প্রশাসনের আশ্বাসে তিনঘণ্টা পর সড়ক অবরোধ প্রত্যাহার

সড়ক দুর্ঘটনায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ইয়াসিন আরাফাতের নিহতের ঘটনায় আর্থিক ক্ষতিপূরণসহ তিন দফা দাবিতে বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক অবরোধ করেছে শিক্ষার্থীরা।
নিহত শিক্ষার্থীর গায়েবানা জানাজা শেষে সোমবার (১০ আগস্ট) সন্ধ্যা পৌনে ৭টা থেকে ক্যাম্পাস সংলগ্ন মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ এবং বিক্ষোভ করে তারা। এতে সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েন কুয়াকাটার পর্যটকসহ বরিশাল-ভোলা-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা, বরগুনা-নলছিটি রুটের যাত্রীরা।
পরে ২৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সকল দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাসে প্রায় তিনঘণ্টা পর রাত পৌনে ১০টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে অবরোধ তুলে দেন শিক্ষার্থীরা। পরে যানবাহন চলাচল শুরু হলেও যানজট স্বাভাবিক হতে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী সময় লেগে যায়।
এর আগে সোমবার (১০ আগস্ট) সকাল ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত উপাচার্যের কার্যালয়ে প্রায় সাড়ে চারঘণ্টা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করেন শিক্ষার্থীরা। বৈঠকে সড়ক ও জনপদ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে মহানগর ছাত্রদলের আহ্বায়কের অংশগ্রহণে ক্ষুব্ধ হন শিক্ষার্থীরা। তাদের তোপের মুখে পড়তে হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং সড়ক ও জনপদ বিভাগের কর্মকর্তাদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, রোববার (৯ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের কীর্তনখোলা নদীর ওপর দপদপিয়া সেতুতে বিআরটিসি বাস ও মাহিন্দ্রার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
এতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ইয়াসিন আরাফাত প্রথমে আহত ও পরে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পর রাতে তাঁর মৃত্যু হয়। ইয়াসিন টিউশনি করানোর জন্য যাচ্ছিলেন। এঘটনায় রিফাত নামের আরেকজনের মৃত্যু হয়। তিনি পাসপোর্ট করাতে বাকেরগঞ্জ থেকে বরিশালে আসেন।
ইয়াসিন আরাফাত নিহত হওয়ার জন্য সড়ক ও জনপদ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবহেলাকে দায়ী করে শিক্ষার্থীরা বলেন, আরাফাত আহত হওয়ার দুইঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তার খোঁজ নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শের-ই-বাংলা মেডিকেল হাসপাতালে অবহেলায় পড়েছিল আরাফাত। তাকে আরও আগে যদি ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করতো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাহলে হয়তো আরাফাত বেঁচে থাকতে পারতো।
বৈঠককালে শিক্ষার্থীরা তাদের তিনটি দাবি উত্থাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে। দাবি তিনটি হলো- নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও হল প্রভোস্টের অবহেলার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সাথে সাথে এয়ার এম্বুলেন্সের ব্যবস্থা কেন করা যায়নি তার জবাব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে দিতে হয়। এছাড়া সড়ক সংস্কারসহ শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
শিক্ষার্থীরা তাদের দাবির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবস্থান বিকেল ৫টার মধ্যে জানানোর আল্টিমেটাম দেয়। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাবির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে না পারায় সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে ক্যাম্পাস সংলগ্ন বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক অবরোধ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।
এসময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ১৭ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং ১৭ হাজার টাকা বেতনের নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারের কোন একজন সদস্যকে চুক্তিভিত্তিক চাকরির প্রস্তাব দিলেও তা প্রত্যাখ্যান করে অবরোধ চালিয়ে যান তারা।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম রাছেল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছে তিনটি দাবি দিয়েছি। কিন্তু তারা দাবির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন সমাধান দিতে না পারায় আমরা তৃতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধ শুরু করেন।
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. রাজিব বলেন, দুর্ঘটনায় ইয়াসিন আরাফত আহত হওয়ার পর আমরা দুইঘণ্টা যাবৎ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে কোনো সাড়া পাইনি। আরাফাতের মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবহেলার দায় রয়েছে। এই দায় তারা কোনোভাবে এড়িয়ে যেতে পারে না। এই দায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রক্টরসহ প্রশাসনের সবাইকে নিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. আবদুল আলিম বছির বলেন, আমরা যখন দুর্ঘটনার সংবাদ পেয়েছি সাথে সাথে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। আমাদের প্রক্টর ঢাকায় অবস্থান করছিলেন তিনি অহত শিক্ষার্থীর সাথে ঢাকা মেডিকেলে ছিলেন ওই শিক্ষার্থীর বাড়িতে গিয়েছেন প্রক্টর। আমরা আমাদের দিক থেকে কোনো গাফিলতি রাখিনি এরপর আমাদের অবহেলা বা দায় থাকলে সেটা আমরা মাথা পেতে নিচ্ছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ বলেন, আমরা ঘটনা যখন জানতে পেরেছি সাথে সাথে আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। দুর্ঘটনা ঘটায় রাস্তায় জ্যাম থাকায় আমাদের যেতে কিছুটা দেরি হয়েছে। পরে তাৎক্ষণিক তাকে এসি এম্বুলেন্স করে ঢাকায় পাঠিয়েছি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবহেলা এবং ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও বিজয় চব্বিশ হলের প্রভোস্টকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসতে পারবো। শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি মনিটরিং টিমের মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। পাশাপাশি নিহতের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
এদিকে তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, নিহত ইয়াসিন আরাফাতের পরিবারকে ২৫ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে আশ্বাস্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রূপাতলী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য সার্বক্ষণিক পরিবহন ব্যবস্থা এবং ক্যাম্পাস সংলগ্ন মহাসড়ক সংস্কার ও ফুটপাত নির্মাণের বিষয়ে সড়ক ও জনপদ বিভাগ আশ্বস্ত করেছে। এতে শিক্ষার্থীরা আশ্বস্ত হয়ে অবরোধ তুলে নিয়েছে। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে আশ্বাস বাস্তবায়ন না হলে পুনরায় কর্মসূচিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তারা।
এইচকেআর