আমতলীতে খাল দখল-ভরাটে বিপর্যয়!

উপকূলীয় উপজেলা বরগুনার আমতলী নদী-খালনির্ভর প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ ব্যবস্থা এখন চরম হুমকির মুখে। একসময় দুই শতাধিক খালের প্রবাহে সচল থাকা এই জনপদ আজ দখল, ভরাট, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং দীর্ঘদিন খনন না হওয়ার কারণে কার্যত পানিবদ্ধতার ফাঁদে আটকে পড়েছে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জল-সম্পদে সমৃদ্ধ উপকূলীয় জেলা বরগুনার আমতলী একসময় নদী, খাল ও বিলের জালের জন্য পরিচিত ছিল।এসব জলাধার উপজেলার কৃষি, যোগাযোগ ওপরিবেশ রক্ষায় গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।তবে অবৈধ দখল,নির্বিচার ভরাট ও দূষণের কারণে একের পর এক খাল-বিল আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।দখলদারদের অগ্রাসনে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক জলাধার, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবেশ,কৃষি ও জনজীবনে।
অসংখ্যা নদ-নদী ও খালে নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। অবৈধ দখল,দূষণ আর ভরাটের কারণে নদী ও খালগুলো একেবারেই সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে নদী ও খাল কেন্দ্রিক খেটে খাওয়া মানুষ এখন বেকার হয়ে পড়েছেন। এসব এলাকার কৃষকরা পানির অভাবে ইরি বোরো চাষ করতে পারছেনা।
সরেজমিনে দেখা গেছে,আমতলী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এক সময়ের খরস্রোতা খালগুলো মাটি ফেলে ভরাট করে দখল করা হয়েছে। কোথাও গড়ে উঠেছে দোকানপাটওবসতবাড়ি, কোথাও মাছের ঘের কিংবা স্থাপনা। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রভাবশালী মহল দীর্ঘদিন ধরে এসব দখল কার্যক্রম চালিয়ে এলেও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণ আমতলী উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ২ শতাধিক নদনদী ও খাল , জলাশয়, পলি জমে ক্রমেই ভরাট হয়ে গেছে। তা ছাড়া খাল ও বিলের মধ্য দিয়ে অপরিকল্পিত সড়ক ও ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ এবং নদী খাল দখল করে বসতি ও দোকানপাট স্থাপন করায় নদীগুলো খাল গুলো হয়ে পড়েছে সঙ্কুচিত।
স্থানীয়রা জানান,নদী ওখাল দ্বারা বেষ্টিত অত্র উপজেলায় নৌপথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে খালগুলোর ব্যাপক ভূমিকা থাকলেও বর্তমানে খালের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিগত ২০/২৫ বছরের ব্যবধানে খালগুলো জবর দখল হয়ে রাতারাতি কৃষি জমিতে পরিণত হয়েছে।উপজেলা ভূমি অফিস এই অলৌকিক কাজে সহায়তা করায় খালগুলোর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, উপজেলার আওতাধীন রামনাবাদ ওপায়রা নদী থেকে উৎপত্তি হওয়া খালগুলো৭টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের মধ্যে দিয়ে শাখা-প্রশাখা ছাড়িয়ে প্রবাহিত হতো।খালগুলো প্রবাহমান থাকায় সহজেই পণ্যবহনের নৌকা ট্রলারসহ অন্যান্য নৌযান যাতায়াত করত।
সারা বছর খালে কানায় কানায় পানিতে পূর্ণ থাকত।বছর জুড়ে খালের মাছ ধরে উপজেলার ৭ টি ইউনিয়নের জেলে পরিবার জীবিকা নির্বাহ করত।বর্ষাকালে খালের পানি উপচে পলি মাটি ফসলি জমিতে মিশে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পেত। শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা তাদের ক্ষেতে সহজেই খাল থেকে সেচ দিতে পারত। বর্তমানে এখন আর সেই অবস্থা নেই।
দক্ষিণাঞ্চলের আমতলী উপজেলার হলদিয়া,রামজী,সোনাউঠা,গাজিপুর ও অফিস বাজারে নৌকা ও ট্রলার যোগে পণ্য পরিবহনের জন্য খাল দিয়ে সহজেই যাতায়াত করাযেত।
বর্তমানে খাল দিয়ে নৌকা চলে না,পড়ে না জমিতে পলিমাটি।ফলে উপজেলার হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি উর্বরতা শক্তি হারিয়ে ফেলেছে।ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষি জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করেও কৃষকরা কোন ভালো ফলন পাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট এলাকার ভুক্তভোগী কৃষকরা অভিযোগ করে জানায়,উপজেলা ভূমি অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং এলাকার ভূমি দস্যুরা নামে-বেনামে খালগুলো বন্দোবস্ত করে নিয়েছে।খালগুলোর মাঝে অপরিকল্পিত বাঁধ ও কালভার্ট নির্মাণ করায় এগুলো ভরাট হয়ে গেছে।ফলে শুষ্ক মৌসুমে এলাকায় তীব্র পানির সংকট দেখা দেয়।
নাব্যতা হারানোর কারণে অধিকাংশ খালই শুকিয়ে যাচ্ছে। ভুক্তভোগিরা কোন ড্রেজিং নাকরায় প্রায় খালই ভরাট হয়ে গেছে।এই সুযোগে এলাকার ভূমিদস্যুরা খাল দখলের উৎসবে মেতে উঠেছে। অথচ প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন অপকর্ম চালিয়ে গেলেও প্রশাসনের কর্মকর্তারা দেখেও না দেখার ভান করছে। হাজার হাজার একর ফসলি জমির পানি ওঠানামা করলেও এখন সে ব্যবস্থা নেই। মাটি ফেলে খালগুলো ভরাট করে ফেলায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে।উপজেলার হলদিয়া, চাওড়া, গুলিশাখালীসহ ৭ইউনিয়নের খালগুলো স্থানীয় প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা ভূমি অফিসের সহযোগিতায় বন্দোবস্ত নিয়েছে।
খালগুলো বাঁধ দিয়ে ভরাট করে চাষাবাদ করছে ফলে উপজেলার হাজার হাজার একর ফসলি জমি তার উর্বরতা হারাচ্ছে।অপরদিকে বর্ষা মৌসুমে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়।
পরিবেশবাদী সংগঠন‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা ধরা’র সদস্য সচিব সাংবাদিক মুশফিক আরিফ বলেন,খাল-বিল ধ্বংস মানেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়া। এতে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত বরগুনার জন্য এটি আরও ভয়াবহ বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বে- সরকারী সংস্থা এনএসএস নির্বাহী পরিচালক শাহাবুদ্দিন পান্না বলেন,২০/২৫ বছর পূর্বে নদী ও খাল দিয়ে বছরজুড়েই নৌ-চলাচল করত,কিন্তু বছরের পর বছর পলি জমে এসব নদী খাল বিল ভরাট হয়ে গেছে।নদীপথে নৌকায় কম খরচে সহজলভ্য পরিবহন সুবিধা ভোগ করলেও এখন আর ওই সুবিধানাই।
এখন নদীওখাল মরে যাওয়ার সাথে সাথে এলাকার প্রসিদ্ধ নৌবন্দরগুলোও মরে গেছে।সাথে সাথে মরেছেন নৌকার মাঝিমালা ওজেলেরা।একই সাথে দুর্ভোগে পড়েছেন নদী এলাকার কৃষকসহ নদী পাড়ের লাখো মানুষ। এখন তারা সড়কপথে বেশি খরচে পণ্য আনানেয়া করেন।এতে পরিবহন খরচ বেশি পড়ায় পণ্যের দামও বেশি, যার প্রভাব গিয়ে পড়েছে ক্রেতাদের ওপর।
আমতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মাদ জাফর আরিফ চৌধুরী মুঠোফোনে বলেন, এ বিষয় অভিযোগ পেলে সরেজমিন তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এইচকেআর