছোট ছোট শিক্ষার্থীকে পড়াতেন। সুযোগ পেলেই বসতেন সেলাই মেশিন নিয়ে। এভাবেই ধীরে ধীরে নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করেছেন। সংসারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা যেন তার শিক্ষাজীবনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পারে, সে জন্য চালিয়ে গেছেন নিরন্তর চেষ্টা।

তিথি বিশ্বাস বলেন, ছোটবেলা থেকেই তাদের পরিবার অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে চলেছে। চার বোনের পড়াশোনার খরচ বাবাকে বহন করতে হতো। বাবার কষ্ট দেখে নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই জোগানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। অষ্টম শ্রেণি থেকেই টিউশনি করে নিজের পড়ার খরচ চালিয়ে আসছেন। পাশাপাশি করেছেন সেলাইয়ের কাজ।

তিনি বলেন, তার এই পথচলায় শিক্ষকদের অবদান অনেক। শিক্ষকদের সহযোগিতা এবং বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণাই তাকে এত দূর আসতে সাহায্য করেছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয় ও নার্সিংয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিথি। উচ্চশিক্ষা অর্জন করে সম্মানজনক অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হতে চান। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বাবার দীর্ঘদিনের কষ্ট দূর করাই তার অন্যতম লক্ষ্য। তার স্বপ্ন, একদিন নিজের পরিচয়ের পাশাপাশি মেয়ের পরিচয়েও মানুষ তার বাবাকে সম্মানের চোখে দেখবে।

মেয়ের এমন সাফল্যে আনন্দিত বাবা সুখরঞ্জন বিশ্বাস। তবে সেই আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে মেয়ের উচ্চশিক্ষার খরচ জোগানোর দুশ্চিন্তা। ভ্যান চালিয়ে সংসার চালানো এই বাবা বলেন, মেয়েকে ভালো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানোর সামর্থ্যও তার ছিল না। তিথি নিজেই দুই ব্যাচ শিক্ষার্থীকে পড়িয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছে। সকালে-বিকেলে অন্যদের পড়াতে গিয়ে নিজের পড়াশোনার জন্য পর্যাপ্ত সময়ও পেত না। এরপরও মেয়ের এমন ফলাফলে তিনি গর্বিত। এখন মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করে নিজের পায়ে দাঁড় করানোই তার স্বপ্ন।

তিথির মা নিলিমা বিশ্বাস বলেন, তাদের কোনো অর্থ-সম্পদ নেই। স্বামীও অসুস্থ। মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই। অনেক কষ্ট করে তিথি ছোটদের পড়িয়েছে, সেলাইয়ের কাজ করেছে। নিজের জমানো টাকা দিয়েই পড়াশোনার খরচ চালিয়েছে। মেয়ের এমন সাফল্যের পরও উচ্চশিক্ষার পথ কীভাবে এগোবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। সরকার কিংবা কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি তিথির উচ্চশিক্ষার দায়িত্ব নিলে তাদের পরিবারের জন্য অনেক বড় সহায়তা হবে। মেয়ের স্বপ্ন পূরণে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। 

তিথির শিক্ষক কামরুজ্জামান বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তিথি পড়াশোনায় নিয়মিত ও মনোযোগী ছিল। নিজের প্রচেষ্টা, অধ্যবসায় ও শিক্ষার প্রতি আগ্রহের কারণেই সে এমন ফলাফল অর্জন করেছে। তার এই সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

আগৈলঝাড়া সরকারি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ অমিতা বিশ্বাস বলেন, তিথির এই অর্জন কলেজের জন্য গর্বের। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তার এমন ফলাফল সত্যিই প্রশংসনীয়। বাবার ভ্যানে চড়ে কলেজে যাওয়া, টিউশনি করা, সেলাই মেশিন চালানো- সবকিছুর মধ্য দিয়েই নিজের স্বপ্নের পথে এগিয়েছে তিথি।

আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিরুপম মজুমদার বলেন, তিথি বিশ্বাসের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। এ ছাড়া তার পরিবারের পক্ষ থেকে একটি আবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকেও সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। তিথির পরিবারের পাশে উপজেলা প্রশাসন সব সময় থাকবে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

অভাবের সংসারে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে মেধা ও পরিশ্রমের স্বাক্ষর রেখেছে তিথি। এসএসসির পর এইচএসসিতেও এ প্লাস অর্জন করে প্রমাণ করেছে, আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায় মানুষকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিতে পারে। তবে শিক্ষাজীবনের পরবর্তী ধাপে পৌঁছাতে এখন প্রয়োজন আর্থিক সহযোগিতা। সামর্থ্যবান ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টরা এগিয়ে এলে হয়তো পূরণ হবে ভ্যানচালক বাবার মেয়ের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন।
 


এইচকেআর
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন